প্রিন্ট এর তারিখঃ অগাস্ট ৬, ২০২৬, ৫:০৭ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২, ২০২২, ৬:০৪ পি.এম

বিশেষ প্রতিবেদক:
সরকারি কোন অনুমোদন ছাড়াই জেলায় চলছে প্রায় তিন শতাধিক স’মিল (করাতকল)। ফলে নিরব ঘাতক রোগের মতো সাবাড় হচ্ছে বনজ, ফলজ, ওষুধি সহ নানা প্রজাতির গাছ। ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য, আর বিলুপ্তপ্রায় পশু পাখির অভয়ারণ্য বাসস্থান। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই বনাঞ্চলের আশপাশে অবৈধভাবে এসব করাতকল স্থাপন করা হলেও তা উচ্ছেদ করা হচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে, বন বিভাগের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়মিত মাসোয়ারা আদায় করছেন সমিল মালিকদের কাছ থেকে।
সংরক্ষিত বনের ভিতর বা আশেপাশে করাতকল স্থাপনের নিয়ম নেই। অথচ জেলায় সংরক্ষিত বিভিন্ন বনাঞ্চল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে শতশত অবৈধ করাতকল।করাতকল (লাইসেন্স) বিধিমালা-২০১২ আইনে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, কোন ব্যক্তি লাইসেন্স ব্যতীত কোনো করাত-কল স্থাপন বা পরিচালনা করতে পারবেন না।বন বিভাগ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বনের মধ্যে এই করাতকল স্থাপনের ব্যাপারে আপত্তি তুলেছেন। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফার লোভে বনের কাঠ চেরাই করছে এসব করাতকলে। অবাধে বনাঞ্চলের গাছ এভাবে চেরানো হলে বন ধ্বংস হতে বেশি সময় লাগবে না।’ তারা বনাঞ্চলের ভিতর ও আশপাশের করাতকল বন্ধের জোর দাবি তুলেছেন।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মিল মালিকরা সরকারি কোন নিয়ম মানছেন না।অনেকেই ২০/২৫ বছর ধরে অনুমোদন ছাড়াই চালাচ্ছেন অবৈধ স’মিল। মিল চত্বর ও আশেপাশের এলাকা জুড়ে মজুত রাখছে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ।এ সময় সরকারের অনুমোদনহীন এসব অবৈধ স’মিলগুলো বন্ধ করার কোনো উদ্যোগও চোখে পড়েনি।
কক্সবাজার সদরস্থ পিএমখালী রেঞ্জে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে করাতকল স্থাপন করেন পিএমখালীর ১নং ওয়ার্ড ছনখোলা এলাকার বাসিন্দা সাবেক মেম্বার ইমাম শরিফ। এ কলে প্রতিদিন চিরাই হচ্ছে বনাঞ্চলের অসংখ্য চোরাই কাঠ।এ রেঞ্জের বনাঞ্চলের ভেতরে আরো রয়েছে ১১টি অবৈধ স-মিল। এসব স'মিল গুলোর একটিরও বন পরিবেশের বৈধ কাগজপত্র (লাইসেন্স) নেই।সবই মাসোহারা দিয়ে ২৫/৩০ বছর ধরে অবৈধভাবে চালিয়ে আসছে মিল মালিকরা। স্থানীয় কাঠ ব্যবসায়ী মোঃ ইসলাম, বজল, ভুলু মিয়াসহ অনেকে বলেন, আমরা দেখি মাঝে মধ্যে বন বিভাগের লোকজন এসে মিল থেকে টাকা নিয়ে যায়।এতে করে মিল মালিকদের আর কোনো ঝামেলা পড়তে হয় না।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঝিলংজা এলাকার এক স’মিল মালিক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তার স’মিল চলছে। অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছি, এখনো অনুমোদন পাইনি। বন বিভাগের লোকজনকে ম্যানেজ করে মিল চালাচ্ছি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন কক্সবাজার জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, অবৈধ করাতকলের জন্য বনাঞ্চলের কোন গাছপালা রক্ষা করা যাচ্ছে না।এভাবে সরকারি অনুমোদন ছাড়া করাতকল (স’মিল) চালানোর কারণে একদিকে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে, উজাড় হচ্ছে বন জঙ্গল।অপরদিকে সরকার হারাচ্ছে মোটা অংকের রাজস্ব।তাই জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
