মুফতি উবায়দুল হক খান:
পবিত্র কোরআন মানুষের জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এক মহাগ্রন্থ। এতে মানুষের দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোরআনের বহু আয়াতে আখেরাতের হিসাব-নিকাশ, জান্নাত ও জাহান্নামের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যাতে মানুষ সতর্ক হয়ে সৎপথ অবলম্বন করে। সুরা হাক্কাহর ১৯-৩৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ কেয়ামতের দিন মানুষের দুই ভিন্ন পরিণতির কথা অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী ও শিক্ষণীয় ভাষায় বর্ণনা করেছেন। একদল মানুষ তাদের আমলনামা ডান হাতে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হবে, আরেক দল মানুষ বাম হাতে আমলনামা পেয়ে চরম অনুতাপ ও লাঞ্ছনার শিকার হবে।
কোরআনের মূল পাঠ : মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘যার আমলনামা তার ডান হাতে দেওয়া হবে, সে বলবে, নাও, আমার আমলনামা পড়ে দেখ। আমি নিশ্চিত জানতাম, আমাকে আমার হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে। অতএব সে থাকবে এক সুখময় জীবনে, সুউচ্চ জান্নাতে, যার ফলের থোকাগুলো থাকবে নিকটে ঝুলন্ত। বলা হবে, তোমরা অতীত দিনের সৎকর্মের বিনিময়ে তৃপ্তির সঙ্গে খাও এবং পান করো। আর যার আমলনামা তার বাম হাতে দেওয়া হবে, সে বলবে, হায়! যদি আমাকে আমার আমলনামা না দেওয়া হতো! আমি যদি না জানতাম আমার হিসাব কী! হায়! যদি মৃত্যুই সবকিছু শেষ করে দিত! আমার ধন-সম্পদ আমার কোনো উপকারে আসেনি। আমার ক্ষমতা ও প্রভাব সবই ধ্বংস হয়ে গেছে।’ বলা হবে, তাকে ধরো এবং শৃঙ্খলিত করো। তারপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করো। অতঃপর তাকে সত্তর হাত দীর্ঘ শৃঙ্খলে আবদ্ধ করো। নিশ্চয়ই সে মহান আল্লাহর প্রতি ইমান আনত না, মিসকিনকে আহার করাতে উৎসাহ দিত না। অতএব আজ এখানে তার কোনো অন্তরঙ্গ বন্ধু নেই, পুঁজ ছাড়া তার কোনো খাদ্যও নেই, যা অপরাধী ছাড়া আর কেউ খাবে না।’ (সুরা হাক্কাহ ১৯-৩৭)
কেয়ামতে আমলনামা প্রদান : কেয়ামতের দিন প্রতিটি মানুষের জীবনের সমস্ত কর্মের হিসাব নেওয়া হবে। মানুষের প্রতিটি কাজ ছোট বা বড়, সবকিছুই লিপিবদ্ধ রয়েছে। সেই আমলনামা বা কর্মপুস্তকই বিচার দিবসে মানুষের সামনে পেশ করা হবে। সুরা হাক্কাহর এই আয়াতগুলোতে মহান আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন, যাদের আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে তারা সফল ও সৌভাগ্যবান হবে আর যাদের বাম হাতে দেওয়া হবে তারা হবে দুর্ভাগা ও ব্যর্থ। এই আমলনামা মানুষের জীবনের প্রতিটি কাজের সাক্ষ্য বহন করবে। মানুষ দুনিয়ায় যা কিছু করেছে, সৎকর্ম কিংবা অসৎকর্ম, সবই সেখানে স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ থাকবে। তাই দুনিয়ার জীবনে মানুষের প্রতিটি কাজই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ডান হাতে আমলনামা : সুরা হাক্কাহর ১৯-২৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ সেই সৌভাগ্যবান মানুষের কথা উল্লেখ করেছেন, যারা তাদের আমলনামা ডান হাতে পাবে। তারা আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে অন্যদের বলবে, ‘এসো, আমার আমলনামা পড়ে দেখ।’ তাদের আনন্দের কারণ হলো, তারা দুনিয়াতে আল্লাহর নির্দেশ মেনে জীবন কাটিয়েছে এবং সৎকর্মে নিজেদের জীবনকে আলোকিত করেছে।
তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করত যে, একদিন তাদের আল্লাহর সামনে হিসাব দিতে হবে। এই বিশ্বাসই তাদের জীবনকে সৎপথে পরিচালিত করেছিল। ফলে বিচার দিবসে তারা হবে প্রশান্ত ও আনন্দিত। মহান আল্লাহ তাদের জন্য ঘোষণা করবেন, ‘তোমরা অতীতে যা করেছিলে তার প্রতিদানস্বরূপ তৃপ্তিসহকারে পানাহার করো।’ এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, আখেরাতে সফলতা লাভের মূল রহস্য হলো দুনিয়াতে আল্লাহর প্রতি দৃঢ় ইমান ও সৎকর্মে জীবন পরিচালনা করা।
জান্নাতের শান্তিময় জীবন : ডান হাতে আমলনামা পাওয়া মানুষদের জন্য মহান আল্লাহ জান্নাতের সুখময় জীবনের কথা উল্লেখ করেছেন। সেখানে তারা শান্তি ও সন্তুষ্টিতে ভরা এক জীবন লাভ করবে। জান্নাত হবে অত্যন্ত উঁচু মর্যাদাসম্পন্ন এবং সেখানে সবকিছু হবে অত্যন্ত মনোরম।
কোরআনে বলা হয়েছে, জান্নাতের ফলগুলো থাকবে হাতের নাগালে। অর্থাৎ সেখানে কষ্ট করে কিছু সংগ্রহ করতে হবে না, বরং সবকিছু সহজলভ্য হবে। এটি দুনিয়ার জীবনের সম্পূর্ণ বিপরীত, যেখানে মানুষকে কষ্ট করে জীবিকা অর্জন করতে হয়। এই জান্নাতি জীবনের বর্ণনা মানুষকে সৎকর্মে উৎসাহিত করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য অনুপ্রাণিত করে।
বাম হাতে আমলনামা : অন্যদিকে সুরা হাক্কাহর ২৫-২৯ নম্বর আয়াতে সেই দুর্ভাগা মানুষের কথা বলা হয়েছে, যাদের আমলনামা বাম হাতে দেওয়া হবে। তারা তখন চরম অনুতাপ প্রকাশ করে বলবে, ‘হায়! যদি আমাকে আমার আমলনামা না দেওয়া হতো, যদি আমি আমার হিসাব সম্পর্কে কিছুই না জানতাম!’
