সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী:
এক.
আমার বাবার মধ্যে একটা আজন্ম অস্থিরতা ছিল, মায়ের ছিল না। সাতচল্লিশের মধ্য-আগস্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করেননি, তার আগেই আব্বা কলকাতা ছেড়েছেন। আবার সেই গ্রামে এসে আশ্রয় নেওয়া। কলকাতায় যাঁরা ছিলেন একে একে সবাই চলে এসেছেন। গ্রাম তখন টইটুম্বুর, যেমন জনবসতিতে, তেমনি নবীন স্বপ্নের উচ্ছ্বাসে। মা জানতেন তাঁর এই আবাসনটা সাময়িক মাত্র। তবু তিনি খুশি ছিলেন। ফিরে এসেছেন বাবা-মা’য়ের কাছে; সেই গৃহে যেখানে তাঁর জন্ম। ওইখানেই একটি ঘরে আমারও জন্ম, মা দেখিয়েছেন আমাকে, সে-ঘরটি। গ্রামে এসে দেখছি আবার গুছিয়ে বসেছেন, পাখি যেমন বসে তার বাসাতে, সন্তানসন্ততি নিয়ে। আব্বা চলে গেছেন ময়মনসিংহে, যেখানে কলকাতা থেকে আসা তাঁদের অফিস বসেছে, ঢাকায় জায়গা না-পেয়ে। আমার মা সবদিকে চোখ রাখছেন। তখন আমি ক্লাশ এইটে, মা জানেন আমার বই পড়ার আগ্রহ। দেখি জোগাড় করে ফেলেছেন, এক পড়শির বাড়িতে এক আলমারি বই ছিল, একদিন শুনি বলছেন আমাকে, ‘ওরা বই দেবে, তুই গিয়ে পছন্দ মতো নিয়ে আসিস।’
গ্রামে সেবার স্বাধীনতা এসেছিল গোয়ালন্দ থেকে, স্টীমারে চেপে। চৌদ্দই আগস্ট বিকেলে যে-স্টীমার আসবে সেটি পাকিস্তানের পতাকা বহন করবে, পদ্মার ওপরে আকাশের বুকে পত্পত্ করে উড়ে ঘোষণা দেবে যে আমরা আর পরাধীন নই, এখন আমরা স্বাধীন; তার জন্য স্টীমার ঘাটে মামাবাড়ির ছেলেবুড়ো সবই হাজির ছিল, আমিও ছিলাম। বিকেল বেলা স্টীমার এসেছে চাঁদতারা আঁকা মস্তবড় একটি সবুজ পতাকা তার সামনে, অসংখ্য ছোট পতাকা সারা স্টীমারজুড়ে। জিন্দাবাদ ধ্বনি উঠেছে অপেক্ষমানদের ভেতর থেকে, উঠেছে স্টীমারের যাত্রীদের কণ্ঠে। মস্ত উৎসব!
পদ্মার ইলিশ, গরুর দুধ, ক্ষেতের চাল, আমার মা মনে হয় উপভোগই করছিলেন তাঁর ওই প্রত্যাবর্তন। কিন্তু জানতেন এই ঘাটে বেশি দিন থাকা হবে না। হয়ওনি। মাসখানেকের মধ্যেই চলে যেতে হয়েছে ময়মনসিংহে। স্কুলে তবু আসন পাওয়া গেল, ভাঙা বছরেও, কিন্তু বাসা কোথায় ওই শহরে? বাবার কয়েকজন আত্মীয় ছিলেন সেখানে, ব্যবসা করেন, তাঁদের সাহায্যে খুঁজে ঢুঁড়ে বের করলেন একটি বাসা, কলেজের কাছে, রেল লাইনের পাশে। নিচে কাঠ, বাকিটা টিন। কল নেই, তবে টিউবওয়েল আছে। বিদ্যুৎ নেই। আমাদের জন্য ব্রহ্মপুত্রের পাড় ছিল, মা তো থাকতেন বাসাতেই। ওইখানে আড়াই-তিন মাস কেটেছে। তারপর ঢাকায়।
