শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:২৬ পূর্বাহ্ন
মা-বোনদের সাথে মেজর সিনহার পরিবার আবদুল আজিজ:
টেকনাফের বাহারছড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রে পুলিশের গুলিতে নিহত সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর সিনহা মো: রাশেদ খান হত্যা মামলার এক বছর পূর্ণ হলো আজ। ইতিমধ্যে উক্ত হত্যা মামলার কার্যক্রম অনেক দূর এগিয়েছে। তবে করোনার কারণে লকডাউনের কবলে পড়ে আদালতে কার্যক্রম বন্ধ থাকায় মামলা সাক্ষী গ্রহণ থেমে আছে। কিন্তু, থেমে যায়নি মেজর সিনহা মো: রাশেদ খানের পরিবারের সদস্যদের মনের আগুন। প্রতিনিয়ত সেই আগুনে পুড়ছে সিনহার মা, বোন ও পরিবারের স্বজনরা। শত চেষ্টা করেও সিনহার স্মৃতি মন থেকে মুঁছতে পারছেন না তারা। তাই, যতদ্রুত সম্ভব মামলার কার্যক্রম শেষে ওসি প্রদীপ-লিয়াকতদের শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি পরিবারের। এসব অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত হলে দেশে কেউ আর কোন অপরাধ করার সাহস পাবে না বলে মন্তব্য করে মেজর সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস।
শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস কক্সবাজার ভয়েসকে বলেন, ‘লকডাইনে বিচার কাজ দীর্ঘায়িত হচ্ছে। লকডাইন এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মামলার চার্জসীট ও স্বাক্ষীর পর্যায়ে পৌছানো পর্যন্ত ঠিক ছিল। কিন্তু, লকডাউনে মামলার কার্যক্রম পিছিয়ে দিয়েছে। এভাবে যদি মামলার কার্যক্রম আরও দীর্ঘায়িত হয় তাহলে আমার মনে হয় মামলার সাক্ষীদের ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ, সাক্ষীরা কে কোথায় থাকবে, কে চলে যাবে তার কোন ঠিক নেই। আমার কাছে মনে হয় লকডাউনটা শেষ হলে আজ হউক, একমাস পরে হউক আদালতের যখনই ইচ্ছা খুব দ্রুত সাক্ষ্যগ্রহন শেষ করে বিচারকাজ সম্পন্ন করা এবং আসামীদের শাস্তি নিশ্চিত করা। আমরা চাই সুষ্টু বিচার ও সঠিক রায়ের মাধ্যমে ওসি প্রদীপ, লিয়াকদের যেন মৃত্যুদন্ড হয়। আমাদের এটাই প্রত্যাশা’।
মামলা চার্জসীটের বিষয়ে সন্তোষ্ট কিনা জানতে চাইলে শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস কক্সবাজার ভয়েসকে বলেন, ‘মামলার চার্জসীট নিয়ে এই মুহুর্তে বলার কিছুই নেই। তবে দ্রুত সময়ের মধ্যে মামলার চার্জসীট জমা দেয়ায় তদন্তকারি সংস্থাকে ধন্যবাদ জানায়। কিন্তু, যেদিন মামলার রায় হবে, আসামীদের মৃত্যুদন্ড হবে, সেদিনই সন্তোষ্টির কথাটি বলতে পারব।’
প্রদীপের পক্ষে জামিনের আবেদন নিয়ে শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস কক্সবাজার ভয়েসকে বলেন, ‘দেশের যেকোন নাগরিক আদালতে আশ্রয় নিতে পারে। কিন্তু, আমার অবাক লাগে ওসি প্রদীপ কুমার দাশ টেকনাফে থাকাকালিন দুইশ’ আড়াইশ’ লোককে গুলি করে মেরেছে। তারা যে সবাই ইয়াবা কারবারি ছিল তা নয়। এরমধ্যে অনেকেই আছে তাকে চাঁদা দিতে না পেরে হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে। আচ্ছা ধরে নিলাম সবাই ইয়াবাকাবারি। তাদের কি আইনে আশ্রয় নেয়ার অধিকার নেই? তাদের কি ধরে এনে বিচারের মুখোমুখি করা যেত না? এটি তো মানবাধিকারের লঙ্গণ। ওসি প্রদীপ এত মানুষ হত্যা করার পর এখন যদি সে আইনের আশ্রয় চাওয়ার জন্য আদালতে যায়, তখন কিছুই বলার থাকে না।
এদিকে বাদি পক্ষের আইনজীবী এডভোকেট মোহাম্মদ মোহাম্মদ মোস্তফা কক্সবাজার ভয়েসকে বলেন, ‘আলোচিত সিনহা হত্যা মামলাটি এখন সাক্ষী পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু, লকডাউনের কারণে থমকে আছে। সাক্ষী হয়ে গেলে রায় হয়ে যাবে। এটি সম্পূর্ণ আদালতের উপর নির্ভর করছে। গত ২৬,২৭ ও ২৮ জুলাই উক্ত মামলার ৮৩জন সাক্ষীদের মধ্যে ১০জন সাক্ষীর সাক্ষগ্রহনের দিন ধার্য্য ছিল। কিন্তু, লকডাউনে বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছে। ’
