শাহাব উদ্দীন সিকদার,মহেশখালী:
যার পান খান তারা মনের অজান্তেই গুন গুন করে পান চিবিয়ে গেয়ে উঠেন “যদি নতুন একখান মুখ পাইতাম, যদি নতুন একখান মুখ পাইতাম, মইশখাইল্যা পানের খিলি তারে বানাই খাওইতাম। নর—নারীর হাউশের পিরীত। কি মজা তারে বুঝাইতাম, আমি কি মজা তারে বুঝাইতাম।মইশখাইল্যা পানের খিলি তারে বানাই খাওইতাম।” শেফালী ঘোষের জনপ্রিয় হুদয়দোলা এ গান।
মহেশখালীর মিষ্টিপান সে যুগেও যেমন, এই যুগেও তেমনি মন কেড়ে নেয় ছোট বড় সকল মানুষের। এই মিষ্টিপান মহেশখালীতে পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষনীয় মুখরোচক খাদ্যপণ্য হিসেবে বেশ জনপ্রিয় ও পরিচিতি লাভ করেছে।
সময়ে ব্যবধানে সেই মিষ্টি পান এখন বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক প্রসার ঘটিয়ে এলাকা, অঞ্চল পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানী হচ্ছে।
গত দুইদিন মহেশখালীর পান বাজার ঘুরে দেখাযায়, শীতের শুরুতে পানের দাম ও কদর বৃদ্ধি পাওয়ায় পানচাষিরা বড় আকারের এক ঝুড়ি পান বিক্রি করে মূল্য পাচ্ছেন লাখ টাকারও বেশি। গোরকঘাটা বাজারের এক পান ব্যবসায়ী সজল কান্তি দে জানান এক সপ্তাহের ব্যবধানে ছোট মাঝারি সাইজের পানের বিড়ার দাম বেড়েছে ২৪০ টাকা থেকে ২৭৫ টাকা।
মহেশখালীতে উৎপাদিত বড় পান চট্টগ্রাম—ঢাকায় এক বিড়া বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত। মিষ্টি পানের দাম এক সপ্তাহ ধরে বেড়ে যাওয়ায় চাষিরা খুশি। বর্তমানে মহেশখালীতে বড় পান প্রতি বিড়া বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায়। জানা গেছে, যুগের পর যুগ ধরে উপজেলার বড় মহেশখালী, হোয়ানক, কালারমারছড়া, ছোট মহেশখালী ও শাপলাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন পাহাড়ি ঢালু ও আবাদি কৃষিজমিতে পান চাষ করে আসছে স্থানীয় চাষিরা। পাহাড়ি এলাকায় পান চাষ দুই—তিন বছর স্থায়ী হলেও কৃষিজমিতে পান চাষ টিকে মাত্র ৫ থেকে ৬ মাস। তবে কৃষি জমিতে পান চাষ সেপ্টেম্বর—নভেম্বর মাস থেকে শুরু হয়ে তা মে মাসে শেষ হয়। আর পাহাড়ি এলাকায় পান চাষ যেকোন সময়ে করা যায় বলে জানিয়েছেন ঠাকুর তলার পান চাষিরা।
মহেশখালী উপজেলায় গোরকঘাটা, বড় মহেশখালী নতুন বাজার, হোয়ানক ইউনিয়নের টাইম বাজার, পানিরছড়া বাজার, কালারমারছড়া বাজার ও শাপলাপুর বাজারে পানের বাজার বসে। সপ্তাহে দুইদিন এসব পান বাজারে পান বিক্রি হয় যাকে স্থানীয় ভাষায় পানের টাইম বলে। হোয়ানকের টাইম বাজারে গিয়ে দেখা যায়, গতকাল পান বেচা—কেনা করতে শতাধিক চাষি পান নিয়ে বাজারে এসেছে। আর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত যেমন পটিয়া,সাতকানিয়া এবং চট্রগ্রাম থেকে আসা পান ব্যবসায়ীরা চাষিদের কাছ থেকে পান কিনে নিচ্ছে। পরে এসব পান ট্রাকভর্তি করে ব্যবসায়ীরা চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যায়।