সরকারি কর্মচারীদের জন্য তখন আবাসন তৈরি হচ্ছে। আজিমপুরে ফ্ল্যাট পাওয়া গেল, সেখানে এসে উঠতে হলো আমার মাকে, কয়েক মাস পরে। তার জন্য এ সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা। তিনিতলা দালানের তৃতীয় তলায় বাসা, মাটির সঙ্গে কোনো যোগ নেই। মা এই প্রথম ভূমিচ্যুত হলেন। মা বলতেন, ‘মনে হয় জাহাজে চেপেছি।’ অযথার্থ ছিল না ওই উপমা। ওই বাসায় এক দু’বছর নন, একটানা বারো বছর, এক যুগ কাটিয়েছেন আমার মা। নিকটতম প্রতিবেশী এসেছেন বিহার থেকে, শরণার্থী হয়ে। তাঁরা বাংলা জানেন না, আমার মা জানেন না উর্দু, কিন্তু চমৎকার আত্মীয়তা গড়ে উঠেছিল দুই পরিবারে। কলোনীজুড়ে বহু পরিচিত লোক ছিলেন, গ্রাম থেকে আসতো আত্মীয়, শহরেও ছিলেন তাঁরা; কিন্তু তবু সঙ্কুচিত তো বাসগৃহ, কোথায় সেই গ্রামীণ প্রসারতা, যেখানে ঘরগুলো স্বতন্ত্র, এবং প্রতিটি ঘরই একটি বসতবাড়ি। আমার মা ক্রম পরিবর্তনগুলো মেনে নিয়েছেন, কিন্তু মোটেই খুশি হননি।
আমার পিতা যখন অবসর নিলেন তখন মাতার সুযোগ হলো তিনতলা থেকে নেমে আসবার। কিন্তু খোলা জায়গা পাবেন কোথায় ঢাকা শহরে? পুরাতন ঢাকার লালবাগে ছোট্ট একটি বাড়ি করেছিলেন আমার পিতা, সেখানে মাটি আছে, কিন্তু রাস্তা মোটেই প্রশস্ত নয়। ওই বাড়িতেই আমার পিতার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ। একাত্তরে যখন যুদ্ধ শুরু আমার বিধবা মা তখন পিলখানার গা-ঘেঁষা ওই বাড়িতেই থাকেন। পঁচিশে মার্চের পরে আমরা কে কোথায় ছিটকে পড়েছি ঠিক নেই। কার্ফু ওঠার পরে প্রথম কাজ ছিল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ছেড়ে পালানো; পরের দিন মায়ের বাড়িতে খোঁজ নিতে গিয়ে দেখি একেবারে জনশূন্য, দরজায় মস্ত একটা তালা। জিজ্ঞাসাবাদ করাতে পাশের বাসার মহিলা একজন হেসে বললেন, ‘আপনার আম্মাকে তো কিছুতেই ধরে রাখা গেলো না। চলে গেলেন।’ ‘কোথায়?’ ‘গ্রামের বাড়িতে।’ ‘বলেন কি?’ ‘হ্যাঁ। যাবার সময় মুরগীগুলোও সঙ্গে নিয়ে গেছেন’, হেসে জানালেন মহিলা।
অসম্ভব সময়ের অবিশ্বাস্য সব ঘটনা। আমার যে-মায়ের বাড়ি থেকে একা বের হবার অভিজ্ঞতা নেই, তিনি চলে গেছেন নদী পার হয়ে গ্রামে, গোলাগুলির মাঝখান দিয়ে। আমাদের গ্রামের বাড়ি যে অনেক দূরে তা নয়, নদী পার হলে দশ-বারো মাইল হবে, তবে অচেনা ও অনিশ্চিত তো। সংসারে প্রতিষ্ঠিত ছেলেমেয়েরা তখন তার নানা জায়গায়, যারা স্কুল-কলেজে পড়ে তাদেরকেই চলনদার করে রওনা দিয়েছেন, পায়ে হেঁটে, প্রথমে রিকশা ও পরে নৌকা পাবেন এমন ভরসা করে। কিম্বা হয়তো কোনো ভরসাই করেননি, কিন্তু এটা বুঝেছেন পঁচিশ তারিখ রাতে পিলখানায় যেরকম আক্রমণ হয়েছে তারপরে ওই পাড়ায় আর থাকা যাবে না। সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব করেননি। আমি হলে করতাম। আমি অনেক বেশি দোদুল্যমান আমার মায়ের তুলনায়। বুঝতে অসুবিধা হয়নি আমার মা অনেক বড় কাজ করতে পারতেন, সুযোগ পেলে।
পথে অবশ্য কোনো বিপদ হয়নি। বুড়িগঙ্গা নদী পার হবার অপেক্ষা, তারপরে সবাই সবার আত্মীয়। কিন্তু অসুবিধা হবে না যে তাতো তিনি জানতেন না। কি করে গেলেন? পথঘাট তো তাঁর কিছুই জানা নয়। সাতচল্লিশে অভিভক্ত বাংলার রাজধানী কলকাতা ছেড়ে বাপের বাড়িতে গিয়ে উঠেছিলেন, স্টীমারে চেপে। একাত্তরে পূর্ব বাংলার রাজধানী ঢাকা ছেড়ে স্বামীর বাড়িতে উঠলেন, নৌকায় করে। সেবার স্বামী ছিলেন কর্তা। এবার তিনি নিজেই নিজের অভিভাবক।
