আবদুল আজিজ :
মোজাম্মেল হক। বয়স ষোলর কাছাকাছি। ভাড়াবাসায় থাকেন কক্সবাজার শহরের সমিতিপাড়া এলাকায়। দীর্ঘ ৫ বছর ধরে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে বিচ বাইক চালিয়ে সংসার চালায় সে। বাসায় বৃদ্ধ মা—বাবা ও দুই বোন এক ভাই। সংসারের সব খচর বিচ বাইকের উপর। সৈকতে পর্যটক বেশী আসলে বাড়ে আয়, আর পর্যটক কম আসলে কমে যায়। কিন্তু, বিচ বাইকের দৈনিক আয় এভাবে কমে যাবে কল্পনাও করতে পারেনি সে। একের পর এক হরতাল—অবরোধে দিশেহারা মোজাম্মেল। বিচ বাইকের উপর আয়—রোজগার করা মোজাম্মেলের পরিবারে এখন চলছে নিরব কান্না।
মোজাম্মেল বলেন, ‘গত মহামারি করোনার সময় যখন সৈকতে পর্যটক আসা কমে যায়, তখনও কোন রকম সংসার চালিয়েছি। কিন্তু, চলতি মাসে বিএনপি ও জামায়াতের হরতাল—অবরোধ অব্যাহত থাকায় ভাটা পড়ে পর্যটকে। এতে করে টানাপোড়ানে পড়ে সংসার। কমে গেছে দৈনিক আয়। সংসার চলছে ধার—কর্জ করে।’
শুধু মোজাম্মেল নয়, মোজাম্মেলের মত রয়েছে দুই শতাধিক বিচ বাইক চালক। এতের প্রত্যেকের সংসারে চলছে দু:খ—দুর্দশা। বিকল্প রোজগারের উপায় খুজছেন অনেকে।
সৈকতে কথা হয় ১৪বছরের কিশোর সাইফুল আলমের সাথে। ১০ বছর বয়স থেকে সৈকতে ঘোড়া নিয়ে ছুটে চলা তার। পর্যটকদের ঘোড়ার পিঠে ছড়িয়ে দৈনিক আয় করে চলে সংসার। আয়ের কিছু অংশ ঘোড়ার মালিককেও দিতে হয়। পর্যটক বেশী আসলে ভাল আয় হয়। কিন্তু, বিএনপি—জামায়াতের টানা হরতাল—অবরোধে নেই বললে চলে পর্যটক। এতে করে আয় হচ্ছে খুব সীমিত। দৈনিক যে আয় গুলো হয়, তাতে মালিক ও ঘোড়ার খাদ্যের জোগান দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। তাই, সংসারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে’।
সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্ট ঘুরে দেখা যায়, বিচ বাইক, ঘোড়া, ফটোগ্রাফার, কিটকট, জেটিস্কিপ ও ভ্রাম্যমান ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পড়েছে মহা বিপাকে। শুধু এসব পর্যটন ব্যবসায়ীরা নয়, হরতাল—অবরোধের কবলে পড়েছে হোটেল—মোটেল মালিকেরাও। বিএনপি—জামায়াতসহ সরকার বিরোধীদের ডাকা হরতাল—অবরোধের কারণে পর্যটনের ভর মৌসুমে কক্সবাজারে পর্যটক নেই। এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে সামনের দিনগুলোতে পর্যটক শূণ্য হয়ে পড়বে দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজার। এতে পর্যটন শিল্প খাতে ধস নামার আশংকা করছেন ব্যবসায়িসহ সংশ্লিষ্টরা।
পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশি—বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনার প্রধান আকর্ষণ বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত নগরী কক্সবাজার। চলতি বছরের অক্টোবরের আগে প্রতিদিনই কক্সবাজারে সোয়া পাঁচ শতাধিক হোটেল—মোটেলের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কক্ষ বুকিং এবং অন্তত অর্ধলক্ষাধিক পর্যটক সমাগম হতো। শুক্র ও শনিবারসহ সরকারি ছুটির দিনগুলোতে পর্যটক আগমনের এ সংখ্যা লক্ষাধিক ছড়াতো। কিন্তু, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সরকার বিরোধী দলগুলোর লাগাতার হরতাল—অবরোধ কর্মসূচীর কারণে তা নেমে এসেছে ৫ থেকে ১০ শতাংশে। এতে পর্যটক আগমনের সংখ্যা নেমে এসেছে ১০ থেকে ১৫ হাজারে। সৈকতে পর্যটক না থাকায় কোলাহল মুখর পরিবেশে বিরাজ করছে অনেকটা নির্জীবতা। বালিয়াড়িতে সাজিয়ে রাখা কিটকটগুলোও রয়েছে কিছুটা ফাঁকা। হরতাল—অবরোধের মধ্যেও ভয় আর আতংক নিয়ে কিছু সংখ্যক পর্যটক কক্সবাজার ঘুরতে এসেছেন। এসব পর্যটকের চোখে আতংকের চাপ। তারা জানিয়েছেন, অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আতংকের কারণে তাদের সফর সংক্ষিপ্ত করে ভ্রমন শেষে কক্সবাজার ত্যাগ করবেন।