করাতকল বিধিমালা, ২০১২-এ বলা আছে, কোনো সরকারি অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বিনোদন পার্ক, উদ্যান এবং জনস্বাস্থ্য বা পরিবেশের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করে এমন স্থান থেকে কমপক্ষে ২০০ মিটার এবং সরকারি বনভূমির সীমানা থেকে কমপক্ষে ১০ কিলোমিটারের মধ্যে করাতকল স্থাপন করা যাবে না। তবে এই নিদের্শনা কেউ মানছে না। যত্রতত্র বসানো হয়েছে করাতকল। বনের কাছে ও বন ঘেঁষে গড়ে ওঠা অবৈধ এসব করাতকলে অবাধে বনাঞ্চলের গাছ চেরানো হলেও অবৈধ কারবারি দের বিরুদ্ধে এসব দেখার কাজে নিয়োজিত দায়িত্বশীলদের কোন আইনগত ব্যবস্থা নেই বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।
জানা যায়, স-মিল চালানোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত ফি দিয়ে লাইসেন্স গ্রহণ বাধ্যতামুলক। অথচ কক্সবাজারের বিভিন্ন রেঞ্জ এলাকায় স-মিল চালানোর ক্ষেত্রে এ সব বিধিনিষেধ উপেক্ষা করা হয়েছে। পিএমখালীর এক স-মিল মালিক জানান, আমরা অবৈধভাবে স-মিল চালাচ্ছি এবং এপর্যন্ত আমাদের কোন প্রকার সমস্যা হয়নি। তবে মাঝেমধ্যে স্থানীয় রেঞ্জ ও বিট কর্মকর্তাকে চা আপ্যায়নের নামে আর্থিক চাঁদা দিতে হয়।আর বিক্রির জন্য কোন কাঠ ব্যবসায়ী কারো বাড়িভিটি বা বনাঞ্চলের বনজ ও ফলজ গাছ নিয়ে এসে সমিলের স্থানে মওজুদ করে রাখা মাত্রই গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বা নিজেদের উদ্যোগে অধিনস্থ বন অফিসের লোকজন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে যার কাছ থেকে তা পারেন হাতায়ে নিয়ে দ্রুত প্রদান ত্যাগ করে বলেও জানায় সে।
জানতে চাইলে চকরিয়া সুন্দরবন রেঞ্জ কর্মকর্তা রুহুল আমিন জানান, তার দায়িত্বরত রেঞ্জের মধ্যে ২৩টি করাতকল রয়েছে,একটির লাইসেন্স আছে মাত্র। তারমধ্যে ১২টির বিরুদ্ধে কোর্টে মামলা রয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব কটি অবৈধ করাতকল মালিকদের বিরুদ্ধে মামলা করবে। এবং তার রেঞ্জের আঠারো হাজার একর বনভূমির সবজমি জবর দখল হয়ে গেছে। তার স্টাফ আছে মাত্র একজন।তাই অবৈধ জবর দখল কারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে চাইলেও জনবল না থাকার কারণে করতে পারেন না বলেও জানায় সে।রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল জব্বার মুঠোফোনে বলেন, পিএমখালী রেঞ্জে ১২টি স'মিল রয়েছে। তারমধ্যে একটিরও লাইসেন্স নেই।প্রত্যেক অবৈধ মিল মালিকদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়া আছে। আদালতের নির্দেশনা পেলেই সবকটি স'মিল উচ্ছেদ করা হবে।
কক্সবাজার (উত্তর) বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন সরকারকে এ ব্যাপারে অবহিত করে বক্তব্য জানতে চাইলে অবৈধ করাতকলের তালিকা চেয়ে বলেন, মোবাইলে কথা না বলে সরাসরি অফিসে গেলে বিস্তারিত জানাবেন।
উল্লেখ্য যে,কক্সবাজারে উত্তর বন বিভাগের আওতাধীন এলাকায় করাতকল আছে ১১৮টি। এর মধ্যে ১১২টিই অবৈধ। কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের আওতাধীন এলাকায় বৈধ করাতকল আছে ৮১টি।এর মধ্যে ৭৩টি অবৈধ। এছাড়া লামা বন বিভাগের আওতাধীন এলাকায় স্থাপিত ৫৬টি করাতকলের মধ্যে ৪৮টিই অবৈধ। চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলা মিলে চট্টগ্রাম বনাঞ্চল। এই বনাঞ্চলের অধীনে ১০টি বিভাগ রয়েছে। এর মধ্যে বন ব্যবহারিক বিভাগের অধীনে কোনো বনাঞ্চল নেই। বাকি নয়টি বিভাগের আওতাধীন বনাঞ্চলের পরিমাণ ৮ লাখ ৬৩ হাজার ২৫৬ একর।
ভয়েস/আআ
উপদেষ্টা সম্পাদক : আবু তাহের
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : আবদুল আজিজ
সম্পাদক: বিশ্বজিত সেন
অফিস: কক্সবাজার প্রেসক্লাব ভবন (৩য় তলা), শহীদ সরণি (সার্কিট হাউজ রোড), কক্সবাজার।
ফোন: ০১৮১৮-৭৬৬৮৫৫, ০১৫৫৮-৫৭৮৫২৩ ইমেইল : news.coxsbazarvoice@gmail.com
Copyright © 2026 Coxsbazar Voice. All rights reserved.