আত্মীয়রা নিরাপদে গিয়ে আমাদের বাড়িতে উঠেছেন। তাঁদের মধ্যে এমনও কেউ কেউ ছিলেন যাঁরা এর আগে কখনো গ্রামে থাকেননি। ষোলই ডিসেম্বরের পর সবাই একে একে ঢাকায় ফেরৎ এসেছেন। এসেছেন আমার মা’ও। গ্রামের বাড়িতে থাকতে পারলে খুশি হতেন, কিন্তু সময় তো তাঁর পক্ষে নয়, ছিল না কখনো, তাই আপন স্থান ছেড়ে দিয়ে আবার চলে আসতে হয়েছে, সময়ের স্রোতবাহিত হয়ে। এসেছেন, কিন্তু পূর্বজীবন তো আর ফেরৎ পাননি। কেউই পাননি, আমার মা পাবেন কী করে। কারো জন্য উন্নতির পথ খুলে গেছে, কারো ঘটেছে অবনতি; তিনি দেখেছেন তাঁর নিজের জগৎটা আরো সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। একটা সীমার পরে বয়োবৃদ্ধি ও জীবনসঙ্কোচন সমান তালে ঘটতে থাকবে, এটাই নিয়ম। তাঁর নিশ্চয়ই মনে হয়েছে যে, তাঁর ক্ষেত্রে এটা ঘটেছে বেশি বেশি করে।
দুই.
উন্নতি জিনিসটা খুবই জরুরি, তাই বলে আমার মা’কে যে উন্নতির পক্ষের শক্তি বলবো, সে-রাস্তা একেবারেই বন্ধ। বললে মিথ্যাচার করা হবে, অন্যায় করা হবে তাঁর প্রতি। উন্নতির পক্ষে তো ননই, আসলে বিপক্ষেরই ছিলেন তিনি। সারা জীবন।
উন্নতির কতগুলো অপরিহার্য শর্ত আছে। যেমন, প্রতিযোগিতা চাই; যে-প্রতিযোগিতার পেছনে চালিকা শক্তি হিসাবে কাজ করে ঈর্ষা। যেমন, উন্নতির জন্য দরকার হয় সন্তুষ্ট হতে অসম্মতি। এসব গুণ আমার মায়ের মধ্যে ছিল না। তাঁর মনোজগতে প্রতিযোগিতা স্থান পায় না, কেননা সেখানে আধিপত্য হচ্ছে আত্মীয়তার। ঈর্ষা হয়তো একেবারে নিষিদ্ধ নয়, তবে বেশ অস্বাভাবিক। ওপরে ওঠার ব্যাপারে আরেকটি নীতি আছে, সেটা হলো নিচে নামা; বড় যদি হতে চাও ছোট হও আগে- এই অতি প্রসিদ্ধ নীতিবাক্য খুবই কার্যকর উন্নতি করার ক্ষেত্রে, বিশেষ করে আমাদের এই সুযোগ-সংক্ষিপ্ত সমাজে। নত না হলে ওঠা যায় না। শিরদাঁড়া শক্ত রাখা আমার মা’য়ের স্বভাবজাত ছিল।
আত্মসম্মানজ্ঞান ছিল টানটান। যে জন্য সেসব জায়গায়, বাড়িতে কিম্বা আয়োজনে তিনি যেতেন না যেখানে আশঙ্কা ছিল অসম্মানের। কথা বলতেন বুঝেসুঝে। অনেক ক্ষেত্রেই অত্যন্ত অপচয়বিমুখ ছিলেন আমার মা, বিশেষভাবে কথা বলার ব্যাপারে। ধড়ফড় করে কথা বরঞ্চ আমার বাবা বলতেন, বলে অসুবিধায় পড়তেন। কথা বলার ব্যাপারে আমার নিজের মধ্যে বাবার প্রবণতা বয়েছে, বুঝেছি আমি; পরে মা’কে দেখে জেনেছি কোন পথটা সঠিক। শিরদাঁড়া শক্ত রাখার ব্যাপার তাঁর জন্য আরোপিত ছিল না, ছিল স্বভাবজাত। একদিকে তাঁর আত্মীয়তা অন্যদিকে তাঁর আত্মসম্মান জ্ঞান, এরা উভয়েই উন্নতিবিরোধী বটে। সেটা ঠিক আছে; কিন্তু এরা আবার পরস্পরবিরোধীও, আত্মীয়তা উদ্বুদ্ধ করে নিজেকে প্রসারিত করতে, আত্মসম্মানজ্ঞান উপদেশ দেয় সঙ্কুচিত হতে। এ দুইকে তিনি মেলালেন কি করে?
