মুফতি উবায়দুল হক খান:
ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম হজ। আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ এবং মহান আল্লাহর প্রতি নিখাদ ভালোবাসার প্রতীক। হজ এমন এক ইবাদত, যা বান্দাকে দুনিয়ার মোহমায়া থেকে মুক্ত করে মহান আল্লাহর দরবারে একান্তভাবে আত্মসমর্পণের শিক্ষা দেয়। তাই হজের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। যদি এই মহান ইবাদতে রিয়া (লোক দেখানো), খ্যাতি বা পার্থিব স্বার্থ প্রবেশ করে, তবে তার প্রকৃত মূল্য অনেকাংশেই নষ্ট হয়ে যায়।
হজের মূল উদ্দেশ্য : কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর মানুষের ওপর আল্লাহর জন্য এ ঘরের হজ করা ফরজ, যে সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য রাখে।’ (সুরা আলে ইমরান ৯৭) এখানে ‘আল্লাহর জন্য’ শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অর্থাৎ হজ এমন একটি ইবাদত, যা সম্পূর্ণভাবে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই সম্পন্ন করতে হবে।
হজের মাধ্যমে মানুষ তার জীবনের সমস্ত গুনাহ থেকে মুক্তি লাভের আশা করে এবং নতুনভাবে পবিত্র জীবন শুরু করার সুযোগ পায়। তবে এই লক্ষ্য তখনই অর্জিত হয়, যখন হজ একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে করা হয়।
নিয়তের বিশুদ্ধতা : ইসলামে প্রতিটি আমলের মূল ভিত্তি হলো নিয়ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সব কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম) হজের ক্ষেত্রেও এই নীতি সমানভাবে প্রযোজ্য। কেউ যদি হজ করে মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য, ‘হাজি’ উপাধি অর্জনের জন্য বা সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য, তাহলে তার এই ইবাদত মহান আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।
অতএব, হজের পূর্বে প্রত্যেক মুসলমানের উচিত নিজের নিয়তকে পরিশুদ্ধ করা এবং অন্তরে দৃঢ়ভাবে স্থির করা যে, সে কেবল মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই এই মহান ইবাদত পালন করছে।
লোক দেখানোর ক্ষতি : ‘রিয়া’ বা ‘লোক দেখানো’ ইবাদতের অন্যতম বড় শত্রু। এটি এমন একটি গোপন রোগ, যা মানুষের ভালো আমলকে নষ্ট করে দেয়। হজের মতো বড় ইবাদতেও যদি রিয়া প্রবেশ করে, তাহলে তার সওয়াব নষ্ট হয়ে যাবে।
অনেক সময় দেখা যায়, কেউ হজে গিয়ে বারবার ছবি তোলে, সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করে বা নিজেকে বিশেষভাবে তুলে ধরতে চায়। এসব কাজ যদি লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে হয়, তবে তা হজের মূল চেতনার পরিপন্থী।
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, আমি তোমাদের জন্য সবচেয়ে বেশি ভয় করি ছোট শিরককে। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, তা হলো রিয়া। (মুসনাদে আহমদ)
ত্যাগ ও আত্মসমর্পণের শিক্ষা : হজের প্রতিটি ধাপেই ত্যাগ ও আত্মসমর্পণের শিক্ষা রয়েছে। ইহরাম পরিধান করে মানুষ দুনিয়ার সব অহংকার, বিলাসিতা ও পার্থিব পরিচয় ত্যাগ করে। আরাফাতের ময়দানে দাঁড়িয়ে সে মহান আল্লাহর সামনে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে। কাবা শরিফ তাওয়াফ করে সে মহান আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্যের প্রকাশ ঘটায়।
এই প্রতিটি কাজের মধ্যে একটি সাধারণ বার্তা রয়েছে। বান্দা যেন একমাত্র মহান আল্লাহরই হয়ে যায়। তাই যদি এই ইবাদত অন্য কোনো উদ্দেশ্যে কলুষিত হয়, তাহলে তার মূল শিক্ষা ব্যাহত হয়।
হজ ও তাকওয়া অর্জন : হজের অন্যতম লক্ষ্য হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা হজ ও ওমরাহ সম্পন্ন করো আল্লাহর জন্য।’ (সুরা বাকারা ১৯৬) তাকওয়া এমন একটি গুণ, যা মানুষকে গুনাহ থেকে দূরে রাখে এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে সহায়তা করে। হজের সময় ধৈর্য, সহনশীলতা, পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতা, এসব গুণের চর্চা হয়।
যদি হজ সত্যিকার অর্থে মহান আল্লাহর জন্য করা হয়, তাহলে তা মানুষের চরিত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে এবং তাকে একজন উত্তম মুসলমান হিসেবে গড়ে তোলে।
হজ-পরবর্তী জীবনে প্রভাব : হজ শুধু কয়েক দিনের একটি ইবাদত নয়, বরং এর প্রভাব পুরো জীবনে প্রতিফলিত হওয়া উচিত। একজন হাজি যখন দেশে ফিরে আসে, তখন তার আচরণ, চরিত্র ও জীবনধারায় পরিবর্তন দেখা যাওয়ার কথা।
যদি হজ একমাত্র মহান আল্লাহর জন্য করা হয়, তাহলে সে ব্যক্তি গুনাহ থেকে দূরে থাকবে, মানুষের হক আদায়ে সচেষ্ট হবে এবং সমাজে ন্যায় ও সততার দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। কিন্তু যদি হজ কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা হয়ে যায়, তাহলে তার এই মহান ইবাদত তার জীবনে তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না।
হজের সঠিক বার্তা : আজকের সমাজে হজের প্রকৃত উদ্দেশ্য অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়। কেউ কেউ এটিকে সামাজিক মর্যাদা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখে। এই মানসিকতা পরিবর্তন করা জরুরি। ওলামায়ে কেরাম ও সচেতন মুসলমানদের উচিত হজের প্রকৃত শিক্ষা মানুষের মাঝে তুলে ধরা যে, হজ কেবল আল্লাহর জন্যই হতে হবে। যখন সমাজে এই সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে, তখন হজ একটি সত্যিকারের আত্মশুদ্ধির মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
হজ মহান ইবাদত : হজ ইসলামের এক মহান ইবাদত, যার মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং আত্মশুদ্ধি লাভ করা। এই ইবাদতের প্রতিটি ধাপে রয়েছে ত্যাগ, ভালোবাসা ও আনুগত্যের শিক্ষা।
অতএব, আমাদের প্রত্যেকের উচিত হজকে একমাত্র মহান আল্লাহর জন্য সম্পন্ন করা নির্ভেজাল নিয়ত, আন্তরিকতা ও তাকওয়ার সঙ্গে। যখন হজ হবে নিখাদভাবে আল্লাহর জন্য, তখন তা আমাদের জীবনে সত্যিকার পরিবর্তন আনবে এবং আমাদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতার পথে পরিচালিত করবে।
লেখক : মুহাদ্দিস ও শিক্ষা সচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর।
ভয়েস/আআ
উপদেষ্টা সম্পাদক : আবু তাহের
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : আবদুল আজিজ
সম্পাদক: বিশ্বজিত সেন
অফিস: কক্সবাজার প্রেসক্লাব ভবন (৩য় তলা), শহীদ সরণি (সার্কিট হাউজ রোড), কক্সবাজার।
ফোন: ০১৮১৮-৭৬৬৮৫৫, ০১৫৫৮-৫৭৮৫২৩ ইমেইল : news.coxsbazarvoice@gmail.com
Copyright © 2026 Coxsbazar Voice. All rights reserved.