উপজেলা সহকরি কৃষি অফিসার দিদারুল ইসলামের তথ্যমতে, মহেশখালীর পাঁচ ইউনিয়নের পাহাড়ে এবং সমতল মিলে এ পেশায় ৩৫ হাজারের মত চাষির পাশাপাশি আশি হাজরের মত মানুষ জড়িত রয়েছেন। বড় মহেশখালী পান ব্যবসায়ি সমিতির এক জন নেতা জানান বিগত দিনের চেয়ে এখন পানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন চাষিরা। ফলে পান চাষিদের মনে আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। সেই সাথে এবারের শীত মৌসুমে হাজার হাজার পর্যটক মহেশখালী ভ্রমন শেষে চলে যাওয়ার সময় সাথে করে নিয়ে যাবে বন্দু বান্ধব, স্বজনের জন্য আর মুখে পুরে নিবে এক খিলি মিষ্টি পান সেই সাথে ভ্রমন আনন্দ আর মিষ্টি পানের তৃপ্তির ঢেঁকুর এক সাথে মিশে একাকার হয়ে বিদায় জানাবে সাগর কন্যা মহেশখালীকে।
তথ্যে সূত্রে জানা যায়, জেলার সবচেয়ে বেশি মিষ্টি পান উৎপাদন হয় মহেশখালী উপজেলায়। পাশাপাশি কুতুবদিয়া ছাড়া অন্য ৭ উপজেলায় সল্প মাত্রায় উৎপাদন হয় মিষ্টি পান। কক্সবাজার জেলায় অন্তত ৩ হাজার হেক্টর জমির মধ্যে মহেশখালীতে ১৮০০ হেক্টর ও চকরিয়া, পেকুয়া, রামু, সদর, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় ১৪০০ হেক্টর জমিতে পান চাষ হয়। । তবে শীতের শুরুতে প্রতি বছরের ন্যায় বাজারে হু হু করে বাড়তে শুরু করেছে আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী অতিথি আপ্যায়নের অন্যতম উপাদান পানের দাম। বরাবরের মত পহাড়ি দ্বীপ কক্সবাজারের মহেশখালীতে উৎপাদিত পানের কদর ছিল সব সময় বেশি।
মহেশখালী কলেজের একজন প্রবীণ শিক্ষক জানান, বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালীর মাটি ও আবহাওয়ায় বেশি জন্মে। এই মিষ্টিপান এক সময় রাজা—মহারাজারা অতিথি আপ্যায়নে পরিবেশন করতেন বাহারী সব মশলা দিয়ে তৈরি করা খিলি পান। সেইকাল থেকেই পানের কদর আজও আছে সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে।
স্থানীয় এক প্রবীণ মুরব্বি (যিনি মহেশখালী—রেঙ্গুন ব্যবসা করেছেন) জানান, তার সাথে অনেকেই মনে করেন, সম্রাট আকবরের আমল থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে পানের জনপ্রিয়তা বাড়ে। আঠারো শতকের শেষে চট্টগ্রামে আসা ড. ফ্রান্সিস বুকানন মহেশখালী দ্বীপে পানের বরজ দেখতে পান আর সেই গল্প নাকি লিপিবদ্ধ রয়েছে তাঁর ভ্রমণকাহিনিতে।
ভয়েস/জেইউ।
উপদেষ্টা সম্পাদক : আবু তাহের
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : আবদুল আজিজ
সম্পাদক: বিশ্বজিত সেন
অফিস: কক্সবাজার প্রেসক্লাব ভবন (৩য় তলা), শহীদ সরণি (সার্কিট হাউজ রোড), কক্সবাজার।
ফোন: ০১৮১৮-৭৬৬৮৫৫, ০১৫৫৮-৫৭৮৫২৩ ইমেইল : news.coxsbazarvoice@gmail.com
Copyright © 2026 Coxsbazar Voice. All rights reserved.