মিলিয়েছিলেন তাঁর আরেক বৈশিষ্ট্যের মধ্যস্থতায়। সেটি হচ্ছে দেবার ক্ষমতা। আমার মা মস্ত বড় দাতা ছিলেন না। কি করে হবেন? তাঁর আয়ত্তে সম্পত্তি কোথায়, প্রাচুর্য কোনখানে? নিজস্ব আয়ই তো ছিল না। আসলেই তিনি নিজেকেই দিতেন। আপ্যায়নে, আতিথেয়তায়, শুভেচ্ছায়, করো বিপদে-আপদে ছুটে যাওয়ায় কখনো সঙ্কোচ দেখিনি। আশ্রয় ছিলেন অনেকের, পথের পাশের গাছটির মতো। রাজশাহীতে কুড়িয়ে-পাওয়া একটি ছোট্ট মেয়েকে এনে দিয়েছিল এক মহিলা। নাম-ঠিকানা নেই, আমার মা তাই তার নাম দিয়েছিলেন ‘কুড়ানী’। মা তাকে লালনপালন করলেন, সে রইলো মায়ের সঙ্গে, রাজশাহীতে, কলকাতায়, ঢাকায়। সাতচল্লিশে যেমন, একাত্তরে তেমনি। তার বিয়ে দিলেন, সন্তান হলো, সন্তানেরও সন্তান হয়েছে। সবাই রয়ে গেছে আমার মা’য়ের আশেপাশে। যখন ইচ্ছা আসে, কাজ করে দিয়ে যায়, খেয়ে নেয় হাঁড়ি থেকে ভাত-তরকারি নামিয়ে। ফ্রিজ তো ছিল না আগের দিনে, ফ্রিজ থাকবে কি একসময়ে তো বিদ্যুৎই ছিল না, কিন্তু খাবার রাখার ছোট আয়োজন ছিল, নাম ছিল মিটসেফ, তাতে তালা লাগাবার ব্যবস্থাটা অপ্রাসঙ্গিক; কিন্তু ফ্রিজ যখন এসেছে মা’য়ের ঘরে তখনো কোনো দিন তালাচাবির ব্যবহার দেখিনি। ওই উন্নত সংস্কৃতি তাঁর নাগালের বাইরেই রয়ে গেল।
মায়া মানুষ নিজেকে করে, আমার মা পারতপক্ষে সবাইকেই করতেন। তাঁর প্রজন্মের মা’য়েরা অনেকেই বোধ করি ওই রকমের ছিলেন। মায়া করতেন বলে তাঁর বাড়িতে কাজ করে গেছে এমন মানুষেরা ঘুরে-ঘুরে তাঁর কাছে আসে, দেখা করে যায়। খোঁজখবর নেয়। মা বলেন, ‘খেয়ে যাও’। বহু মানুষের মর্মযন্ত্রণার কথা জানেন তিনি। মন দিয়ে শোনেন, পরামর্শ যেন, সান্ত্বনা দিতে সচেষ্ট হন, কিন্তু অপ্রয়োজনে একজনের কথা আরেকজনের কাছে বলেন না। আপন সন্তানদের ব্যপারেও নয়। তাদের কাছেও নয়।
দিতে অভ্যস্ত ছিলেন ঠিকই, কিন্তু চাইতে পারতেন না। ওইখানে তাঁর দুর্বলতা, আবার ওইখানেই তাঁর শক্তি। না-চাইলে তো হবে না, চাইতে হবে, না-পেলেও লজ্জা নেই, আবার চাওয়া দরকার হবে। বারম্বার। আমার মা অন্যের কাছে চাইবেন কি, নিজের ছেলেমেয়েদের কাছেও চাইতে পারেন না। লজ্জা পান। ছেলেমেয়েদের বাসায় যান, গেছেন আগেও, কিন্তু লম্বা সময় থাকতে দেখিনি, দু’দিন থাকলে তৃতীয় দিনে অস্থির হয়ে পড়েন, নিজের ঘরে ফেরার জন্য। এখন, এই বয়সেও তিনি একা থাকেন, তাঁর ওই পুরানো বাড়িতে। ওপরতলায় আমার সর্বকনিষ্ঠ ভাইটি থাকে, ধারণা করা হয়েছিল তিনি তাঁদের সঙ্গেই থাকবেন, কিন্তু তিনি পছন্দ করেন নিজের সংসার নিজেই চালাবেন, অন্যের ওপর নির্ভরশীল না-হয়ে।
