সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:৩৭ অপরাহ্ন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
দুই বছর আগে নরেন্দ্র মোদি সরকার একতরফাভাবে সংবিধানের ৩৭০ ধারা রদ করে কাশ্মীরের স্বায়ত্ত্বশাসনের অধিকার কেড়ে নেয়। এর ঠিক পরপরই ৪৫ বছর বয়সী আব্দুল হামিদ গ্রেপ্তার হন। নিজ বাড়ি থেকেই তাকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। ১৮ মাস ধরে জামিন ব্যতিত জেলে আছেন তিনি। এমনকি তার মায়ের মৃত্যুর পর জানাজায় অংশ নিতেও জামিন দেওয়া হয়নি তাকে।
হামিদের শ্যালক সাজ্জাদ দার বলেন, তার মা নিজের একমাত্র ছেলেকে এক নজর দেখার জন্য প্রায় দুই বছর অপেক্ষা করেছিলেন। বেঁচে থাকতে তাকে ওই সুযোগ দেওয়া হলো না। মৃত্যুর পরও না।
সাজ্জাদ বলেন, তাকে কবর দিয়েছিল গ্রামবাসীরা। অথচ, তার কবরে শেষ মাটি দিয়ে এ শেষকৃত্য সম্পন্ন করার কথা ছিল তার ছেলের।
আরেক রাজনৈতিক বন্দী রিয়াজ আহমেদ দার (৩৩) গ্রেপ্তার হন ২০১৩ সালে। কাশ্মীরের চাদুরা এলাকায় এক পুলিশ কর্মী হত্যার তদন্ত চলাকালে গ্রেপ্তার হন তিনি। ২০১৭ সালে ওই ঘটনায় নিষ্কৃতি পেলেও এখনও মুক্তি দেওয়া হয়নি তাকে। বৃটেনের ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকার এক প্রতিবেদনে এসব বলা হয়।
রিয়াজের বাবা গোলাম রসুল দার বলেন, ‘২০২০ সালের ঈদের পর থেকে তার সাথে কথা হয়নি আমাদের।’ কারাগারগুলোয় করোনা ভাইরাসের (কোভিড-১৯) সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি জানান, ছেলে কী অবস্থায় আছে সে বিষয়ে কিছুই জানেন না। গোলাম বলেন, ‘আমরা যখনই ফোন করি তখনই কারা কর্তৃপক্ষ আমাদের জানায় যে তিনি ঠিক আছেন। কিন্তু কখনো তার সাথে কথা বলতে দেওয়া হয় না।’
রিয়াজ বন্দি অবস্থায় প্রথম দুই বছর কাটিয়েছেন জম্মুর কোট বালওয়াল কারাগারে। এরপর তাকে হরিয়ানা রাজ্যের কার্নাল কারাগারে সরিয়ে নেওয়া হয়। সংবিধানে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করার সময়ই তাকে অন্য রাজ্যের কারাগারে সরিয়ে নেয় মোদি সরকার। এরপর থেকে পরিবার বা আইনজীবী কারো সাথেই তাকে দেখা করতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন রিয়াজের বাবা।
গোলাম বলেন, ‘তাকে অন্য কারাগারে সরানোর আগে আমাদের জানানোও হয়নি। তার সঙ্গে একই অভিযোগে আটক হওয়া আরেক বন্দীকে একজন দেখতে জম্মু গিয়ে জানতে পারেন যে রিয়াজকে সরানো হয়েছে।
রিয়াজ এবং হামিদ উভয়কে জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর পাবলিক সেফটি এক্ট (পিএসএ) বা জননিরাপত্তা আইনের অধীনে আটক করা হয়। মোদি সরকার জম্মু ও কাশ্মীরের স্বায়ত্ত্বশাসন কেড়ে নেওয়ার আগে ও পরে তাদের মতো মোট ৭ হাজার ৩৫৭ জন কাশ্মীরিকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর মধ্যে পিএসএ-র অধীনে গ্রেপ্তার হন ৩৯৬ জন।
