বিশেষ প্রতিবেদক:
উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প গুলো উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। রোহিঙ্গাদের মধ্যে অভ্যন্তরিণ দ্বন্ধ, ইয়াবা ও ক্যাম্প ভিত্তিক আধিপত্য বিস্তার নিয়ে প্রতিনিয়ত সংঘর্ষের কারণে এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে সাধারণ রোহিঙ্গা ও স্থানীয় বাংলাদেশী নাগরিকরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। গত সপ্তাহজুড়ে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চলমান সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছে ৭জন রোহিঙ্গা।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের একাধিক সূত্র জানায়, ক্যাম্পের অভ্যন্তরে গড়ে উঠা দোকানপাট থেকে চাঁদা আদায়, মিয়ানমার থেকে নিয়ে আসা ইয়াবা ও নানা প্রকার মাদক বানিজ্য, অস্ত্র বানিজ্য, সংগঠন ভিত্তিক এলাকা দখল নিয়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত চলছে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা। উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বেশীরভাগ ক্যাম্প গুলোতে একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় হয়ে উঠেছে। গত এক সপ্তাহে শুধুমাত্র উখিয়ার কুতুপালং ও লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দফায় দফায় সংঘর্ষ চলে আসছে। দু’গ্রুপের এই সংঘর্ষে নিহত হয়েছে ৭জন রোহিঙ্গা। এসময় আহত হয়েছে অন্তত শতাধিক রোহিঙ্গা।
উখিয়া থানার ওসি (তদন্ত) গাজী সালাহউদ্দিনের দেয়া তথ্যমতে, গত ৪ অক্টোবর ২জন ৫অক্টোবর ১জন ও ৬ অক্টোবর ৪জন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র দু’গ্রুপের মধ্যে এখনো উত্তেজন চলছে। তবে আইনশৃংখলা বাহিনী সজাগ থাকায় ক্যাম্পের পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এঘটনায় কক্সবাজার র্যাব-১৫ টেকনাফের চাকমারকুল এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৯জন রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীকে আগ্নেয়াস্ত্রসহ আটক করেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক রোহিঙ্গা জানান, ‘উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার আনাস গ্রুপ ও মুন্না গ্রুপের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। এরই জের ধরে কুতুপালং ২ ওয়েষ্ট ডি-ব্লকে ৪ ক্টোবর রাতে মুন্না গ্রুপের ৪/৫ শত রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী রা দা-লাঠি সোটা নিয়ে ক্যাম্পের শতাধিক ঝুপড়ী ঘর ও ৫০ টি দোকান ভাংচুর করেছে। এঘটনায় আনাস গ্রুপ আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে এবং মুন্না গ্রুপের উপর চড়াও হয়। এভাবে গত সপ্তাহজুড়ে বিক্ষিপ্তভাবে সংঘর্ষ চলে আসছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে দু’গ্রুপের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, গোলাগুলির ঘটনা চলমান রয়েছে। এ কারণে প্রাণ বাঁচাতে কয়েক'শ সাধারণ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু কুতুপালং ক্যাম্প ছেড়ে অন্য ক্যাম্পে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। বর্তমানে ক্যাম্পের অভ্যন্তরে দোকানপাট বন্ধ রয়েছে।
গত ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ি জমিতে ৩৪টি ক্যাম্পে আশ্রয় নেয় ১১ লাখেরও বেশী রোহিঙ্গা। আশ্রয় নেয়ার পর এক বছর নিরবে রোহিঙ্গারা সময় অতিবাহিত করলেও যত দিন যাচ্ছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে অপরাধ বাড়ছে। দিনের বেলা তারা অবাধে চলাফেরা করে। স্থানীয় মাদক ও ইয়াবা কারবারি এবং চোরাচালানিদের সঙ্গেও তাদের অবাধ যাতায়াত। আর ক্যাম্পগুলোকে মাদক, ইয়াবা, অস্ত্রের মজুদ বানিয়ে ফেলেছে। অপরাধের মাত্রা বেড়ে এখন রোহিঙ্গাদের মধ্যেই প্রায় প্রতি রাতে ক্যাম্পে সংঘর্ষ চলে। অস্ত্র, মাদক, ধর্ষণ, অপহরণ, বিশেষ ক্ষমতা আইন, পুলিশ আক্রান্ত, ডাকাতি, হত্যা, মানবপাচারসহ বিভিন্ন অপরাধে যুক্ত রয়েছে রোহিঙ্গারা।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের দেয়া তথ্য মতে, গত ২০১৭ সালে নানা অপরাধে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা ছিল ৭৬টি আর আসামি হয় ১৫৯ জন। ২০১৮ সালে ২০৮ মামলায় আসামি হয়েছে ৪১৪ জন। ২০১৯ সালে মামলার সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২৬৩টি আর আসামি হয় ৬৪৯ জন। চলতি বছরের ২৫ আগস্ট পর্যন্ত রোহিঙ্গা অপরাধীদের বিরুদ্ধে হওয়া ১৮৪ মামলায় আসামি হয় ৪৪৯ জন।
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গারা ইয়াবার চালানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ইয়াবা ব্যবসা বন্ধ করা সম্ভব নয়। ক্যাম্পে কয়েকটি গ্রুপ মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত। তারা মিয়ানমার থেকে সরাসরি ইয়াবা চালান এনে ক্যাম্পে মজুদ রাখে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়াকড়ির মধ্যেও ক্যাম্পে ইয়াবা চালান, মজুদ এবং লেনদেন করে তারা।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো: রফিকুল ইসলাম জানান, ‘ক্যাম্প গুলো রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা খুন, ধর্ষণ, মাদক পাচার, অস্ত্র ও স্বর্ণ ব্যবসায় মতো অসংখ্য অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মাদক ও অস্ত্র ও স্বর্ণ ব্যবসা নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে। এতে করে গ্রুপে গ্রুপে সংঘর্ষ, খুন ও অপহরণের ঘটনা ঘটে। এঘটনায় বর্তমানে কক্সবাজার জেলা পুলিশ, সেনাবাহিনী, র্যাব ও ক্যাম্পে নিয়োজিত আর্মড পুলিশ (এপিবিএন) সদস্যরা নিরলসভাবে কাজ করছে এবং খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
কক্সবাজারের ১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক (পুলিশ সুপার) হেমায়েতুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন কোনো না কোনো ক্যাম্প থেকে অপরাধমূলক কর্মকান্ডের খবর পাওয়া যায়। তবে ক্যাম্পে অপরাধপ্রবণতা বাড়লেও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি। রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে পুলিশ।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চলমান উত্তেজনা, সংঘর্ষের ঘটনার কথা উল্লেখ করে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ত্রাণ প্রত্যাবাসন কার্যালয়ে অতিরিক্ত কমিশনার সামশুদ্দোহা নয়ন বলেন, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করছে আইনশৃংখলা বাহিনী। বর্তমানে ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ও এপিবিএন সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। ক্যাম্পের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
ভয়েস/জেইউ।
উপদেষ্টা সম্পাদক : আবু তাহের
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : আবদুল আজিজ
সম্পাদক: বিশ্বজিত সেন
অফিস: কক্সবাজার প্রেসক্লাব ভবন (৩য় তলা), শহীদ সরণি (সার্কিট হাউজ রোড), কক্সবাজার।
ফোন: ০১৮১৮-৭৬৬৮৫৫, ০১৫৫৮-৫৭৮৫২৩ ইমেইল : news.coxsbazarvoice@gmail.com
Copyright © 2026 Coxsbazar Voice. All rights reserved.