চাইবার ব্যপারটায় তাঁর অনভ্যাস এমনই গভীর যে চাইতে গেলে বড় বিপদে পড়তেন। আমার পিতা উন্নতিতে বিশ্বাস করতেন সে-কথা বলেছি। কিন্তু উন্নতির জন্য কোন পুঁজিটা যথার্থ তা ঠিক করতে পারেননি। মনে করেছেন সন্তানদের লেখাপড়াতেই কুলাবে। আমার মা লেখাপড়ার মূল্য জানতেন, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার দিকটাতে ছিল তাঁর প্রথম মনোযোগ, সে-সময়ের অন্যান্য মায়ের মতোই; কিন্তু এই কাণ্ডজ্ঞান তাঁর ছিল যে, বিদ্যার সঙ্গে বুদ্ধিও লাগবে, এবং নিদেনপক্ষে মাথাগুঁজবার ঠাঁইও চাই। ঢাকা শহরে জায়গা জমি তখন পানির দামে বিক্রি হচ্ছে। বাবা দেখছেন। চোখের সামনেই কিনছে লোকে; তাঁর সহকর্মীরা, আত্মীয়রা। ওই ব্যাপারে তাঁর উৎসাহ নেই। যখন সজাগ হলেন তখন ভালো ভালো জায়গা তাঁর ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। আমার মা এবিষয়ে একবার এক আত্মীয়ের সাহায্য চেয়েছিলেন। যাঁর কাছে চেয়েছেন তিনি মাঝারি মাপের ক্ষমতাবান আমলা। ঘটনাটি ঘটে একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে। আরেক আত্মীয় লক্ষ্য করেছিলেন ব্যাপারটা। হাসতে হাসতে বলেছেন তিনি আমাকে, ‘তোমার মা এমন সঙ্কোচে বললেন কথাটা যে ভাদ্রলোক পাত্তাই দিলেন না, হাসি দিয়ে উড়িয়ে দিলেন। ও ভাবে হয়?’ না, ওভাবে হয় না। হয়ওনি। বলাইবাহুল্য।
ওই যে তাঁর দেবার কথা বললাম সেটা ছিল একেবারেই অনানুষ্ঠানিক। অনাড়ম্বর। দান নয়, তাঁর ভাবটা ছিল উপকার করবার। কারো যদি উপকারে লাগতে পারেন তবে কেন লাগবেন না। এ নিয়ে অহমিকা করবার প্রশ্নই ওঠে না। আমার মা অত্যন্ত হিসাবী মানুষ। আমরা ছেলেমেয়েরা বলতাম, ‘একবারে লক্ষ্মী।’ কিছুই ফেলেন না, হাঁড়িকুড়ি, বোয়ম, টিন সব যত্নে রাখেন, কোথায় কি আছে কখনো ভোলেন না। বেহিসাবী ছিলেন শুধু ওই এক ব্যাপারে, উপকার করবার ইচ্ছায়। একেবারেই অজাতশত্রু। ছেলে-বউদের কেউ কেউ হয়তো তাঁকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবেছে, নিতান্তই সেটা ভুল করে; এবং স্বল্প সময়ের জন্য। তারা তাঁকে শত্রু ভাবেনি। উপায় ছিল না ভাববার।
তাই বলে তিনি যে ত্যাগী ছিলেন তা মোটেই নয়। ঘোরতর সংসারী মানুষ, পরিপূর্ণরূপে ইহজাগতিক। বাবা মা দু’জনেই নিরন্তর চাইতেন সন্তানেরা মানুষ হোক, কিন্তু পিতার পক্ষপাত ছিল বড়ত্বের দিকে, মায়ের পছন্দ ভালোত্ব; ব্যবধানটা সেইখানে। এর বাইরে সমান সংসারী উভয়েই। আমার মা বরঞ্চ ইচ্ছা পোষণ করতেন তাঁর চারপাশে অনেক লোক থাকুক, জমজমাট। ছেলেমেয়েদের বিয়ের অনুষ্ঠান উৎসবে পরিণত হচ্ছে না দেখে মনমরাই থাকতেন, ওই ব্যাপারেও তিনি বেহিসাবী হতে প্রস্তুত ছিলেন। ভোগ নয়, তাই বলে ত্যাগ যে তাও নয়। ত্যাগের মধ্যে একটা অহমিকা থাকে। করুণাও। এমনকি আত্মকরুণাও থাকে, তাঁদের মধ্যেও, তাঁদের মধ্যেই বিশেষ ভাবে যাঁরা মনে করেন নিজেকে একেবারে শেষ করে দিলেন অপরের জন্য, সংসারের হিতার্থে। আমার মা’র ভেতর সেটা ছিল না, তিনি মনে করতেন তাঁর যা করার তাই করছেন, কর্তব্য নয়, স্বভাব।
