বিবিসি বাংলা, দিল্লি :
ভারতের উত্তরপ্রদেশে একজন দলিত বা পশ্চাৎপদ সমাজের তরুণীর নৃশংস গণধর্ষণ ও মৃত্যুর পর সারা দেশ জুড়ে এতটাই তীব্র প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে যে অনেকেই একে সে দেশের ''দ্বিতীয় নির্ভয়া মুহূর্ত'' বলে বর্ণনা করছেন।
নির্ভয়ার ঘটনায় যেভাবে আট বছর আগে সারা দেশ দিল্লিতে চলন্ত বাসে একজন প্যারামেডিক্যাল ছাত্রীর গণধর্ষণের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন বিক্ষোভ জানিয়েছিল, হাথরাসের এই দলিত তরুণীর ওপর যৌন অত্যাচার ও তারপর তার 'অসম্মানজনক' সৎকারের বিরুদ্ধেও অনেকটা সেভাবেই প্রতিবাদ দানা বাঁধছে।
হাথরাসের ঘটনায় অভিযুক্ত ধর্ষণকারীরা সবাই উচ্চবর্ণের, ফলে তাদের মুক্তির দাবিতেও বিক্ষোভ হচ্ছে - এবং এই জাতপাতের রাজনীতি গোটা বিতর্ককে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
হাথরাসের নিহত তরুণীর জন্য সুবিচার চেয়ে দিল্লির যন্তরমন্তরে প্রতিবাদ-সভায় নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন দেশের নতুন দলিত সংগঠন ভীম আর্মির নেতা চন্দ্রশেখর 'রাবণ'।
তিনি বলছিলেন, "ভারতের এই নতুন রামরাজ্যে দলিতদের হাড়গোড় ভেঙে দেওয়া হবে, জিভ কেটে ফেলে ধর্ষণ করা হবে, তারপর মেরে ফেলে পরিবারকে না-জানিয়েই লাশ জ্বালিয়ে দেওয়া হবে।"
এই চাষের ক্ষেতেই তরুণীর ওপর চরম অত্যাচার চালানো হয়
[caption id="attachment_11828" align="aligncenter" width="566"]
এই চাষের ক্ষেতেই তরুণীর ওপর চরম অত্যাচার চালানো হয়[/caption]
যেহেতু নিহত ওই তরুণী ছিলেন বাল্মীকি বা সাফাইকর্মী সমাজের, তাই দিল্লির সব সাফাইকর্মীকে প্রতিবাদে কাজ বন্ধ রাখারও আহ্বান জানান তিনি।
কড়া নিরাপত্তায় মোড়া ইন্ডিয়া গেটে পুলিশ, প্রতিবাদকারীদের ঘেঁষতে না-দিলেও রাজধানী দিল্লির নানা প্রান্তে যেভাবে ওই ধর্ষিতা তরুণীর জন্য বিচার চেয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ হচ্ছে - ২০১২র শেষ দিকে নির্ভয়া-কাণ্ডের পর তেমনটা আর দেখা যায়নি।
এরই মধ্যে উত্তরপ্রদেশ পুলিশ ও প্রশাসনের বাধা টপকে নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে গিয়ে দেখা করেছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও।
দিল্লির বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন স্বরা ভাস্করের মতো বলিউড তারকাও, যিনি বলছিলেন, "মুশকিলটা হল ধর্ষণের একটা সংস্কৃতি আমাদের মজ্জায় মজ্জায় ঢুকে গেছে।"
"হাথরাস দেখিয়ে দিল এটা শুধু ধর্ষণকারীদের মধ্যেই সীমিত নয় - আমাদের পুলিশ, প্রশাসন সবাই যেন বিশ্বাস করে ধর্ষণে সব দোষ নিপীড়িত মেয়েটিরই, তাই অনায়াসে ভিক্টিম ব্লেমিং ও ভিক্টিম শেমিং করা চলে।"
[caption id="attachment_11829" align="aligncenter" width="547"]
রাহুল গান্ধীর হাথরাস যাওয়া ঠেকাতে সীমান্তে তাকে বাধা দিচ্ছে উত্তরপ্রদেশের পুলিশ[/caption]
"উত্তরপ্রদেশ পুলিশ এতটাই নির্লজ্জ যে এখন বলছে ধর্ষণই হয়নি, যেন ওই মেয়েটি মরতে মরতেও কাটা জিভ নিয়ে মিথ্যা জবানবন্দী দিয়ে গেছে," বলছিলেন স্বরা ভাস্কর।