এই বিতর্কিত আইনের আওতায়, কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, বিচার ও শুনানি ছাড়াই দুই বছর পর্যন্ত আটকে রাখার অধিকার রয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর। সম্প্রতি ভারতজুড়ে চলমান করোনার ভয়াবহ সংক্রমণের মধ্যে কারাগারগুলোতেও ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার খবর প্রকাশ হয়েছে। এমতাবস্থায় কারাবন্দীদের পরিবাররের সদস্যরা অন্তত এই মহামারী নিয়ন্ত্রণে না আসা অবধি প্যারোলে তাদের মুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন।
রিয়াজের বাবা বলেন, ‘প্রতিদিন আমরা হাজতে কত মানুষ আক্রান্ত হওয়ার খবর শুনি। বাইরেই স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া কঠিন। সৃষ্টিকর্তা জানে তারা তাকে (রিয়াজ) সেখানে কিভাবে রেখেছে। আর কিছু না হলেও, তারা অন্তত তাকে জম্মু ও কাশ্মীরের কারাগারেতো সরিয়ে আনতে পারবে না? কতদিন হয়ে গেলো আমরা তাকে দেখি না।
রিয়াজের আইনজীবী কায়সার আলি জানান, রিয়াজের বিরুদ্ধে পিএসএ’র অধীনে আনা অভিযোগটি গত আগস্ট থেকে আদালতে ঝুলে আছে। তিনি বলেন, ‘প্রতিবার আমাদের শুনানির তারিখ পিছিয়ে দেওয়া হয়। অনেকদিন ধরেই এই শেষ পর্যায়ে এসে আটকে আছে। কিন্তু করোনার কারণে আদালত নিয়মিত মামলা শুনতে পারছেন না। তারিখ কেবল পিছিয়েই যাচ্ছে।’
মানবাধিকার সংস্থাগুলো, পিএসএ’র অধীনে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে উল্লেখ করে তাদের মুক্তি ও কারাগার বদলির দাবি জানিয়েছে। গত মাসে বন্দি থাকাকালে বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা আশরাফ সেহরাই’র মৃত্যুর পর এমন দাবি জোরদার হয়েছে। কাশ্মীরের স্বাধীনতাপন্থি তেহরিক-ই-হুরিয়াত দলের প্রেসিডেন্ট ৭৮ বছর বয়সী সেহরাই কাশ্মীরের উপর দিল্লির শাসন বন্ধের অন্যতম নেতা ছিলেন। গত বছরের ১২ই জুলাই পিএসএ’র আওতায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর থেকে উধামপুর কারাগারেই ছিলেন তিনি। তবে সম্প্রতি শ্বাসকষ্টের কথা জানালে তাকে জম্মুর এক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই মারা যান তিনি। মৃত্যুর পর পরীক্ষা করে জানা যায়, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন তিনি।
সাহরাই’র ১৭ বছর বয়সী নাতী ইশাক খালিদ খান তার দাদার মৃত্যুকে ‘পুলিশি হেফাজতে হত্যা’ হিসেবে বর্ণনা করেন। বলেন, তার দাদার বেশকিছু অসুস্থতা ছিল। সেগুলোর জন্য নিয়মিত চিকিতসার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়নি।
ইশাক বলেন, ‘কারাগারের ভেতর কারা কর্তৃপক্ষ তাকে নিজ থেকে ওষুধ দিতো না। এখান থেকে আমাদের পাঠাতে হতো। এমনকি তার মেডিক্যাল চেক-আপও করা হতো না। এজন্যই তিনি মারা গেছেন। তার শেষ দিনগুলোয় তিনি আমাদের জানিয়েছিলেন যে, আদালতের অনুমোদন নিয়ে আমাদের পাঠানো ওষুধসহ কোনো ধরণের স্বাস্থ্যসেবাই তিনি পাচ্ছিলেন না। তিনি যদি প্রয়োজনীয় সেবাগুলো পেতেন তাহলে নিশ্চিতভাবেই বেঁচে থাকতেন।’