আমার মা’কে আমি ত্যাগী হিসাবে মোটেই দেখতে পাই না, দেখতে পাই আত্মীয়ের মতো উপকারী হিসাবে। তিনি সহনশীল; উগ্র নন, মনে হয় বৈষম্যে বিশ্বাস করেন না; এক কথায় বলা যায় গণতান্ত্রিক। কিন্তু সত্যি সত্যি গণতান্ত্রিক ছিলেন কি? হ্যাঁ, আমার পিতার তুলনায় অবশ্যই গণতান্ত্রিক। পিতা ছিলেন একবারেই আমলাতান্ত্রিক, সব সিদ্ধান্ত তাঁরই, এবং তা তিনি ওপর থেকে চাপিয়ে দিতে পছন্দ করতেন। গণতন্ত্রের কথা ভাবতেন, বলতেনও, কিন্তু ছিলেন তিনি পরিবারতান্ত্রিক, নিজের পরিবারের বাইরে তেমন একটা যেতে চাইতেন বলে ধারণা হয় না আমার; আর পরিবারকেও লালনপালন করতেন একটি দপ্তরের মতন করে, যার তিনি প্রধান, অন্যরা কর্মচারী। এ কোন ব্যতিক্রমী মনোভাব নয়, এ ছিল তখনকার দিনের চাকরিজীবী মধ্যবিত্তের সাধারণ প্রবণতা। এঁরা প্রায় সবাই ছিলেন পরিবারের কারণে সমাজবিচ্ছিন্ন, এবং নিজ নিজ পরিবারের ভেতর আমলাতান্ত্রিক।
আমার মা তেমন নন, তিনি আত্মীয়তান্ত্রিক; আমাদের অধিকাংশ আত্মীয়ই ছিল মায়ের দিকে। আমার পিতা ছিলেন পিতৃহীন ও মাতৃহীন। তাঁর দিকের অল্পসখ্যক আত্মীয়দের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা যা ছিল তা আমার মায়ের কারণেই। এবং তাঁর আত্মীয়তা যে কেবল রক্ত বা বৈবাহিক সম্পর্কের বৃত্তের ভেতর আটকা পড়ে ছিল তা নয়, ছড়িয়ে গেছে বাইরে, বেশ দূরে। তবু, শেষ পর্যন্ত, সেটাও তো একটা বৃত্তই; সর্বজনীন যে হবে তা সম্ভব ছিল না। তদুপরি তিনিও কর্তৃত্ববাদীই। সংসারের কাঠামোটা ছিল পিতৃতান্ত্রিক, কিন্তু ভেতরে মা ছিলেন আরেক কর্তা। পুরোপুরি গণতান্ত্রিক হবেন এ কাজ তাঁর পক্ষেও সম্ভব ছিল না। এমনকি একান্নবর্তী পরিবারেও তাঁকে দেখতে পাই না, ওই ব্যবস্থা মেনে নেওয়া অসম্ভব ছিল তাঁর জন্য।
আমরা বলতাম, ‘মা তুমি ভুল জায়গায় এসে পড়েছ, তোমার উচিৎ ছিল জমিদার বাড়ির গিন্নি হওয়া।’ তিনি হাসতেন। তা একদিক দিয়ে জমিদার বাড়িতে তাঁকে খুবই মানাতো। তাঁর অনেক পোষ্য থাকতো, দানখয়রাত করার বড় রকমের সুযোগ পেতেন। কর্তৃত্বও করতেন, বড় এলাকা জুড়ে। কিন্তু আবার বেমানানও হতেন বৈকি। কেননা পায়ের ওপর পা ফেলে বসে খাবেন এটা তো তাঁর স্বভাবেই নেই। তিনি তো কর্মী। তাহলে?
তিন.
