এম এ সাত্তার:
বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার উপ-পরিচালকের কার্যালয় ও কক্সবাজার বিভাগীয় বনবিভাগ (উত্তর/দক্ষিণ) কোনভাবেই বন্ধ করতে পারছেনা সরকারি সংরক্ষিত পাহাড় কাটা। জেলার অন্তর্গত প্রত্যেক উপজেলার কোন না কোন স্থানে প্রতিদিনই কাটা হচ্ছে সংরক্ষিত পাহাড়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কোন এলাকায় প্রশাসনকে লুকিয়ে,আবার অনেক স্থানে প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই চলে এই বেআইনি কর্মযজ্ঞ। গত ২/১ যুগের ব্যবধানে এদেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বনাঞ্চল ধ্বংস করা হয়েছে। একশ্রেণির প্রভাবশালী ব্যক্তির ভোগলিপ্সা ও বন রক্ষায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চরম দুর্নীতি, অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনাই বনাঞ্চল ধ্বংস হওয়ার প্রধান কারণ বলে মনে করেন সচেতন মহল।
পাহাড় কাটা আইনগত দন্ডনীয় অপরাধ হলেও জেলায় চলছে পাহাড় কাটার মহোৎসব।একটি সূত্র জানায়, বন, পরিবেশের কর্মকর্তা কর্মচারী,স্থানীয় এলাকার ভূমিদস্যুদের সমন্বয়ে সংরক্ষিত পাহাড় ও টিলা কাটা হয় বা হচ্ছে। তবে স্থানীয়দের গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বনবিভাগ কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তরের লোকজন অভিযান চালিয়ে শ্রমিক, পাহাড় কাটার সরঞ্জামাদি,ব্যবহৃত পরিবহন আটক করলেও ধরাছোঁয়ার (মামলা, জেল, জরিমানা) বাইরে থেকে যায় পাহাড় কাটার সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যারা নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। এমনকি পাহাড় খেকোদের বিরুদ্ধে কোন মামলা বা আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়না।
পাহাড় কাটার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন থাকলেও তার প্রয়োগ না থাকায় জেলাজুড়ে দিনদুপুরেই কাটা হচ্ছে পাহাড়।
এমন অপকর্ম থামাতে তৎপর নয় সংশ্লিষ্ট বনবিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তর।তাদের এমন উদাসীনতায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পাহাড়, টিলা, প্রকৃতি ও বনজ পরিবেশ, অভিযোগ স্থানীয়দের। যেকোন প্রত্যন্ত অঞ্চলে পা বাড়ালেই প্রাণীকূলের জন্য মহান আল্লাহ তায়ালার অপূর্ব সৃষ্টির একটি প্রাকৃতিক পেরাগখ্যাত পাহাড় গুলোর বুকে ভূমিদস্যুদের নোংরা হাতের মুঠোর কুদালের আঘাতের চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায়।এমন ধ্বংসাত্মক দৃশ্যই চোখে পড়েন প্রতিনিয়তই।
পাহাড় খেকোদের এমন বেপরোয়া নির্দয় মনোভাবের কারণে দিন প্রতিদিন এ প্রাকৃতিক ধ্বংসযজ্ঞ বেড়েই চলেছে।কেউ পাহাড় কেটে পাদদেশে বসতঘর নির্মাণ করছেন। অনেকেই করছেন মাটি বিক্রি। আবার কেউ তৈরি করছেন বহুতল ভবন বা রিসোর্ট। সাথে রাস্তা তৈরি বা মেরামতের অজুহাতে পাহাড় কাটা হয়েছে।
বনাঞ্চল বেষ্টিত একাধিক উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, লেজ-কল্লা ছাড়া ক্ষতবিক্ষত পাহাড়।গতকয়েক মাসের মধ্যেই অসংখ্য পাহাড় সাবাড় হয়ে যায়।বিশেষ করে পিএমখালীর ছনখোলা ঘাটঘর বাজারের উত্তরে বাদশাহর বাপেরঘোনায় একটি সুউচ্চ পাহাড়ের তিন দিক দিয়ে (দক্ষিণ পশ্চিম-পূর্ব) কেটে সমতল ভূমিতে পরিণত করেন মৃত ছৈয়দ নুরের পুত্র জামাল উদ্দিন গ্যং, অভিযোগ এলাকাবাসীর। বৃষ্টির পানি পড়লেই পাহাড় কাটা শুরু করেন সুচতুর জামাল গং। তাদের পাহাড় কাটার মাটি পানির সাথে ভেসে এসে অন্যের ঘরবাড়ির উঠান,পথঘাট কাঁদা হয়ে রাস্তা চলাচলে ব্যাপক দুর্ভোগ পোহাতে হয় মানুষের।যে কারণে পাহাড় খেকো জামাল গংয়ের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে প্রাকৃতিপ্রেমিক স্থানীয় এক যুবক প্রতিকার চেয়ে বন, পরিবেশ, ইউএনও',ডিসি বরাবর ১৩/৯/২২ তারিখে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। এই খবরে বেজায় নাখুশ অভিযুক্ত জামাল গং।