রাষ্ট্রীয় লোকদলের নেতা জয়ন্ত চৌধুরীও বলছিলেন, "নির্যাতিতার পরিবারটির কথা ভাবুন - তারা বুঝে গেছেন সরকার তাদের পাশে নেই, বরং নানাভাবে ভয় দেখাচ্ছে।"
"পুলিশ তাদের মেয়ের লাশ রাতের অন্ধকারে বেআইনিভাবে জ্বালিয়ে দিয়েছে। তারপরও পরিবারটি ন্যায় (বিচার) চাইছে, তাদের পাশে সারা দেশের দাঁড়ানো উচিত।"
"একজন আজ্ঞাবাহক জেলাশাসককে সরিয়ে কোনও লাভ নেই, মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথকে সরতে হবে", দাবি মি চৌধুরীর।
রাজ্যের সন্ন্যাসী মুখ্যমন্ত্রী নিজে ঠাকুর সম্প্রদায়ভুক্ত - আর তার শাসনে উচ্চবর্ণের এই ঠাকুররা যা খুশি করেও পার পেয়ে যেতে পারে, এই ধারণা হাথরাসের পর আরও জোরালো হয়েছে।
কলকাতাতে সুফি হিউমানিটি ফাউন্ডেশনের আয়োজিত মোমবাতি প্রতিবাদ
[caption id="attachment_11830" align="aligncenter" width="579"]
প্রতিবাদ হচ্ছে কলকাতাতেও[/caption]
এই ঘটনায় অভিযুক্তরা সবাই ঠাকুর, আর ঘটনার পর অন্তত এক সপ্তাহ ধরে পুলিশ তাদের আড়াল করেছে বলেও অভিযোগ।
দেশব্যাপী নিন্দার ঝড়েরও মধ্যেও খোদ হাথরাসে কিন্তু অভিযুক্তদের সমর্থনে ঠাকুররা মিছিল করেছেন, স্থানীয় এক বিজেপি নেতার বাড়িতে রবিবার দিনভর মিটিংও হয়েছে।
হাথরাসের ঠাকুর নেতারা বিবিসিকে এমনও বলেছেন, "দুপক্ষের বক্তব্য শুনেই তদন্ত করতে হবে - আর নির্দোষদের মুক্তি দিতে হবে!"
এদিকে ভারতের দশ হাজারেরও বেশি বিশিষ্ট নাগরিক এক খোলা চিঠিতে ধর্ষণকারীদের কঠোরতম শাস্তিও চেয়েছেন - যাদের অন্যতম দিল্লির অ্যাক্টিভিস্ট মাইমুনা মোল্লা।
তিনি বিবিসিকে বলছিলেন, "ভাবুন, একটা গরিব, অসহায়, দলিত মেয়ে যার ওপর উচ্চবর্ণের ছেলেরা এই চরম অত্যাচার করেছে - অথচ সমাজের এলিটরা কিছু করেনি, উত্তরপ্রদেশ সরকার দোষীদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেয়নি।"
"উল্টে পুলিশ এখন নির্যাতিতার পরিবারেরই নার্কো টেস্ট করাতে বলছে, মামলাটা এমনভাবে সাজাতে চাইছে যেন ওই দলিত পরিবারই ষড়যন্ত্রকারী।"
"এটা মানুষ টের পেয়ে গেছে বলেই দেশ জুড়ে এই তীব্র প্রতিবাদ - এবং এটা ভারতের জন্য আরও একটা 'নির্ভয়া মোমেন্ট' হয়ে ওঠার সব লক্ষণও স্পষ্ট", বলছিলেন মাইমুনা মোল্লা।
এদিকে শাসক বিজেপির আইটি সেলের প্রধান অমিত মালভিয়া সোশ্যাল মিডিয়াতে ভিডিও পোস্ট করে এখনও প্রমাণ করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন ওই তরুণী ধর্ষিতা হননি।
সেই ভিডিওতে তরুণীর পরিচয় প্রকাশ করে তিনি দেশের আইন ভাঙলেও তার বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপই নেওয়া হয়নি।
ভয়েস/জেইউ।
উপদেষ্টা সম্পাদক : আবু তাহের
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : আবদুল আজিজ
সম্পাদক: বিশ্বজিত সেন
অফিস: কক্সবাজার প্রেসক্লাব ভবন (৩য় তলা), শহীদ সরণি (সার্কিট হাউজ রোড), কক্সবাজার।
ফোন: ০১৮১৮-৭৬৬৮৫৫, ০১৫৫৮-৫৭৮৫২৩ ইমেইল : news.coxsbazarvoice@gmail.com
Copyright © 2026 Coxsbazar Voice. All rights reserved.