ভয়েস নিউজ ডেস্ক:
‘বৌদ্ধ নেতা উসিট মং রাখাইনের নেতৃত্বে বাংলাদেশের বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর বিশ থেকে ত্রিশ জন নাগরিক দেশত্যাগ করে মিয়ানমারে রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার ষড়যন্ত্র করছিল। মূলত বহির্বিশ্বকে তারা বোঝাতে চেয়েছিল, বাংলাদেশে বাংলাদেশিরাই নিরাপদ নয়, সেখানে রোহিঙ্গারা নিরাপদে থাকবে কী করে।’ ২০১৭ সালের অক্টোবরে ঢাকার বিমানবন্দর থানায় সন্ত্রাস দমনবিরোধী আইনের একটি মামলার তদন্ত শেষে আদালতে দায়ের করা এক অভিযোগপত্রে এমনই তথ্য রয়েছে। গতবছরের ১৬ সেপ্টেম্বর বৌদ্ধ নেতা উসিট মং রাখাইন (৬৭)সহ তিনজনের বিরুদ্ধে ঢাকার আদালতে এই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। মামলাটি ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন।
মিয়ানমারের একটি বিদ্রোহী দলকে মদদ দেওয়া, দেশের অখণ্ডতা বিনষ্টের ষড়যন্ত্র ও আরও কিছু অভিযোগে ২০১৭ সালের ১৯ অক্টোবর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকা থেকে উসিট মং রাখাইনকে আটক করে র্যাব-১। পরে তাকে বিমানবন্দর থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাস দমন আইনে একটি মামলা হয়। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে মামলাটি র্যাব-১ তদন্ত করে।
উসিট মং ও রানার বিরুদ্ধে অভিযোগ
প্রায় আড়াই বছর পাঁচ তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলাটি তদন্ত করেন। সর্বশেষ র্যাব ১-এর সহকারী পুলিশ সুপার মো. কামরুজ্জামান মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি তদন্ত শেষে ২০২০ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর আদালতে তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযুক্তরা হলেন- উসিট মং রাখাইন (৬৭), গাজীপুর কালিয়াকৈরের স্থানীয় সাংবাদিক আইয়ুব রানা (৩৩), উসিট মংয়ের স্ত্রী এবং মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন আরাকান লিবারেশন পার্টির (এএলপি) নেতা সুম্রারাজ লিন প্রকাশ ম্যাম্যাও (পলাতক)।
চার্জশিটে র্যাবের তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, ‘অভিযুক্তরা দেশের সংহতি বিনষ্টের চেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন। সুম্রারাজ লিন প্রকাশ ম্যাম্যাও (৫৮) মিয়ানমারের নাগরিক। তিনি ওই দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন এএলপিরন সশস্ত্র যোদ্ধা। উসিট মংয়ের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া ল্যাপটপে তার স্ত্রীর যোদ্ধার বেশে কিছু ছবিও পাওয়া গেছে। বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনটি বৃহত্তম চট্টগ্রামকে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের অংশ বলে দাবি করে। অভিযুক্তরা বাংলাদেশে বসবাসরত রাখাইন সম্প্রদায়কে সংগঠিত করে তাদের মাধ্যমে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিসহ সন্ত্রাসী কার্যক্রম গ্রহণের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল।’
সাংবাদিক আইয়ুব রানার বিষয়ে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ‘২০০৬-২০০৭ সালের দিকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মুক্তিযোদ্ধাদের কথা পত্রিকায় লিখতে গিয়ে উসিট মং রাখাইনের সঙ্গে তার পরিচয়। উসিট মং ও তার স্ত্রীকে নিয়ে আইয়ুব লেখালেখি (ফিচার) তৈরি করেছেন। একপর্যায়ে উসিট মংকে দিয়ে রানা মিয়ানমার থেকে ফেসবুক, ইউটিউব ও অনলাইন টিভি খোলার প্রস্তাব দেন। যাতে তারা বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী প্রতিবেদন প্রচার করতে পারে। এ ছাড়াও পরিকল্পনা করে যে, তারাসহ আরও ২০-৩০ জন বাংলাদেশি মিয়ানমারে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইবে। যাতে তারা বোঝাতে পারে যে বাংলাদেশে বাংলাদেশিরাই নিরাপদ নয়, সেখানে রোহিঙ্গারা নিরাপদে থাকবে কী করে।’
অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘উসিট মং রাখাইন, তার স্ত্রী সুম্রারাজ লিন ও আইয়ুব রানা পরস্পরের যোগসাজশে বাংলাদেশের অখণ্ডতা, সংহতি ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করতে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিনষ্টের ষড়যন্ত্র এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনায় যুক্ত। যা প্রাথমিক তদন্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণে সত্য প্রতীয়মান হয়।’
উসিট মং ও রানা যা বললেন
