ডা. কাকলী হালদার:
হাম হলো একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত শ্বাসতন্ত্রকে আক্রান্ত করে। এটি মিজলস বা হাম ভাইরাস নামক এক ধরনের ভাইরাসের মাধ্যমে ছড়ায়, যা প্যারামিক্সোভিরিডি পরিবারের অন্তর্গত। সঠিক সময়ে ব্যবস্থা না নিলে কখনো কখনো প্রাণঘাতী হতে পারে।
২০০৩ সাল থেকে বাংলাদেশ সরকারের ইপিআই, আইপিএইচ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিরলসভাবে হাম-রুবেলা নির্মূলে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, ন্যাশনাল পোলিও এবং মিজলস ল্যাবরেটরির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ঢাকা শহরসহ সারাদেশের সব বিভাগে হামের প্রকোপ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
মার্চের মাঝামাঝি সপ্তাহে সন্দেহভাজন রোগীদের ৩০-৩৫ শতাংশেরই হাম শনাক্ত হয়েছে যা জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি অশনিসংকেত। বাংলাদেশে হাম একটি এনডেমিক রোগ অর্থাৎ এই ভাইরাসটি আমাদের জনপদেই সুপ্ত অবস্থায় থাকে এবং সুযোগ পেলেই ছড়িয়ে পড়ে।
২০০৩ সাল থেকে শক্তিশালী সার্ভেইল্যান্স নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। বর্তমানে দেশে ৭৮৭টি সার্ভেইল্যান্স সাইট থেকে প্রতিদিন নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। মহাখালীর আইপিএইচ-এর ল্যাবরেটরিটি ছুটির দিনেও খোলা রেখে আইজিএম, রিয়েল-টাইম পিসিআর এবং সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে ভাইরাস শনাক্ত করছে।
শুধু বাংলাদেশ নয়, উন্নত দেশ যেমন যুক্তরাষ্ট্র (নিউইয়র্ক) এবং যুক্তরাজ্যেও বর্তমানে হামের বিধ্বংসী প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে, যা প্রমাণ করে যে টিকাদানে সামান্য শিথিলতাও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
১৯৭৯ সালে বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) শুরু হয়। এটি বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে সফল গল্প। পোলিও নির্মূল এবং ধনুষ্টংকার নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত।
বাংলাদেশে হাম একটি এনডেমিক রোগ অর্থাৎ এই ভাইরাসটি আমাদের জনপদেই সুপ্ত অবস্থায় থাকে এবং সুযোগ পেলেই ছড়িয়ে পড়ে।
৯ মাস এবং ১৫ মাস বয়সে এমআর টিকা দেওয়ার মাধ্যমে আমরা হাম-রুবেলা নির্মূলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম। ইপিআই-এর এই অর্জন ধরে রাখা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
হঠাৎ কেন বাড়ছে হামের প্রকোপ?
মাইক্রোবায়োলজিক্যাল দৃষ্টিকোণ থেকে হামের বর্তমান বৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে:
১. টিকাদানে অনীহা বা গ্যাপ: অনেক সময় দুর্গম এলাকা বা ভাসমান জনগোষ্ঠীর শিশুরা নিয়মিত টিকাদান থেকে বাদ পড়ে যায়।
২. ভাইরাসের মিউটেশন: ভাইরাসের জিনগত পরিবর্তন বা নতুন স্ট্রেইনের অনুপ্রবেশ।
৩. ইমিউনিটি গ্যাপ: প্রতি ৫ বছর অন্তর এমআর ক্যাম্পেইন না হওয়া বা দীর্ঘ বিরতির ফলে একটি বড় জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া।
৪. বিশ্বব্যাপী প্রাদুর্ভাব: আন্তর্জাতিক যাতায়াতের মাধ্যমে বিদেশ থেকে ভাইরাসের অনুপ্রবেশ।
হাম কেবল সাধারণ জ্বর বা শরীরে ফুসকুড়ি নয়। এর উপসর্গগুলো ধাপে ধাপে প্রকাশ পায়:
প্রাথমিক লক্ষণ সাধারণত তীব্র জ্বর, কাশি, সর্দি এবং চোখ লাল হওয়া। মুখের ভেতরে গালের উল্টো দিকে ছোট সাদাটে দাগ দেখা দেয় যাকে কপলিক স্পট বলে। এরপরে কান ও মুখের পাশ থেকে শুরু হয়ে সারা শরীরে লালচে দানা বা র্যাশ ছড়িয়ে পড়ে।
সঠিক চিকিৎসা না পেলে নিউমোনিয়া, মারাত্মক ডায়রিয়া, অন্ধত্ব, কানের সংক্রমণ এবং এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কের প্রদাহ)-এর মতো জটিলতা দেখা দেয়, যা শিশুর মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসায়