তাই প্রতিশোধ পরায়ণে গভীর রাতে (রাত ১টায়) অবৈধ অস্ত্র শাস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আট/দশজনের একটি সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে অভিযোগকারীর বাড়ি ঘিরে রেখে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন এবং বেশকিছুক্ষন অবস্থান করেন। পরে স্থানীয়দের তোপের মুখে তাকে হামলা করতে না পেরে চলে যেতে বাধ্য হলেও বলে গেছেন, অভিযোগ প্রত্যাহার না করলে যখন, যেখানে পাবেন হাত-পা ভেঙে দিয়ে সারাজীবন বিছানায় শুইয়ে রাখবেন। সেদিন থেকে নিরাপত্তাহীনতায় আছেন বলে প্রতিবেদকের মুঠোফোনে বিস্তারিত জানিয়েছে জনৈক অভিযোগকারি।
এ ব্যাপারে অভিযুক্ত মোঃ জামাল হোসেন পাহাড় কাটার কথা স্বীকার করে বলেন, কোন সমস্যা নেই। মামলা হলে ৫ হাজার টাকা দিয়ে জামিন নিবেন।আর ২/৩ মাস পরপর কোর্টে আদালতে হাজিরা দিয়ে আসবেন। বসতবাড়ি সহ ১০০ শতাংশের মতো বনের জমি তার দখলে আছে। কিছুদিন আগে ২গন্ডা বিক্রি করেছে ১ লাখ ৬০ টাকা দিয়ে। পর্যায়ক্রমে সবজমি বিক্রি করে দিয়ে রেজিঃজমি ক্রয় করে ঘর করে বসবাস করবেন।
প্রতিদিন প্রকাশ্য দেখা যায় বন বা পরিবেশের ছাড়পত্র ছাড়াই অবাধে পাহাড় কেটে তা ডাম্পার গাড়ি বহনে অন্যত্রে সরিয়ে নেওয়ার দৃশ্য। সদর উপজেলার ইসলামপুর, ঝিলংজা, খুরুশকুল, চৌফলদণ্ডী ইউপিতে কমবেশি প্রকাশ্য কাটা হচ্ছে পাহাড়। তবে দেদারসে পাহাড় কাটা হচ্ছে পিএমখালী রেঞ্জের (খুরুশকুলের গুচ্ছ গ্রাম, তেতৈয়া, রুহুল্লার ডেইল, হামজার ডেইল, ছনখোলা, ঘোনাপাড়া, ইউপাহাড়নূস ঘোনা, তোতকখালী) আওতাভুক্ত এলাকায়। গতমাসে একটি অভিযান হলে মাটিভর্তি একটি ডাম্পার আটক হয়। এরপর দুইএকদিন পাহাড় কাটার মাটি বালি বহনে প্রকাশ্য দেখা যায়নি ডাম্পার। এখন আবার পাহাড় কাটা মাটিভর্তি ডাম্পার চলাচল স্বাভাবিক দেখা যাচ্ছে।
স্থানীয় পাহাড় খেকোদের বিরুদ্ধে মোহাম্মদ আলী নামের এক প্রতিবাদী জানান, ‘পাহাড়ের বোবা কান্না কে শোনে? চোখের সামনেই তো পাহাড় কেটে আমাদের সবুজ প্রকৃতি ধ্বংস করা হচ্ছে। আমরা প্রতিবাদ করছি। নিজের টাকা খরচ করে সরকারি বিভিন্ন অফিসে চিঠি দিচ্ছি, কিন্তু এতকিছুর পরও পাহাড় রক্ষায় কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না প্রশাসন।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার সদর উপজেলা সভাপতি এনামুল হক চৌধুরী জানান,অব্যাহত পাহাড়/ টিলা কাটার ফলে জেলার জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এ অঞ্চলের নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। আর এরই সাথে বদলে যাচ্ছে ভূমানচিত্রও।তাই প্রকৃতিকে বাঁচাতে পাহাড় খেকোদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নিতে তিনি সংশ্লিষ্টদের প্রতি জোর দাবি জানান।
বক্তব্য জানতে কক্সবাজার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (উত্তর) আনোয়ার হোসেন সরকারের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও ফোন রিসিভ করেননি।এ ব্যাপারে পাহাড় কাটার জড়িতদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার সত্যতা স্বীকার করে স্থানীয় বিট অফিসার মোঃ মোশাররফ হোসেন বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে সরেজমিনে স্থান পরিদর্শন করে পাহাড় কাটার প্রমাণ পেয়েছেন। শীঘ্রই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিবেন।
ভয়েস/জেইউ।
উপদেষ্টা সম্পাদক : আবু তাহের
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : আবদুল আজিজ
সম্পাদক: বিশ্বজিত সেন
অফিস: কক্সবাজার প্রেসক্লাব ভবন (৩য় তলা), শহীদ সরণি (সার্কিট হাউজ রোড), কক্সবাজার।
ফোন: ০১৮১৮-৭৬৬৮৫৫, ০১৫৫৮-৫৭৮৫২৩ ইমেইল : news.coxsbazarvoice@gmail.com
Copyright © 2026 Coxsbazar Voice. All rights reserved.