সেহরাই’র মৃত্যুকে শোক প্রকাশ করে, কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি টুইটারে লিখেন, ‘আজকের ভারতে ভিন্নমতপোষণের জন্য মানুষজনকে প্রাণ দিতে হয়। তার মতো হাজারো রাজনৈতিক বন্দি এবং জম্মু ও কাশ্মীরের অন্যান্য বন্দিরা কেবলমাত্র তাদের আদর্শগত অবস্থান ও চিন্তাধারার কারণে কারাগারে আছেন।’
এসব বন্দিদের প্যারোলে মুক্তি দিয়ে পরিবারের কাছে ফিরে যেতে দিতে প্রধানমন্ত্রী মোদির কাছে আহ্বান জানান তিনি।
একইধরণের আহ্বান জানিয়েছে জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর হাই কোর্ট বার এসোসিয়েশন। তারা এসব ‘বন্দিদের কাশ্মীর উপত্যকায় সবচেয়ে নিকটস্থ কারাগারে বদলি করতে’ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
গত মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট করোনার দ্বিতীয় প্রবাহের তীব্রতা বিবেচনায় কারাগারগুলোয় জনাকীর্ণতা হ্রাস করতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে। কারাবন্দীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর প্রত্যাশা, এই নির্দেশের আওতায় কাশ্মীরের রাজনৈতিক বন্দিদের উপত্যকাটির কারাগারগুলোয় সরিয়ে নেওয়া হতে পারে। তবে পিএসএ’র অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ জারি রয়েছে তাদের মধ্যে।
অপরাধ আইনজীবী মির উর্ফি বলেন, ‘২০১৮ সালের আগস্ট অবধি পিএসএ’র অধীনে গ্রেপ্তার হওয়া কাউকে জম্মু ও কাশ্মীরের বাইরের কারাগারে পাঠানো যে না। কিন্তু মোদি সরকারের সংবিধান সংশোধনের পর থেকে তাদের ভারতের যেকোনো জায়গায় সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তাদের অনেককেই এখন আগ্রা, বারানসি, হরিয়ানায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পিএসএ’র অপব্যবহার হচ্ছে। কারণ, আমরা আমাদের মক্কেলদের দেখতেই পারছি না। কোনো বন্দি যদি বারানসিতে আটক থাকে তাহলে তার সাথে কাশ্মীরের একজন আইনজীবী দেখা করবে কিভাবে? তার উপর, এখন বিদ্যমান লকডাউনের সময়গুলোয় চলাচল সীমিত থাকায়তো তা আরো সম্ভব নয়।’
তিনি বলেন, ‘বন্দিদের বাড়ি থেকে দূরে রাখাও শাস্তি। তারা পরিবারের সবাই কী অবস্থায় আছে জানে না, পরিবারের লোকেরাও তাদের বিষয়ে জানে না। তাদের মাসে একবার ফোনে কথা বলতে দেওয়া হয়। আর করোনার কারণে এখন সরাসরি দেখা করা বন্ধ রয়েছে। আমার মক্কেলের পরিবার বা আমার যদি তার সাথে দেখা করার সুযোগ থাকতো তাহলে আমি তার স্বাস্থ্যের অবস্থা সম্পর্ক জানতে পারতাম। কিন্তু এখন তারা অন্য কোনো রাজ্যের কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে।’
এদিকে, চাদুরায় রিয়াজের পরিবার তার মুক্তির আশা করা ছেড়ে দিয়েছে। তার বাবা গোলাম জানান, প্রশাসন তার আর্জি শুনবেন এমনটা আর তিনি আশা করেন না।
তিনি বলেন, ‘আইন মানা হলে আমার ছেলে এতদিন জেলে বন্দি থাকতো না। আমি এখন আর সরকার বা আইনের ব্যাপার জানি না। আমি জানি, কেবল আল্লাহই আমাদের কথা শুনবেন।’সূত্র:মানবজমিন।
ভয়েস/জেইউ।