বিশেষ প্রতিবেদক:
মিয়ানমারের আলোচিত সন্ত্রাসী সংগঠন আরকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি ‘আরসা’র ৬টি টর্চার সেল রয়েছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। মিয়ানমারে বসে এসব টচার্র সেল নিয়ন্ত্রণ করেন সংগঠনটি শীর্ষ নেতা আতা উল্লাহ জুনুনি। আর এসব টর্চার সেলে নিয়মিত চলে বন্দি নির্যাতন ও নানা অপরাধ কর্মকান্ড।
বৃহস্পতিবার রাতে ‘আরসা’র টর্চার সেলের প্রধান ওসমান ওরফে সালমান মুরব্বি গ্রেপ্তার হওয়ার পর র্যাবকে এ তথ্য জানান। র্যাব উক্ত টর্চার সেলের সন্ধানে মাঠে কাজ করছে বলে জানান র্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়নের আইন ও গণমাধ্যম শাখার প্রধান কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
শুক্রবার দুপুরে র্যাব—১৫ কক্সবাজার কার্যালয়ে এক প্রেসব্রিফিংয়ে খন্দকার আল মঈন জানান, ‘কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প সংলগ্ন গহীন পাহাড়ে অভিযান চালিয়ে মিয়ানমারের রাখাইন ষ্টেট কেন্দ্রিক সন্ত্রাসী গ্রুপ আরকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি ‘আরসা’র দুই কমান্ডারকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। অভিযান চলাকালে র্যাব আরসার একটি টর্চার সেলের সন্ধান পায়। ওই টর্চার সেল থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে একটি ৯এমএম বিদেশী পিস্তল, ৪ রাউন্ড গুলি, ৪টি একনলা ওয়ান শুটার গান, ২টি এলজি, ৫ রাউন্ড ১২ বোর কার্তুজ এবং বিপুল পরিমাণ টর্চার সেলের সরঞ্জামাদি (১টি কুড়াল, ৩টি বিভিন্ন সাইজের প্লাস, ১টি কাঠের লাঠি, ১টি স্টিলের লাঠি, ১টি করাত, ১টি নাম চাকু, ১টি লোহার রড, ১টি লোহার দা, ১টি হ্যাংগিং হুক, ১টি সিসর, ৪টি ভালা, ৩টি বড় লোহার পেরেক, ২টি লোহার শিকল, ১টি রশি, ১টি কুপি বাতি এবং সুইসহ সুতার ১টি বান্ডেল)। উদ্ধার করা হয়।

গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে আরসার শীর্ষ কমান্ডারদের একজন আরসার ওলামা বডি ও টর্চার সেলের প্রধান ওসমান প্রকাশ সালমান মুরব্বি ও মো: ওসমান। উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ওরা বসবাস করে আসছিল।
খন্দকার আল মঈন জানান, সালমান মুরব্বি ২০১৭ সালে সপরিবারে অবৈধপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করে উখিয়ার থাইংখালীর শরণার্থী ক্যাম্প—১৩ এর ব্লক ডি/ এ বসবাস শুরু করে। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে সে আরসার ওলামা কাউন্সিলের অন্যতম সদস্য ও কমান্ডার মৌলভী মোস্তাক আহম্মদ এবং মৌলভী আবু রায়হানের সাথে সাক্ষাতের মাধ্যমে 'আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) এ যোগদান করে। সংগঠনে যোগদানের পর আরসার শীর্ষ নেতাদের নিকট অস্ত্র চালনাসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। পর্যায়ক্রমে সে ১৩ নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ব্লক জিম্মাদার, হেড জিম্মাদার এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আরসার ওলামা বডির প্রধান হিসেবে নেতৃত্ব লাভ করে। তার নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে শরণার্থী শিবিরে আরসার দাওয়াত গ্রুপের অন্যতম সদস্য মৌলভী লাল মোহাম্মদ এর নেতৃত্বে ১০/১২ জনের একটি গ্রুপ তৈরী করে, যারা শরণার্থী শিবিরে বসবাসকারী তরুণ ও যুবকসহ সাধারণ রোহিঙ্গাদেরকে প্রলোভন দেখিয়ে অথবা জোরপূর্বক আরসায় যোগদান করতো। তার এই কার্যক্রমের মাধ্যমে এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ হাজার রোহিঙ্গা আরসায় যোগদান করেছে। এজন্য সে প্রতি মাসে আরসার হাতে মোটা অংকের টাকা পেতো এবং তার মাধ্যমেই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে লোমা বস্তির অন্যান্য সদস্যদের জন্য নির্ধারিত টাকা আসতো। সে আরসার প্রধান আতাউল্লাহ ও আরসার সেকেন্ড ইন কমান্ড ওস্তাদ খালেদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতো। সে