৯ মাস কারাভোগ করে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হন অভিযুক্ত সাংবাদিক আইয়ুব রানা। র্যাবের দেওয়া অভিযোগপত্রে দুই নম্বর আসামি তিনি। আইয়ুব রানা গাজীপুরের কালিয়াকৈর প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সাপ্তাহিক সুবানী পত্রিকার সম্পাদক। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “প্রয়াত বেবী মওদুদ সম্পাদিত সাপ্তাহিক বিচিত্রা পত্রিকার জন্য ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠীদের মধ্যে যারা মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন, তাদের নিয়ে কাজ করেছি। তখন উসিট মং রাখাইনের সঙ্গে পরিচয় হয়। তাকে নিয়ে বিচিত্রা ছাড়াও একাধিক পত্রিকায় ফিচার, প্রতিবেদন হয়েছে। তাকে অনেকদিন ধরেই জানি। তিনি ২০১৭ সালের ১৯ সালের অক্টোবরে বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার হওয়ার একমাস পর তার স্ত্রী মিয়ানমার থেকে একদিন আমাকে ফোন করে উসিট মংয়ের বিষয়ে খোঁজখবর নেয়। এর তিন দিন পর র্যাব আমাকেও গ্রেফতার করে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের বিষয়ে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেগুলো সত্য নয়। উসিট মং তার এনজিওর একটি ওয়েবসাইট করতে চেয়েছিলেন। সে বিষয়ে আমার সঙ্গে আলাপ করেছিলেন। আমরা মিয়ানমার থেকে কোনও ইউটিউব চ্যানেল বা অনলাইন টিভি চালাতে চাইনি।’
নিজেকে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা দাবি করে আইয়ুব রানা বলেন, ‘আমি ২০০৩ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত কালিয়াকৈর সদর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলাম। আমি কোনও ষড়যন্ত্রে জড়িত নই।’
জামিন পেয়েছেন উসিট মং রাখাইন। নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন। অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনিও।
উসিট মং বলেন, ‘আমি মুক্তিযোদ্ধা। দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবো কেন? মানুষের সেবায় দেশের বিভিন্ন জেলায় কাজ করি। আমাদের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প ছিল।’
কে এই উসিট মং রাখাইন?
খোঁজ নিয়ে জানা যায় র্যাবের তদন্তে সন্ত্রাসবাদে অভিযুক্ত উসিট মং একজন তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা। তার বাড়ি বরগুনা জেলার তালতলীর ঠাকুরপাড়ায়। ১৯৭১ সালে ছিলেন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন ঠাকুরপাড়া থেকে। চার ভাই ও একবোনের মধ্যে সবার বড় উসিট মং। তার দুই ভাই মুক্তিযোদ্ধা। উসিট মং এখন ঢাকার মিরপুরে দুই সন্তান নিয়ে থাকেন। তবে তার স্ত্রী মিয়ানমারেই পলাতক।
রাখাইন ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন নামে উসিট মংয়ের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান (এনজিও) রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের বরগুনা, পটুয়াখালী এবং কক্সবাজার এলাকায় সেবামূলক কাজ করে বলে দাবি করেন উসিট মং।
তার বোন এথিন রাখাইন কক্সবাজার আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িত। ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনের পর চট্টগ্রাম থেকে আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যও ছিলেন এথিন।
এথিন রাখাইন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার ভাই একজন বয়োবৃদ্ধ সমাজসেবক। রাখাইন ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন নামে একটি এনজিও চালান। বৌদ্ধ ও মুসলিমসহ সব ধর্মের লোককেই সাহায্য করার চেষ্টা করেন তিনি।’
অন্যদিকে, উসিট মং রাখাইন তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা হলেও বরগুনার তালতলী উপজেলার ভারপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোসলেম আলী হাওলাদার তাকে মুক্তিযোদ্ধা মানতে নারাজ। তিনি বলেন, ‘উসিট মং রাখাইন মুক্তিযোদ্ধা নন। তার ভাই অংসিট মং রাখাইন মুক্তিযোদ্ধা। উসিট মং টাকা-পয়সা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সেজেছেন।’
মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন তালিকায় উসিট মংয়ের বিষয়ে সুপারিশ করবেন না বলেও তিনি জানান।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সহকারী পুলিশ সুপার কামরুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আদালতে উসিট মং রাখাইন ও সাংবাদিক আইয়ুব আলী দুজনই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তারা বাংলাদেশ, রোহিঙ্গাসহ বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল।’
অভিযোগপত্রে বাংলাদেশের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার স্থান, সময়সহ বিস্তারিত উল্লেখ নেই কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আসামিদের স্বীকারোক্তি, সাক্ষীদের সাক্ষ্যসহ তদন্তে যা পাওয়া গেছে তা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। সূত্র:বাংলাট্রিবিউন।
ভয়েস/জেইউ।
উপদেষ্টা সম্পাদক : আবু তাহের
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : আবদুল আজিজ
সম্পাদক: বিশ্বজিত সেন
অফিস: কক্সবাজার প্রেসক্লাব ভবন (৩য় তলা), শহীদ সরণি (সার্কিট হাউজ রোড), কক্সবাজার।
ফোন: ০১৮১৮-৭৬৬৮৫৫, ০১৫৫৮-৫৭৮৫২৩ ইমেইল : news.coxsbazarvoice@gmail.com
Copyright © 2026 Coxsbazar Voice. All rights reserved.