মামলার ভবিষ্যত সম্পর্কে জানতে চাইলে কক্সবাজারের এই প্রবীণ আইনজীবী কক্সবাজার ভয়েসকে বলেন, ‘দেশের বিচার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ নির্ভর করে সাক্ষীদের উপর। তাই, যত দ্রুত সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হবে, ততদ্রুত মামলার রায় হয়ে যাবে।’
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাত ৯টার দিকে কক্সবাজারের টেকনাফের বাহারছড়া শামলাপুর পুলিশ তদন্তকেন্দ্রে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সেনা বাহিনীর সাবেক মেজর সিনহা মো: রাশেদ খান। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) মোহাম্মদ মিজানুর রহমানকে আহ্বায়ক করে চার সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। এই কমিটি সরেজমিনে তদন্ত করে ঘটনার কারণ ও উৎস অনুসন্ধানের প্রতিবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সুপারিশসহ জমা দেন।
হত্যারকান্ডের ৫দিনের মাথায় অর্থাৎ ৫ আগস্ট পুলিশের গুলিতে নিহত মেজর সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস বাদি হয়ে শামলাপুর পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের বরখাস্ত হওয়া সাবেক এসআই লিয়াকত আলী ও টেকনাফ থানার বরখাস্ত হওয়া সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ সহ ৯জনকে আসামী করে কক্সবাজার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। মামলাটি র্যাব-১৫ কক্সবাজারকে তদন্তের নির্দেশ দেন।
ওই সময়ে আলোচিত এই মামলাটি র্যাব-১৫ কক্সবাজারে দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারি পুলিশ সুপার জামিল আহমদকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হলেও পরে আদালত উক্ত কর্মকর্তার পরিবর্তে সহকারী পরিচালক ও সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার খায়রুল ইসলামকে তদন্তের দায়িত্ব দেন। যার মামলা নম্বর : এসটি-৪৯৩/২০২১ ইংরেজী, জিআর মামলা নম্বর : ৭০৩/২০২০ ইংরেজি, টেকনাফ মডেল থানা মামলা নম্বর : ৯/২০২০ ইংরেজি।
ওই মামলায় ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর ১নং আসামী বরখাস্তকৃত এসআই লিয়াকত আলী ও বরখাস্তকৃত সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাসসহ ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে এবং ৮৩ জন সাক্ষীসহ আলোচিত মামলাটির চার্জসীট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন র্যাব-১৫ এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম। ১৫ জনকে আসামি করে দায়ের করা অভিযোগপত্রে সিনহা হত্যাকান্ডকে একটি ‘পরিকল্পিত ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। পরে ২০২১ সালের ২৪জুন চার্জসীটভুক্ত আরেক আসামী কনস্টেবল সাগর দেব আদালতে আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে আলোচিত এই মামলার ১৫ আসামির সবাই আইনের আওতায় আসে।
রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবী ও কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি (পাবলিক প্রসিকিউটর) এডভোকেট ফরিদুল আলম কক্সবাজার ভয়েসকে জানান, কক্সবাজার জেলার আলোচিত মেজর সিনহা হত্যাকান্ডের মামলাটি বর্তমানে কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে লকডাউনের কারণে হাইকোর্টের নির্দেশে সারাদেশের মতো কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে স্বাভাবিক কার্যক্রম না চলায় নির্ধারিত ধার্য দিনে সাক্ষ্য গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। এ মামলায় ৮৩ জন চার্জসীট ভুক্ত সাক্ষী রয়েছে। আদালতে স্বাভাবিক কার্যক্রম চললে মামলাটির সাক্ষ্য গ্রহণ সহ অন্যান্য আইনী কার্যক্রমও স্বাভাবিক নিয়মে চলবে। বিচারকাজ শুরুর অন্যান্য কাজ এগিয়ে রয়েছে। আদালত খুললে এই মামলার কাজও শুরু হবে।
ভয়েস/আআ