আমদানি-রপ্তানির ৯২ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে হওয়ার কারণে সমৃদ্ধির স্বর্ণদ্বার বলা হয় দেশের মুখ্য এই বন্দরকে। ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য চাহিদা মোকাবিলায় কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ীতে দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কাজ চলছে। চট্টগ্রাম বন্দরের অধীনে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে। বন্দর সংশ্লিষ্টরা স্বপ্নের গভীর সমুদ্রবন্দরকে ভাগ্যদ্বার হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ২০২৬ সালে পুরোপুরি চালু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে আজ মঙ্গলবার মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দরে জাহাজ প্রবেশের জন্য তৈরি করা চ্যানেলে প্রথম জাহাজ প্রবেশ করছে। এর মধ্য দিয়ে পরীক্ষামূলক জাহাজ চলাচল শুরু হচ্ছে দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দরে।
মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবকাঠামো নির্মাণসামগ্রী নিয়ে ইন্দোনেশিয়া থেকে আসা ‘ভেনাস ট্রায়াম্প’ জাহাজটি আজ সকালে জেটিতে পৌঁছার কথা রয়েছে। আজ বুধবার জাহাজটি জেটি ত্যাগ করবে। চ্যানেল দিয়ে নিরাপদে জাহাজ প্রবেশ করাতে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে চট্টগ্রামবন্দর কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, চ্যানেলের এক পাশে তিনটি জেটিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সামগ্রী ওঠানামা হবে। বিপরীত পাশে গড়ে উঠবে
গভীর সমুদ্রবন্দর। জাহাজ প্রবেশ করাতে বয়া থেকে শুরু করে সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। প্রকল্পের নির্মাণ ও অবকাঠামো সামগ্রী নিয়ে পর্যায়ক্রমে আরও জাহাজ আসবে।
গভীর সমুদ্রে আসার পর জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরের পাইলটরাই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য নির্মিত জেটিতে নিয়ে আসবেন বলে ক্যাপ্টেন আতাউল হাকিম জানিয়েছেন। তিনি জানান, গভীর সমুদ্রবন্দরের জন্য বঙ্গোপসাগেরে যে চ্যানেলটি তৈরি করা হয়েছে, সেটি ২৫০ মিটার চওড়া এবং ১৮ মিটার গভীর। জাহাজ চলাচলের পথনির্দেশনার জন্য এরই মধ্যে ছয়টি বয়া চ্যানেলে স্থাপন করা হয়েছে। আর মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য নির্মিত হয়েছে তিনটি জেটি।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্পে মোট খরচ হচ্ছে ১৭ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা। ২৬ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণও এই ব্যয়ের সঙ্গে সংযুক্ত। শুধু সমুদ্রবন্দর নির্মাণের জন্য ব্যয় হচ্ছে ৮ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিদেশি সংস্থা জাইকা ১২ হাজার ৮৯২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা সহজ শর্তে ঋণ দিচ্ছে। সরকার জোগান দিচ্ছে দুই হাজার ৬৭১ কোটি ১৫ লাখ টাকা এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ অর্থায়ন করবে ২ হাজার ২১৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।
চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব মো. ওমর ফারুক বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের চ্যানেল দিয়ে সর্বোচ্চ সাড়ে ৯ মিটার ও ১৯০ মিটার দীর্ঘ জাহাজ বন্দরের জেটিতে ঢুকতে পারে। মাতারবাড়ীতে ১৮ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়তে পারবে।
চ্যালেন ব্যবহার শুরুকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, চ্যানেল ব্যবহারের মাধ্যমে সম্ভাবনার স্বর্ণদ্বার উন্মোচন হচ্ছে। এই বন্দরের যথাযত ব্যবহার নিশ্চিত করে দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন তারা। বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, বন্দরের সঙ্গে সঙ্গে রেল ও সড়ক যোগাযোগ চালু করতে হবে। না হলে এই বন্দরের সুবিধা উপভোগ করতে পারবে না।
জানা গেছে, ২৯ ডিসেম্বরের পর ৫ জানুয়ারি আরেকটি জাহাজ ভিড়তে পারে মাতারবাড়ীতে। দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের আগে প্রস্তুত করা হয়েছে আড়াইশ মিটার প্রস্থ, ১৮ মিটার গভীরতা এবং ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ চ্যানেল। এই চ্যানেল দিয়েই বঙ্গোপসাগর থেকে জাহাজ বন্দর জেটিতে প্রবেশ করবে। গভীর সমুদ্র থেকে জাহাজগুলো চ্যানেল দিয়ে জেটিতে প্রবেশের জন্য বসানো হয়েছে পথ নির্দেশক ছয়টি বয়া।
উল্লেখ্য, বাস্তবায়নাধীন মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে এর আগেও সেখানে জাহাজ ভিড়েছিল। কিন্ত তখন ওই এলাকা চট্টগ্রাম বন্দরের আওতাধীন ছিল না। ফলে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় জাহাজ ভেড়ানো এবং পণ্য খালাসের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তাই বন্দর কোনো ধরনের মাসুল আদায় করতে পারেনি। পরে বন্দরের আওতা মিরসরাই থেকে কুতুবদিয়া পর্যন্ত বাড়ানো হয়। ফলে ভেনাস জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থানায় জেটিতে আনা হচ্ছে। এ জন্য যাবতীয় মাসুল আদায় করছে।
এরইমধ্যে প্রস্তুত হয়েছে ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ চ্যানেল। যার গভীরতা ১৮ মিটার। তৈরি হয়েছে জেটিও। বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে এই জেটিতেই ভিড়বে ভেনাস ট্রায়াম্প নামে জাহাজটি। যাতে থাকবে ৭৩৬ মেট্রিক টন স্টিল পণ্য।
মাতারবাড়ি বন্দরের কাজ শেষ হবার কথা ২০২৫ সালের মধ্যে। যাতে খরচ হচ্ছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। এই বন্দর চালু হলে ভিড়তে পারবে ১৮ মিটার গভীরতার জাহাজ।