মুফতি উবায়দুল হক খান:
বিয়ে মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। বিয়ের মাধ্যমে ব্যক্তি মানসিক শান্তি, চারিত্রিক পবিত্রতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা লাভ করে। দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, স্বামীর মৃত্যু হলে অনেক সমাজে বিধবা নারীকে অবহেলা, বঞ্চনা ও একঘরে করে রাখা হয়। অথচ ইসলাম এমন এক জীবনব্যবস্থা, যা বিধবা নারীর সম্মান, অধিকার ও পুনর্বাসনের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ইসলামে বিধবা বিয়েকে শুধু অনুমোদনই নয়, বরং মানবিক ও সামাজিক কল্যাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে উৎসাহিত করা হয়েছে।
বিধবার মর্যাদা ও অধিকার : ইসলাম বিধবা নারীকে সমাজের বোঝা মনে করে না, বরং তাকে সম্মানিত মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কোরআন মাজিদে মহান আল্লাহ বিধবা নারীদের প্রতি সুবিচার ও সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। স্বামী হারানোর পর নারীর জীবন যেন থেমে না যায়, এটাই ইসলামের শিক্ষা।
ইদ্দত পালন ও তার হেকমত : ইসলামে বিধবা নারীর জন্য পুনর্বিবাহের আগে নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করাকে ইদ্দত বলা হয়। এটি কোনো শাস্তি নয়, বরং ইসলাম ও সামাজিক কল্যাণের জন্য একটি বিধান। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা মৃত্যুবরণ করে এবং স্ত্রী রেখে যায়, তারা চার মাস দশ দিন অপেক্ষা করবে।’ (সুরা বাকারা ২৩৪) এই ইদ্দতের মাধ্যমে গর্ভাবস্থার বিষয়টি নিশ্চিত হয়, মৃত স্বামীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন হয়, মানসিকভাবে নতুন জীবনের জন্য প্রস্তুতির সুযোগ সৃষ্টি হয়। ইদ্দত শেষ হলে বিধবা নারীর পুনর্বিবাহে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
কোরআনে বিধবা বিয়ের বৈধতা : ইসলাম স্পষ্টভাবে বিধবা নারীর পুনর্বিবাহকে বৈধ ঘোষণা করেছে। কোরআন মাজিদে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘ইদ্দত পূর্ণ হলে তারা নিজেদের বিষয়ে যা করবে, তাতে তোমাদের কোনো গুনাহ নেই।’ (সুরা বাকারা ২৩৪) এই আয়াতের মাধ্যমে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, ইদ্দত শেষে বিধবা নারী নিজের ইচ্ছামতো বিয়ে করতে পারবে এবং এতে সমাজ বা অভিভাবকের কোনো বাধা দেওয়া বৈধ নয়।
হাদিসে বিধবা বিয়ের গুরুত্ব : রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেই বিধবা নারীদের বিয়ে করে এই বিধানের বাস্তব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তার অধিকাংশ স্ত্রীই ছিলেন বিধবা। বিশেষ করে, খাদিজা (রা.), সাওদা (রা.), উম্মে সালামা (রা.), জয়নব বিনতে খুজাইমা (রা.) বিধবা ছিলেন। এটি প্রমাণ করে, বিধবা বিয়ে কোনো লজ্জা বা ত্রুটি নয়, বরং একটি সম্মানজনক ও সওয়াবের কাজ। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো বিধবা বা অসহায় নারীর দায়িত্ব গ্রহণ করে, সে আল্লাহর পথে জিহাদকারীর মতো।’ (সহিহ বুখারি) এই হাদিসে বিধবা নারীর দায়িত্ব নেওয়াকে সর্বোচ্চ নেক আমলের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
বিধবা বিয়েতে সামাজিক কল্যাণ : বিধবা বিয়ে সমাজে বহু কল্যাণ বয়ে আনে। এতে চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষা হয়। একাকিত্ব অনেক সময় পাপের পথে ঠেলে দিতে পারে। বিয়ে নারী-পুরুষ উভয়ের চরিত্র রক্ষা করে। নারীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। বিধবা নারী অনেক সময় জীবিকার সংকটে পড়ে। বিয়ে তাকে আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা দেয়। সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে। বিধবা নারীর সন্তানরা পিতৃহীন অবস্থায় বেড়ে ওঠে। নতুন অভিভাবক পেলে তারা স্নেহ ও দিকনির্দেশনা পায়। সমাজে ব্যভিচার ও অনৈতিকতা কমে। বৈধ বিয়ের মাধ্যমে সমাজ পবিত্র থাকে।
সমাজের ভুল ধারণা ও ইসলামের অবস্থান: অনেক মুসলিম সমাজে এখনো ধারণা রয়েছে, বিধবা বিয়ে করা অসম্মানজনক। এসব ধারণা কোরআন-হাদিসবিরোধী। ইসলাম এসব কুসংস্কার ভেঙে দিয়ে ন্যায়, মানবতা ও বাস্তবতাকে প্রাধান্য দিয়েছে।
বিধবা বিয়েতে নারীর সম্মতি : ইসলামে বিয়ের মূল শর্ত হলো, নারীর পূর্ণ সম্মতি। বিধবা নারীকে জোর করে বিয়ে দেওয়া বা বিয়ে থেকে বিরত রাখা দুটিই হারাম। রাসুল (সা.) বলেন, ‘বিধবা নারীর অনুমতি ছাড়া তার বিয়ে দেওয়া যাবে না।’ (সহিহ মুসলিম)
লেখক : মুহাদ্দিস ও শিক্ষা সচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর
ভয়েস/আআ
উপদেষ্টা সম্পাদক : আবু তাহের
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : আবদুল আজিজ
সম্পাদক: বিশ্বজিত সেন
অফিস: কক্সবাজার প্রেসক্লাব ভবন (৩য় তলা), শহীদ সরণি (সার্কিট হাউজ রোড), কক্সবাজার।
ফোন: ০১৮১৮-৭৬৬৮৫৫, ০১৫৫৮-৫৭৮৫২৩ ইমেইল : news.coxsbazarvoice@gmail.com
Copyright © 2026 Coxsbazar Voice. All rights reserved.