আরসার শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দের সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন গ্রুপে যুক্ত ছিল। উক্ত গ্রুপসমূহের মাধ্যমে শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ তাকে শরণার্থী শিবিরে আবসার কার্যক্রম সংক্রান্ত বিভিন্ন নির্দেশনা প্রদান করতো। শরণার্থী শিবির ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় কোন ধরণের হামলা বা নাশকতার জন্য সন্ত্রাসী সংগঠন আরসার সদস্যরা সালমান মুরব্বীর পরামর্শে হামলা ও অরাজকতা সৃষ্টি, হত্যাকান্ড, অপহরণসহ নানাবিদ সন্ত্রাসী কার্যক্রম সংঘঠিত করতো। এ সকল অপরাধের বিষযয় সালমান মুরগী আরসা প্রধান আতাউল্লাহ'র নিকট থেকে অনুমতি গ্রহণ করতো।
র্যাবের এই কর্মকর্তা আরও জানান, গ্রেফতারকৃত সালমান মুরব্বীর নেতৃত্বে ওলামা বডির অন্যান্য সদস্যরা আরসার নতুন সদস্য যোগদানে উদ্বুদ্ধ করণের পাশাপাশি আরসা হতে বের হয়ে বিভিন্ন নেতৃত্বদানকারীদের হত্যার পরিকল্পনা, হামলা, ভয় ভীতি প্রদর্শন করতো। এছাড়া শরণার্থী ক্যাম্প এ পার্শ্ববর্তী এলাকা সমূহে অনাজকতা ও আতঙ্ক সৃষ্টিসহ খুন, অপহরণ, ডাকাতি, মাদক, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিচারসহ বিভিন্নন্ন ধরণের সন্ত্রাসী কর্মকাজ পরিচালনা করতো। আরসা ওলামা বডির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অংশগ্রহণে রোহিঙ্গা ক্যাম্প এ সকল অপরাধের ফলে শরণার্থী শিবিরে বসবাসরত শরণার্থীরা সবসময় ভীত সন্ত্রস্ত থাকতো। কেউ তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে তাকে অপহরণ ও হত্যাসহ ক্ষেত্র বিশেষ লাশ গুম করতো।
র্যাব আরও জানায়, আরসা প্রধান আতাউল্লাহর নির্দেশনায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আরসার আধিপত্য এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রম নিরবিচ্ছিন্নভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে আরসা ২০১৯ সালের শেষের দিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভিতরে ও ক্যাম্প সংলগ্ন পাহা ও গহীন জঙ্গলে ৫ থেকে ৬টি টর্চার সেল/কাচারী স্থাপন করে। আরসার কমান্ডার আবু আনাছ সবপ্রথম টর্চার সেলের প্রধানের দায়িত্ব পালন করে। পরবর্তীতে মৌলভী আকিজ ওলামা বডির প্রধানের দায়িত্ব নেয় এবং চলতি বছরের শুরুতে সে মিয়ানমারে চলে গেলে গ্রেফতারকৃত সালমান মুরব্বি ওলামা বডির প্রধান ও উক্ত টর্চার সেলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে।
বর্তমানে রোহিঙ্গা ক্যাম্প'কে কয়েকটি জোনে বিভক্ত করে গ্রেফতারকৃত সালমান মুরব্বীর নেতৃত্বে মাষ্টার কামাল, মাষ্টার ইউনুছ, জাফর আলম, মৌলভী যুবানোর, মাষ্টার আবুল হাদিম, মাষ্টার সলিম প্রমুখ আরসার কমান্ডাররা এই ভয়ংকর কাচারী বা টর্চার সেলের বিভিন্নভাবে সাধারণ রোহিঙ্গাদের নির্যাতন করে। এছাড়াও শরণার্থী শিবিরের বিভিন্ন লোকজন ও স্থানীয় বাঙ্গালীদের অপহরণ করে টর্চার সেলে আটকে রেখে নির্যাতনের মাধ্যমে বড় অংকের মুক্তিপণ আদায় করতো, কখনও কখনও চাহিদা মতে মুক্তিপণের টাকা আদায় করতে অপহৃত ব্যক্তির উপর পৈশাচিক নির্যাতন চালাতো। গ্রেপ্তারকৃত সালমান মুরব্বির বিরুদ্ধে ৬টি মামলা রয়েছে। গ্রেপ্তার ওসমান গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই এর কর্মকর্তা হত্যাকান্ড সহ রোহিঙ্গা ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকায় বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর ও আলোচিত হত্যাকান্ডে সরাসরি জড়িত।
ভয়েস/জেইউ।
উপদেষ্টা সম্পাদক : আবু তাহের
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : আবদুল আজিজ
সম্পাদক: বিশ্বজিত সেন
অফিস: কক্সবাজার প্রেসক্লাব ভবন (৩য় তলা), শহীদ সরণি (সার্কিট হাউজ রোড), কক্সবাজার।
ফোন: ০১৮১৮-৭৬৬৮৫৫, ০১৫৫৮-৫৭৮৫২৩ ইমেইল : news.coxsbazarvoice@gmail.com
Copyright © 2026 Coxsbazar Voice. All rights reserved.