সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ০১:১৯ অপরাহ্ন
জিকির উল্লাহ জিকু:
অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্য মোকাবেলায় সাংবাদিকদের নিয়ে এক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় বক্তারা বলেছেন, ‘বন্যপ্রাণীর অবৈধ বাণিজ্য দমনে একটা বড় চ্যালেঞ্জের জায়গা হলো অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনা করা। বন্যপ্রাণীর অবৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যের বিরুদ্ধে আমাদের সকলের একাত্ম হয়ে লড়তে হবে। সাংবাদিক, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবিদসহ দেশের প্রতিটি নাগরিককে সরকারের সাথে একযোগে কাজ করতে হবে। আমাদের বন্যপ্রাণীরা আমাদের সম্পদ। যদি আমরা দ্রুতই কোন পদক্ষেপ না নেই অচিরেই আমরা এদের চিরতরে হারিয়ে ফেলবো।
শুক্রবার (২৯ জানুয়ারি) দিনব্যাপী কক্সবাজারের একটি তারকামানের হোটেলে বন্যপ্রাণী ব্যবসা-বাণিজ্য এবং এ সংক্রান্ত অপরাধগুলোর প্রতিবেদনের গুণগত মানোন্নয়নে এবং গণমাধ্যমকর্মীদের সঠিক ও সম্পূর্ণ প্রতিবেদন লেখার দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ডাব্লিউসিএস বাংলাদেশ ও বন অধিদপ্তর যৌথভাবে উদ্যোগে আয়োজিত কর্মশালায় বক্তরা এসব কথা বলেন। এতে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের ৩২জন সাংবাদিক অংশ নেয়।
বনবিভাগের চট্টগ্রাম অঞ্চলের বনসংরক্ষক মোহাম্মদ আবদুল আওয়াল সরকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় বিশেষ অতিথি ছিলেন কক্সবাজার প্রেসক্লাব ও কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মো: আবু তাহের। এতে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, ডাব্লিউসিএস বাংলাদেশ প্রোগ্রামের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. মো: জাহাঙ্গীর আলম ও লিগ্যাল এডভাইজার ড. লস্কর মোখছুদুর রহমান। এছাড়াও প্রশিক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, মোঃ তারিকুল ইসলাম, সিনিয়র অ্যাডভাইজার; সামিউল মোহসেনিন, কো-অর্ডিনেটর, বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন প্রোগ্রাম; এবং নাদিম পারভেজ, এডুকেশন কো-অর্ডিনেটর, ডাব্লিউসিএস বাংলাদেশ।

কর্মশালায় কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল বলেছেন, ‘বন্যপ্রাণী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সকলে একযোগে কাজ করতে হবে। একই সাথে বন্যপ্রাণীকে নিয়ে অবৈধ বাণিজ্য বন্ধে সোচ্চার হতে হবে। সাগরের হাঙ্গর, শাপলাপাতা মাছ, কচ্ছপ ও ডলফিন সহ নানা প্রাণীকে অবৈধ বাণিজ্য আশংকাজনক বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই, আমাদের দায়িত্বশীল আচরণের অভাবে এরা আজ হুমকির সম্মুখীন।’
বন্যপ্রাণী মানুষের ভারসাম্য রক্ষা করার কথা উল্লেখ করে প্রধান অতিথি মো: ইসমাইল আরও বলেন, সাংবাদিকরা লেখনির মাধ্যমে জনমত সৃষ্টির মাধ্যমে সমাজে সচেতনতা তৈরী করতে পারেন। কক্সবাজারের চকরিয়া, রামু ও উখিয়া বনভুমি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব এলাকার কিছু অভাবি মানুষ পাহাড় ও বন ধংস করছে। আবার এক শ্রেণীর প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অতি লোভের আশায় বন সম্পদ ধংস করে যাচ্ছে। এছাড়াও মিয়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কারনে বনভুমি ধ্বংস ও বন্যপ্রাণী হুমকির মুখে পড়েছে’।
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি কক্সবাজার প্রেসক্লাব ও কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মো: আবু তাহের বলেন, ‘বন্যপ্রাণী অপরাধ বা অবৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত সঠিক এবং সম্পূর্ণ প্রতিবেদন লেখার ক্ষেত্রে মানোন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে। এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে আংশিক তথ্য নয়, বিস্তারিত ও সঠিক খবরাখবর তুলে ধরতে হবে। কোন প্রজাতি, কোথা হতে আসছে, কিভাবে আসছে, কোথায় যাচ্ছে, কতজন অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং পরবর্তী বিচারকার্যের কি হলো, সবকিছু। তাহলেই কেবল বন্যপ্রাণীর অবৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা সম্ভব হবে।’