এই মানুষগুলো দুনিয়াতে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে জীবন কাটিয়েছে। তারা আখেরাতের কথা ভুলে গিয়ে শুধু দুনিয়ার ভোগ-বিলাসে মগ্ন ছিল। তাই বিচার দিবসে তারা নিজেদের ভাগ্যের জন্য গভীর অনুশোচনায় ভুগবে। তারা বলবে, ‘আমার ধন-সম্পদ আমার কোনো উপকারে আসল না, আমার ক্ষমতা ও প্রতিপত্তিও আজ ধ্বংস হয়ে গেছে।’ দুনিয়াতে তারা হয়তো ধনী, প্রভাবশালী বা ক্ষমতাবান ছিল, কিন্তু কেয়ামতের দিন এসব কিছুই তাদের কাজে আসবে না।
জাহান্নামের কঠিন শাস্তি : এরপর আয়াতগুলোতে মহান আল্লাহ তাদের জন্য নির্ধারিত কঠিন শাস্তির কথা উল্লেখ করেছেন। ফেরেশতাদের নির্দেশ দেওয়া হবে, ‘তাকে ধরো এবং শৃঙ্খলিত করো, তারপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করো।’ এমনকি বলা হয়েছে, তাদের এমন এক শৃঙ্খলে বাঁধা হবে, যার দৈর্ঘ্য হবে সত্তর হাত। এটি মূলত তাদের কঠিন শাস্তির ভয়াবহতা বোঝানোর জন্য বলা হয়েছে। এই শাস্তির কারণও কোরআনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তারা মহান আল্লাহর প্রতি ইমান আনেনি এবং গরিব-দুঃখীদের খাবার দেওয়ার জন্য মানুষকে উৎসাহিত করেনি। অর্থাৎ তারা ছিল আত্মকেন্দ্রিক ও নিষ্ঠুর।
আয়াতগুলোর শিক্ষা : সুরা হাক্কাহর এই আয়াতগুলো আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। প্রথমত, এগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আখেরাতের জীবন অবশ্যম্ভাবী এবং সেখানে প্রতিটি কাজের হিসাব দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ইমান ও সৎকর্মই আখেরাতে সফলতার মূল চাবিকাঠি। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রেখে সৎপথে জীবন পরিচালনা করবে, সেই কেয়ামতের দিন সফল হবে।
তৃতীয়ত, মানুষের প্রতি সহানুভূতি ও দয়া প্রদর্শন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করা এবং তাদের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
হৃদয়বিদারক চিত্র : সুরা হাক্কাহর উল্লিখিত আয়াতগুলো কেয়ামতের দিনের এক বাস্তব ও হৃদয়বিদারক চিত্র তুলে ধরে। এতে স্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছে, মানুষের দুনিয়ার জীবনই তার আখেরাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। যারা ইমান ও সৎকর্মের মাধ্যমে জীবন পরিচালনা করবে, তারা জান্নাতের অনন্ত সুখ লাভ করবে। আর যারা মহান আল্লাহকে অস্বীকার করবে এবং মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালন করবে না, তারা জাহান্নামের কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হবে।
লেখক : মুহাদ্দিস ও শিক্ষা সচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর
ভয়েস/আআ/সূত্র: দেশরূপান্তর।
উপদেষ্টা সম্পাদক : আবু তাহের
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : আবদুল আজিজ
সম্পাদক: বিশ্বজিত সেন
অফিস: কক্সবাজার প্রেসক্লাব ভবন (৩য় তলা), শহীদ সরণি (সার্কিট হাউজ রোড), কক্সবাজার।
ফোন: ০১৮১৮-৭৬৬৮৫৫, ০১৫৫৮-৫৭৮৫২৩ ইমেইল : news.coxsbazarvoice@gmail.com
Copyright © 2026 Coxsbazar Voice. All rights reserved.