উন্নতির কথা বলছিলাম। আমার মা’য়ের মতো আত্মীয়তার বন্ধন যাদের শক্ত তাদের পক্ষে উন্নতি করা কঠিন। প্রায় অসম্ভব। সময়টা ছিল উন্নয়নের। স্বৈরশাসক আইউব খান তাঁর শাসনের শেষ প্রান্তে এসে মহা আড়ম্বরে অগ্রগতির দশ বছর পালন করেছিলেন; তা ওই দশ বছর কেন, তার আগের বছরগুলোতেও উন্নতির হট্টগোল ভালোভাবেই চলছিল। উন্নতির জন্যই তো পাকিস্তান-হিন্দুস্থান হয়েছিল। তবে সকলের নয়, কারো কারো, অল্পকিছু মানুষের। তাদের জন্যই কেবল স্রোতটিকে যারা নিজেদের অনুকূলে নিয়ে নিতে পেরেছে। এরা জবরদখলকারী, ব্যবসায়ী ও টাউট। আমলারাও কেউ কেউ বাগিয়ে নিয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের জায়গাজমি, দোকানপাট, ব্যবসা, পেশা দখল হয়ে গেছে। ভেজালও এসেছে। আমাদের বেগম বাজারের বাসার কাছেই তেলের আড়ৎ ছিল একজন মুসলিম লীগ নেতার, ঢাকার অধিবাসী, প্রবীণ ব্যক্তিত্ব, হাজী সাহেব, নগর মুসলিম লীগের সভাপতি। পল্টনের জনসভায় সভাপতিত্ব পর্যন্ত করতেন, কপালে তাঁর ধর্মপালনের কালো দাগ, মাথায় টুপি; কিন্তু আমরা জানতাম শর্ষের তেলের সঙ্গে মবিল তেল মেশাতেন, মিশিয়ে পয়সা করেছেন। খাঁটিরা পিছু হটেছে, ভেজালেরা ভালো করেছে। মধ্যবিত্তের একাংশ উঠলো, অন্য অংশ, বড় ভাগ সেটাই, যেখানে ছিল মোটামুটি সেখানেই রয়ে গেলো।
আমার একজন শিক্ষকের কথা মনে আছে, তিনি অনেক গুণে গুণান্বিত, যেগুলো ঈর্ষণীয়, কিন্তু তাঁর রাজনীতিটা ছিল মুসলিম লীগের, একেবারে শেষ পর্যন্ত, পাকিস্তান ভেঙে যাবার পরেও। একাত্তরে হানাদারদের সঙ্গে সহযোগিতা করেছেন এই অভিযোগে তাঁকে কারাভোগ সহ্য করতে হয়েছিল। তিনি দু’টি বই লিখেছেন, একটি ইংরেজীতে, আরেকটি বাংলাতে। দুই বইতেই একটি অভিযোগ রয়েছে, তাদের সম্পর্কে যারা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তৎপর ছিল। অভিযোগটি তাঁর দৃষ্টিতে খুবই যুক্তিযুক্ত; সেটা এই যে, যেসব শিক্ষিত লোক পাকিস্তানের ধ্বংস চেয়েছে, তার মধ্যে তিনি তাঁর এই অধম ছাত্রের নামও করেছেন, তারা কি ভুলে গেছে যে পাকিস্তান না-হলে তারা কোথায় থাকতো? এবং দুঃখ প্রকাশ করেছেন তাদের কৃতজ্ঞতাহীনতার জন্য।
তা ঠিক। উন্নতি কারো কারো হয়েছে বটে। চমকপ্রদ উন্নতি। আমার শিক্ষক সাতচল্লিশের কথা বলছিলেন; উন্নতি সেখানে থেমে থাকেনি, আরো বড়মাপের, প্রায় বেপরোয়া উল্লম্ফন ঘটেছে একাত্তরের পরে। কিন্তু আমার মা’য়ের মনোভাব যারা ধারণ করে তাদের কোনো উন্নতি হয়নি। তাঁর সন্তানদেরও হয়নি। তাঁর আশেপাশের অনেকের হয়েছে। এর ছেলে, ওর স্বামী উঁচুতে উঠেছে, দম্ভ প্রকাশ করেছে, এরকম ঘটনা তো বহু দেখেছেন তিনি। সামাজিকভাবে নিচু কিন্তু অর্থের কৌলীণ্যে আকাশ ছুঁইছুঁই এমন ব্যাপার তাঁর চোখে পড়বে না কেন। অবশ্যই পড়েছে। তবে সে-সবের চাঞ্চল্যে তিনি যে অস্থির হবেন তেমনটা ঘটেনি। চঞ্চল অনেকেই হয়েছেন, আমার মা হননি। তাঁর যেটুকু শক্তি সেটুকুইর উৎসও ওইখানেই ছিল, তাঁর ওই অনাসক্তিতে। আমার পিতার ছিল অবিশ্বাস, পাকিস্তান কাদের উপকারের জন্য এসেছে সে-বিষয়ে তাঁর স্পষ্ট ও বাস্তববাদী ধারণা ছিল, আস্থা রাখতেন না অন্যদের ওপর, কিছুটা উন্নাসিকই ছিলেন সেদিক থেকে, কিন্তু তবু ভেতরে ভেতরে তিনি আশা রাখতেন, এবং আশা রাখতেন বলেই হতাশ হতেন, থেকে থেকে। আমার মা’য়ের বাস্তববাদিতা তাঁকে আশাবাদী করেনি, তাঁর সিনিসিজমটা অনাসক্তের, বাবারটির মতো সমালোচনামূলক নয়। ভেতর থেকেই মোহমুক্ত। বাবা মোহমুক্ত ছিলেন না; হলে অবশ্য বিপদই ছিল, সংসার চালাতে পারতেন না।