বিমানযোগে ঢাকা বাড্ডা থেকে কক্সবাজার ভ্রমনে এসেছেন পর্যটক দম্পতি সাহেদুল ইসলাম ও আফরোজা। পর্যটক দম্পতি বলেন, ‘হরতাল—অবরোধে এই রকম ফাকা সমুদ্রসৈকত তখনও দেখেনি। পর্যটনের এই ভরা মৌসুমে বিপুল পরিমাণ পর্যটক থাকার কথা ছিল। কিন্তু, এ সময়ে পর্যটক শুন্য। সত্যি খারাপ লাগছে। আমাদের মত যারা বিকল্প পথে কক্সবাজার ঘুরতে এসেছেন, হয়তো তাদের এ রকম লাগতে পারে। ভ্রমনের সূচী সংক্ষিপ্ত করে দ্রুত চলে যাবে ঢাকায়।’
হোটেল—মোটেলসহ পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িরা বলছেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে চলতি বছর কিছুটা আগেই পর্যটকদের আনাগোনা শুরু হয়েছে। এতে আশায় বুক বেঁধেছিলেন পর্যটন তারা। কিন্তু গত তিন সপ্তাহ ধরে অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তা আশায় গুড়েবালিতে পরিণত হয়েছে।
কক্সবাজার হোটেল—মোটেল গেষ্ট হাউজ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো: সেলিম নেওয়াজ বলেন, ‘এক কথায় পর্যটন ব্যবসায় দিন ভাল যাচ্ছে না। একের পর এক হরতাল—অবরোধে ৫ শতাধিক হোটেল মোটেল ফাকা। অথচ প্রতি বছর এই মৌসুমে লাখো পর্যটকে মুখর থাকতো কক্সবাজার। কিন্তু, চলমান হরতাল—অবরোধের কারণে পর্যটন শিল্পে ধ্বস নেমেছে। এ থেকে উত্তোরণের কোন উপায় বের করার দাবি জানাচ্ছি।’
পর্যটকবাহি যানবাহন হরতাল মুক্তের দাবি জানিয়ে কলাতলী মেরিন ড্রাইভ হোটেল মোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মৌখিম খান বলেন, ‘টানা হরতাল অবরোধে পর্যটনের হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। হোটেল মোটেল শুরু করে সৈকতে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সহ পর্যটনে সাথে আড়াই লাখ মানুষ জড়িত। কিন্তু, পর্যটক আসতে না পারায় তাদের কপালে চিন্তার বাজ পড়েছে। এবাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে অনেকে হোটেল মোটেল বন্ধ করে দিবে। এতে বেকার হয়ে পড়বে অনেকে। তাই, অন্তত ঢাকা ও বিভিন্ন এলাকা থেকে যেসব পর্যটকবাহি যান কক্সবাজার ভ্রমনে আসবে, এসব বাসা ও গাড়ী গুলোকে হরতালের আওতামুক্ত করা হউক’।
কক্সবাজার চেম্বার অব ইন্ড্রাস্টি্রও সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, ‘দেশে অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করায় ভয় আর আতংকের কারণে পর্যটক আগমনের সংখ্যা হতাশাজনক। মৌসুমের শুরুতে গত দুই সপ্তাহ ধরে আশানুরূপ পর্যটক না আসায় ক্ষতি ছাড়িয়েছে অন্তত হাজার কোটি টাকার বেশী। দেশে এ ধরণের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করলে পর্যটকের খরায় ধস নামবে পর্যটন শিল্পখাতে’।
শুধু সমুদ্র সৈকত নয়, পর্যটকের খরার এ দৃশ্য প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন, ইনানীর পাথুরে সৈকত, হিমছড়ি ঝর্ণা, শহরের বার্মিজ মার্কেট, মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির, রামু বৌদ্ধ বিহার এবং ডুলাহাজারা বঙ্গবন্ধু সাফারী পার্কসহ কক্সবাজারের সবক’টি বিনোদন কেন্দ্রের।
ভয়েস/জেইউ।
উপদেষ্টা সম্পাদক : আবু তাহের
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : আবদুল আজিজ
সম্পাদক: বিশ্বজিত সেন
অফিস: কক্সবাজার প্রেসক্লাব ভবন (৩য় তলা), শহীদ সরণি (সার্কিট হাউজ রোড), কক্সবাজার।
ফোন: ০১৮১৮-৭৬৬৮৫৫, ০১৫৫৮-৫৭৮৫২৩ ইমেইল : news.coxsbazarvoice@gmail.com
Copyright © 2026 Coxsbazar Voice. All rights reserved.