আবদুল আজিজ:
সন্ধ্যা নামার আগমুহূর্ত। পশ্চিম আকাশে অস্তগামী সূর্যের রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়েছে বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশিতে। ঢাকের শেষ তালে, শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনিতে মুখর লাবণী সৈকত। হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে একে একে সাগরের জলে বিলীন হলো দেবী দুর্গার প্রতিমা।
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মর্ত্যবাস শেষে কৈলাশে স্বামী মহাদেবের কাছে ফিরে গেলেন মা দুর্গা। আর ভক্তদের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হলো চিরচেনা আহ্বান—"আসছে বছর আবার হবে।"
বিজয়া দশমী উপলক্ষে মঙ্গলবার বিকেলে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী পয়েন্টে অনুষ্ঠিত হলো দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রতিমা বিসর্জন অনুষ্ঠান। জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় প্রতিমা এনে সমুদ্রে বিসর্জন দেওয়া হয়। কক্সবাজার জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্যমতে, এ বছর জেলায় ৩০০টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সদর, রামু, ঈদগাঁও, উখিয়া, টেকনাফ, চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়া থেকে শত শত ভক্ত প্রতিমাসহ শোভাযাত্রায় অংশ নেন।
বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে লাবণী সৈকত পরিণত হয় এক বিশাল জনসমুদ্রে। ঢাক, কাঁসর, শঙ্খধ্বনি আর ধর্মীয় সঙ্গীতের তালে তালে এগিয়ে আসে প্রতিমাবাহী ট্রাক, পিকআপ ও শোভাযাত্রা। ভক্তদের অনেকেই দেবীর উদ্দেশে ফুল ছিটিয়ে, ধূপ জ্বালিয়ে এবং প্রার্থনা করে বিদায় জানান। প্রতিমা সাগরের জলে নামিয়ে দেওয়ার মুহূর্তে অনেকের চোখে ছিল অশ্রু, আবার মুখে ছিল আগামী বছরের প্রত্যাবর্তনের আশাবাদ।
শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, কক্সবাজারের এই বিসর্জন উৎসব এখন পর্যটনেরও একটি বড় আকর্ষণ। দুর্গাপূজার ছুটি কাটাতে কক্সবাজারে আসা হাজারো পর্যটক লাবণী সৈকতে ভিড় করেন এই বিরল আয়োজন উপভোগ করতে। অনেকে পরিবার নিয়ে দীর্ঘ সময় সৈকতে অবস্থান করেন। কেউ মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করেন, কেউ পেশাদার ক্যামেরায় সূর্যাস্তের আলোয় প্রতিমা বিসর্জনের দৃশ্য ধারণ করেন। স্থানীয় হোটেল-রেস্তোরাঁ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও এদিন ছিল বাড়তি কর্মচাঞ্চল্য।
বিসর্জন অনুষ্ঠান ঘিরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি উজ্জ্বল চিত্রও ফুটে ওঠে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের অনেক মানুষও অনুষ্ঠান দেখতে সৈকতে উপস্থিত হন। একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের এই পরিবেশ কক্সবাজারের বহুদিনের সামাজিক ঐতিহ্যকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।
বিপুল জনসমাগমের কারণে পুরো সৈকতজুড়ে ছিল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে পুলিশ, পর্যটন পুলিশ, পৌরসভা, ফায়ার সার্ভিস, আনসার ও স্বেচ্ছাসেবকরা দায়িত্ব পালন করেন। সৈকতের বিভিন্ন স্থানে নজরদারি টাওয়ার, মেডিকেল টিম, উদ্ধারসামগ্রী ও জরুরি সেবা প্রস্তুত রাখা হয়। শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন ছিল। আয়োজক ও প্রশাসনের সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বিসর্জন অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।
কক্সবাজার জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে কক্সবাজার লাবনী উম্মুক্ত মঞ্চে প্রতিমা বিসর্জন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন-ভুমি ও পার্বত্য বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিষ্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।
জেলা পুজা উদযাপন কমিটির সভাপতি উদয় শংকর পাল মিঠুর সভাপতিত্বে অন্যন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি ও উখিয়া-টেকনাফ আসনের সংসদ সদস্য শাহাজাহান চৌধুরী, কক্সবাজার সদর-রামু আসনের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান কাজল, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও মহিলা এমপি এডভোকেট শামীম আরা স্বপ্না, কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো: আব্দুল মান্নান, জেলা পুলিশ সুপার সাজেদুল ইসলামসহ জেলা পুজা উদযাপন কমিটির নেতৃবৃন্দ।
এসময় বক্তারা বলেন কক্সবাজার জেলার সব পূজামণ্ডপে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। পূজা ও বিসর্জন সফল করতে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবক এবং সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা ছিল আন্তরিক ও প্রশংসনীয়। তাঁদের মতে, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের কারণেই কক্সবাজারে ধর্মীয় উৎসবগুলো উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়ে আসছে।
প্রতিবছরের ন্যায় এ বছরেও সমুদ্রসৈকতে প্রতিমা বিসর্জনের এই আয়োজন দেশের অন্য অনেক এলাকার তুলনায় ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। সমুদ্রের বিশাল জলরাশি, সূর্যাস্তের নৈসর্গিক সৌন্দর্য, ঢাকের ছন্দ এবং হাজারো মানুষের উপস্থিতি মিলিয়ে এটি শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং কক্সবাজারের অন্যতম বড় সাংস্কৃতিক আয়োজনেও পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর এই অনুষ্ঠান ঘিরে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেবীর বিদায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হলো এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব। তবে শেষ হলো না অপেক্ষা। সমুদ্রের ঢেউয়ে প্রতিমা বিলীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভক্তদের হৃদয়ে রয়ে গেল নতুন প্রত্যাশা—অশুভ শক্তির বিনাশ আর শুভ শক্তির বিজয়ের বার্তা নিয়ে আগামী বছর আবারও ফিরে আসবেন মা দুর্গা।
ভয়েস/আআ
উপদেষ্টা সম্পাদক : আবু তাহের
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : আবদুল আজিজ
সম্পাদক: বিশ্বজিত সেন
অফিস: কক্সবাজার প্রেসক্লাব ভবন (৩য় তলা), শহীদ সরণি (সার্কিট হাউজ রোড), কক্সবাজার।
ফোন: ০১৮১৮-৭৬৬৮৫৫, ০১৫৫৮-৫৭৮৫২৩ ইমেইল : news.coxsbazarvoice@gmail.com
Copyright © 2026 Coxsbazar Voice. All rights reserved.