মা মেনে নিতেন। মেনে নিয়েছিলেন। তাঁর প্রজন্মের প্রায় সব মায়েরাই মেনে নিতেন। যাঁরা ব্যতিক্রম তাঁরা ঝগড়া করতেন। কেউ বা গুটিয়ে নিতেন নিজেকে, নিজের মধ্যে, শুচিবায়ুগ্রস্ততা দেখা দিত- নৈতিক; ক্ষেত্রবিশেষে দৈহিক। মা’য়ের পরিচিত দু’টি বিদ্রোহের কথা অবশ্য তাঁর মুখেই শুনেছি। বলার ধরন থেকে বুঝতাম তাঁর সমর্থন রয়েছে। তাঁর আত্মীয়দের একজনের স্বামী কাজ করতেন পুলিশে, এবং নাকি তাঁর কিছুটা চরিত্রস্খলন ঘটেছিল, ভদ্রলোক আসক্ত হয়েছিলেন অন্য নারীতে। স্ত্রী ঝগড়া-ফ্যাসাদের পথে যাননি, বঁটির এক কোপে কর্তার নাক কেটে নিয়েছেন, ‘দৈনিক আজাদ’ সে-খবর মফস্বল পাতায় ছেপেছিল। অন্য বিদ্রোহটা ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক। মা’য়ের বোন একজন, আপন নন, সম্পর্কিত; তিনি স্বামীর সংস্কৃতিকে মেনে নিতে পারেননি, আলাদা থাকতেন, নিজের লেখাপড়াটা অব্যাহত রেখেছিলেন, বিএবিটি পাস করে স্কুলে চাকরি করেছেন, পরে এম এও করেছেন, বাংলায়। ভালো পদ পেয়েছিলেন শিক্ষাবিভাগে। কিন্তু ওই যে বললাম, এঁরা ছিলেন ব্যতিক্রম। নিয়ম ছিল মেনে-নেওয়া, সেই বিপুল-সংখ্যক মেনে-নেওয়া গৃহিণীদের মধ্যে আমার মা একজন।
তাঁদের মতোই তাঁরও দিনের বড় অংশটা কাটতো রান্নাঘরে। ভোজনবিলাসী ছিলেন না, অত্যন্ত রন্ধননিপুণ যে তাঁকে বলা যাবে তাও নয়। তাঁর নিজের জন্য খাবারের সময়টা ছিল সংক্ষিপ্ত ও প্রান্তবর্তী; কখন যে খেতেন দেখতে পেতাম খুব কম। কিন্তু যা রাঁধতেন মনে হতো অপূর্ব। সেই সব খাবার কোথায় চলে গেছে। বড় কৈ মাছগুলো অদৃশ্য, খলসে মাছ অনেক দিন খাই না, পুঁটি মাছের স্বাদ ছিল অসাধারণ। আমার বাবা বাজারে গেলে ইলিশ মাছ কিনতেন হালির হিসাবে, মুরগীও তাই। ঝাকা বোঝাই করে বাজার আসতো, দইওয়ালা হেঁকে যেতো এক দু’দিন পরপরই, মুড়ি থাকতো কেরোসিনের বাঁধাই-করা টিন ভর্তি। এসবের ব্যবস্থাপনা-দায়িত্বের সবটাই ছিল আমার মায়ের। তাঁর কাছে রন্ধনপ্রণালীর কোনো বই ছিল না, কিন্তু সব রান্না জানতেন। কত রকমের শাক চিনতেন, কত বিভিন্ন ধরনের ভর্তা করতেন- ধনে পাতা, পোড়া বেগুন, থানকুনি পাতা, কালো জিরা, কিসের নয়। এমনকি শুকনো মরিচও বেঁটে রাখতেন। কিন্তু এর কোনো কিছুতেই তিনি আসক্ত নন। আছেন, আবার নেইও। অনাসক্ত।
ভয়েস/আআ/সূত্র:রাইজিংবিডি
উপদেষ্টা সম্পাদক : আবু তাহের
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : আবদুল আজিজ
সম্পাদক: বিশ্বজিত সেন
অফিস: কক্সবাজার প্রেসক্লাব ভবন (৩য় তলা), শহীদ সরণি (সার্কিট হাউজ রোড), কক্সবাজার।
ফোন: ০১৮১৮-৭৬৬৮৫৫, ০১৫৫৮-৫৭৮৫২৩ ইমেইল : news.coxsbazarvoice@gmail.com
Copyright © 2026 Coxsbazar Voice. All rights reserved.