ফয়জুল্লাহ রিয়াদ:
দ্বীনি দাওয়াতের ক্ষেত্রে বুদ্ধিমত্তা, প্রজ্ঞা ও উপস্থিত বুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। ইসলামের ইতিহাসে তা বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। বিশেষ করে সাহাবায়ে কেরামের জীবন আমাদের সামনে এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছে, যেখানে তারা অত্যন্ত বিচক্ষণতা ও কৌশলের মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা স্তরে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছেন। এর মধ্যে অন্যতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো হাতিব ইবনে আবি বালতায়া (রা.)-এর ঘটনা, যা দাওয়াতি কাজের ক্ষেত্রে শিক্ষণীয় উদাহরণ।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী : হাতিব ইবনে আবি বালতায়া (রা.) একজন সম্মানিত বদরি সাহাবি। ইয়েমেনের লাখাম গোত্রে তার আদি নিবাস। কোরাইশদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে মক্কায় বসবাস করতেন। তিনি একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, দক্ষ তীরন্দাজ, খ্যাতিমান ঘোড়সওয়ার এবং সাবলীল ভাষার কবি ছিলেন। তার এই বহুমুখী প্রতিভা দাওয়াতি কাজের সফলতায় সহায়ক ভূমিকা পালন করত।
দাওয়াতের নতুন দিগন্ত : হুদায়বিয়ার সন্ধির পর ইসলামের দাওয়াত প্রচার-প্রসারের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। ষষ্ঠ হিজরিতে সংঘটিত ঐতিহাসিক এ সন্ধি মুসলমানদের জন্য শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বিশ্বের বিভিন্ন শাসক ও রাজাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিতে উদ্যোগী হন। বিভিন্ন দেশের বাদশাহদের নিকট পত্র পাঠিয়ে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে তাদের আহ্বান জানান।
রাসুলুল্লাহ (সা.) হাতিব ইবনে আবি বালতায়া (রা.)-কে দূত হিসেবে মিসরের শাসক মুকাওকিসের দরবারে প্রেরণ করেন। এটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দাওয়াতি মিশন। দূত হিসেবে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি তা যৌক্তিকভাবে উপস্থাপন করার কৌশলও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাদশাহর সঙ্গে কথোপকথন : হাতিব (রা.) মুকাওকিসের দরবারে পৌঁছে অত্যন্ত সম্মান ও প্রজ্ঞার সঙ্গে ইসলামের দাওয়াত উপস্থাপন করেন। মুকাওকিস তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনার পর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেন। তিনি জানতে চান, ‘তুমি যার পক্ষ থেকে এসেছ, তিনি কি সত্যিই আল্লাহর নবী?’
এর উত্তরে হাতিব (রা.) অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘অবশ্যই তিনি আল্লাহর নবী।’ এমন আত্মবিশ্বাসী উত্তর তার ইমানের দৃঢ়তা ও সত্যের প্রতি অবিচল অবস্থানের পরিচয় বহন করে। কিন্তু মুকাওকিস এখানেই থেমে থাকেননি। তিনি আরেকটি সূক্ষ্ম প্রশ্ন করেন, যা মূলত এক ধরনের আপত্তি বা সংশয়। তিনি বলেন, ‘যদি তিনি সত্যিই নবী হন, তাহলে যখন মক্কার লোকেরা তাকে ও তার অনুসারীদের মক্কা থেকে বের করে দেয়, তখন তিনি তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে বদদোয়া করেননি কেন?’
প্রশ্নটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সাধারণ দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, একজন নবী যদি নির্যাতনের শিকার হন, তবে তিনি নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে দোয়া করবেন। কিন্তু নবীজি (সা.) কেন এটা করেননি? এর দ্বারা মূলত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মহান চরিত্র ও সহনশীলতার একটি বিশেষ দিক উঠে আসে।
এখানেই হাতিব (রা.)-এর বুদ্ধিমত্তা ও উপস্থিত বুদ্ধির এক অনন্য দৃষ্টান্ত দেখা যায়। তিনি সরাসরি উত্তর না দিয়ে এমন একটি উদাহরণ তুলে ধরেন, যা মুকাওকিসের নিজস্ব বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। তিনি বলেন, ‘হজরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আ.)-কে তো আপনারা নবী মানেন। আপনাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে যখন তার স্বজাতির লোকেরা শূলে চড়ায়, তিনি কি তাদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করেছিলেন?’
এই প্রশ্নের মাধ্যমে হাতিব (রা.) অত্যন্ত কৌশলে মুকাওকিসকে তার নিজের বিশ্বাসের আলোকে চিন্তা করতে বাধ্য করেন। এটি ছিল বুদ্ধিমত্তার একটি অসাধারণ দৃষ্টান্ত। যেখানে শ্রোতার মানসিকতা ও বিশ্বাসকে সামনে রেখে যুক্তি উপস্থাপন করা হয়।
তিনি আরও বলেন, ‘মহান আল্লাহ তাকে আকাশে উঠিয়ে নেন।’ অর্থাৎ নবীদের বৈশিষ্ট্য হলো ধৈর্য, সহনশীলতা এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা। তারা প্রতিশোধপরায়ণ নন, মানবতার কল্যাণই তাদের লক্ষ্য।
হাতিব (রা.)-এর এই বুদ্ধিদীপ্ত ও প্রাঞ্জল জবাব মুকাওকিসকে অত্যন্ত প্রভাবিত করে। তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন, ‘তুমি একজন জ্ঞানী এবং আরেকজন জ্ঞানীর পক্ষ থেকেই প্রেরিত হয়েছ।’
আমাদের জন্য শিক্ষা : ঘটনাটি আমাদের সামনে বহু শিক্ষণীয় দিক তুলে ধরে। প্রথমত, দাওয়াতের ক্ষেত্রে কেবল জ্ঞান থাকাই যথেষ্ট নয়, সেই জ্ঞানকে কীভাবে উপস্থাপন করতে হবে, তা জানা অত্যন্ত জরুরি। দ্বিতীয়ত, শ্রোতার মানসিকতা ও বিশ্বাসকে বিবেচনায় রেখে কথা বললে দাওয়াত অধিকতর কার্যকর হয়। তৃতীয়ত, কঠিন প্রশ্নের সম্মুখীন হলেও ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে উত্তর দেওয়া একজন দাঈর প্রধানতম বৈশিষ্ট্য। (বাজলুল মাজহুদ ১২/১০১)
লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা
ভয়েস/আআ
উপদেষ্টা সম্পাদক : আবু তাহের
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : আবদুল আজিজ
সম্পাদক: বিশ্বজিত সেন
অফিস: কক্সবাজার প্রেসক্লাব ভবন (৩য় তলা), শহীদ সরণি (সার্কিট হাউজ রোড), কক্সবাজার।
ফোন: ০১৮১৮-৭৬৬৮৫৫, ০১৫৫৮-৫৭৮৫২৩ ইমেইল : news.coxsbazarvoice@gmail.com
Copyright © 2026 Coxsbazar Voice. All rights reserved.