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল বর্তমানে এই রোগীদের ব্যবস্থাপনায় আদর্শ ভূমিকা পালন করছে। বাড়িতে বা হাসপাতালে ব্যবস্থাপনার কয়েকটি মূল ভিত্তি রয়েছে।
আইসোলেশন: আক্রান্ত শিশুকে অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখা।
জ্বর নিয়ন্ত্রণ: চিকিৎসকের পরামর্শে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ সেবন।
পুষ্টি ও হাইড্রেশন: প্রচুর পরিমাণে পানি, তরল খাবার এবং বুকের দুধ (শিশুদের ক্ষেত্রে) নিশ্চিত করা।
অক্সিজেন সাপোর্ট: শ্বাসকষ্ট হলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে অক্সিজেন নিশ্চিত করা।
পরিচ্ছন্নতা: সাবান জল দিয়ে হাত, কাপড় এবং ব্যবহার্য সামগ্রী নিয়মিত জীবাণুমুক্ত করা।
গর্ভবতী নারীদের জন্য হাম বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, কারণ গর্ভাবস্থায় শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা পরিবর্তিত থাকে।
গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে, যা হামের কারণে হওয়া মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। তাছাড়া গর্ভপাত বা অকাল প্রসবের ঝুঁকি বেড়ে যায় এবং শিশু জন্মের সময় কম ওজন নিয়ে জন্মাতে পারে।
ভাইরাল কালচার: ল্যাবরেটরিতে ভাইরাল কালচার করা যায়, তবে এটি সময়সাপেক্ষ বলে সাধারণত রুটিন টেস্ট হিসেবে করা হয় না।
হাম প্রতিরোধের একমাত্র এবং শ্রেষ্ঠ উপায় হলো টিকা:
১. রুটিন টিকাদান: নিশ্চিত করতে হবে যেন কোনো শিশু ৯ মাস এবং ১৫ মাস বয়সের এমআর টিকা মিস না করে।
২. ক্যাম্পেইন: প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে ৫ বছর অন্তর বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
৩. সচেতনতা: জ্বর ও র্যাশ দেখা দিলেই নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করা এবং নমুনা পরীক্ষার জন্য আইপিএইচ-এ পাঠানো।
৪. ভিটামিন-এ: হামের জটিলতা কমাতে শিশুদের ভিটামিন-এ ক্যাপসুল নিশ্চিত করা।
যদি শিশুর তীব্র জ্বর বা অন্য কোনো গুরুতর অসুখ থাকে, তবে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত টিকা দেওয়া পিছিয়ে দেওয়া ভালো। টিকা দেওয়ার পর সামান্য জ্বর বা ইনজেকশনের জায়গায় লালচে ভাব হতে পারে, যা ২-৩ দিনের মধ্যে ঠিক হয়ে যায়।
ইপিআই বা সরকারি টিকাদান কর্মসূচি ছাড়াও বেসরকারিভাবে হামের ২ ডোজ টিকা দেওয়া যায়।
যদি কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি শৈশবে টিকা না নিয়ে থাকেন বা আগে হাম না হয়ে থাকে, তবে তিনিও টিকা নিতে পারেন।
আমাদের শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ। নিউইয়র্ক বা লন্ডনের মতো উন্নত শহর যেখানে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে আমাদের সীমিত সম্পদে সচেতনতাই বড় অস্ত্র।
আইপিএইচ-এর ল্যাবরেটরি থেকে প্রাপ্ত তথ্য আমাদের সতর্ক করছে—এখনই সময় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। স্বাস্থ্য বিভাগ, গণমাধ্যম এবং অভিভাবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা আবারও হামমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে পারি।
আসুন, শিশুকে সময়মতো টিকা দিই এবং একটি সুস্থ প্রজন্ম নিশ্চিত করি।
ডা. কাকলী হালদার : সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ
ভয়েস/আআ/সূত্র:ঢাকা পোস্ট
উপদেষ্টা সম্পাদক : আবু তাহের
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : আবদুল আজিজ
সম্পাদক: বিশ্বজিত সেন
অফিস: কক্সবাজার প্রেসক্লাব ভবন (৩য় তলা), শহীদ সরণি (সার্কিট হাউজ রোড), কক্সবাজার।
ফোন: ০১৮১৮-৭৬৬৮৫৫, ০১৫৫৮-৫৭৮৫২৩ ইমেইল : news.coxsbazarvoice@gmail.com
Copyright © 2026 Coxsbazar Voice. All rights reserved.