কর্মশালার প্রশিক্ষক ও ডাব্লিউসিএস বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. মোঃ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘এই কর্মশালাটি অংশগ্রহণকারী গণমাধ্যমকর্মীদেরকে বন্যপ্রাণীর ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কিত প্রতিবেদনসমূহের ত্রুটি-বিচ্যুতি চিহ্নিত করে সঠিক ও তথ্যবহুল প্রতিবেদন লেখার ও জনগণকে সচেতন করে তোলার মাধ্যমে বন্যপ্রাণীর অবৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধে সহায়ক ভূমিকা পালনের সুযোগ করে দিবে।’

বাংলাদেশ বন অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম সার্কেলের বন সংরক্ষক মোঃ আব্দুল আউয়াল সরকার তাঁর সমাপনী বক্তব্যে বলেন, ‘অবৈধ বন্যপ্রাণী ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে জড়িতদের খুঁজে বের করতে, গ্রেফতার করতে এবং বিচারকার্য সম্পন্ন করতে দেশের বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বন অধিদপ্তর এবং ডাব্লিউসিএস বাংলাদেশ সম্মিলিতভাবে প্রয়োজনীয় কার্যকরি প্রশিক্ষণ কর্মশালা নিয়মিতভাবে পরিচালনা করছে। বন্যপ্রাণী ব্যবসা-বাণিজ্যের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা ও জনমত তৈরির মাধ্যমে এবং পাচারকারীদের বিরুদ্ধে বিচারকার্যের বিস্তারিত প্রতিবেদন তুলে ধরে গণমাধ্যমকর্মীরাও আমাদের এই প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।’
উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাপী বিপন্ন এমন প্রজাতিসহ অসংখ্য প্রজাতির স্থলজ এবং জলজ বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল বাংলাদেশ। কিন্তু স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অবৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে এদের একটা বড় অংশ আজ বিলুপ্তপ্রায়। দেশের বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার প্রকাশিত প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটি (ডাব্লিউসিএস) বাংলাদেশ বন্যপ্রাণীর অবৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যের উপর একটি ডাটাবেস সংরক্ষণ করে আসছে। ২০১২ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রতিবেদনকৃত ৬০৯টি বন্যপ্রাণীর ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কিত ঘটনার মধ্যে শতকরা প্রায় ৬০ ভাগ ক্ষেত্রেই বন্যপ্রাণী প্রজাতি সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে প্রাণীকে ভুল নামে সনাক্ত করা হয়েছে। অনেক প্রতিবেদনেই জব্দকৃত প্রাণী বা দেহাংশের পরিমাণ, গ্রেফতারকৃত অপরাধীর সংখ্যা কিংবা পরবর্তী বিচারকার্য সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। বিস্তারিত এসব তথ্য-উপাত্ত বন্যপ্রাণী ব্যবসা-বাণিজ্যের ধরণ ও গতিধারা সম্পর্কিত ধারনার পাশাপাশি সর্বস্তরের জনগনের মাঝে বন্যপ্রাণী ব্যবসা-বাণিজ্য দমনে সচেতনতা গড়ে তোলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী গণমাধ্যমকর্মীরা বিভিন্ন অনুশীলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রতিবেদনের ত্রুটি ও তথ্য অপ্রতুলতা চিহ্নিত করে সঠিক ও তথ্যবহুল প্রতিবেদন লেখা, নিয়মিতভাবে বাণিজ্যকৃত প্রাণীসমূহ সনাক্ত করার উপায় ও বিশ্বব্যাপী বিপন্ন বন্যপ্রাণীর ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইন ও বিধিমালাসমূহ সম্পর্কেও জানতে পেরেছেন। অংশগ্রহণকারীদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কর্মশালায় কোভিড-১৯ সংক্রান্ত সকল স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলা হয়েছে।
ভয়েস/আআ