শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ১২:০৮ অপরাহ্ন
বাঁকখালী নদীতে বাঁধের একটি দৃশ্য এম এ সাত্তার:
কক্সবাজার তো বটেই, জেলার অসংখ্য নদী, নদীর পাড় দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করছে নানা পক্ষ। দখলদারদের তালিকায় প্রায় সব রাজনৈতিক দলেরই প্রভাবশালী নেতারা আছেন। এদের মদতে শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, জনপ্রতিনিধিদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতারাও সমানতালে দখল করছেন নদী।একইভাবে বালু ফেলে বাঁকখালী নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে জেগে ওঠা চরের পরিসর বাড়ানো হচ্ছে। প্রশাসন কঠোর না হওয়ায় নদীর তীর দখল করে নির্মিত হচ্ছে স্পারসহ পাকা স্থাপনা।
দেশের আইন-কানুনের প্রতি কোন তোয়াক্কা না করে বাঁকখালী নদীর অবৈধ দখলদাররা দেখা দেখিতে প্রতিযোগিতা মূলকভাবে স্পার ও বাঁধ নির্মাণ করে যাচ্ছেই। নদীতে অবৈধ স্পার নির্মাণ অব্যাহত থাকায় চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি এলাকা। ক্ষমতার প্রভাব কাটিয়ে নদীর উপর নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে ঝিলংজা চাঁদের পাড়ার রাবার ড্রাম হইতে সেন্ট্রাল ফিশারি ঘাট পর্যন্ত শতাধিক স্পার ও বাঁধের কারণে ভেঙ্গে পড়ছে বিভিন্ন স্থাপনাসহ নদীর একুল ওকুল ।
সূত্রে জানা গেছে, ঠিকাদার সিআইপি আতিকুল ইসলাম, জাহাঙ্গীর কাশেম, তার ভাই তানভীর কাশেম, আওয়ামীলীগ নেতা আতিকুল ইসলাম, এজিএম ফেরদৌস, শাহাবুদ্দিনসহ অন্যান্য ব্যক্তিরা বাঁকখালী নদীর কয়েক হাজার একর জমি অবৈধ দখল করে ভোগদখল করছে যুগযুগ ধরে। দেশের আইন-কানুনকে তোয়াক্কা না করে উল্লেখ্য ব্যক্তিদের অবৈধভাবে গড়ে তোলা মৎস্য ঘের ও অন্য স্থাপনা সেফটির জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। তাই একে অপরের সাথে পাল্লা দিয়ে নদীর বুকে তাদের সুবিধামত কৃত্রিম বাঁধ/ স্পার (প্রায় ২০ বাই ১০০ ফুটের কংক্রিটের বস্তার বাঁধ)দিয়ে নদীর গতিপথে বাধা সৃষ্টি করছে। যার প্রভাবে নদীর পানি চলাচলের স্বাধীনতা হারিয়ে চোরাবালি গর্তের সৃষ্টি , নদীর একপাশে গভীরতা, অন্যপাশে চর সৃষ্টি হয়ে ভাঙছে নদীর দু’কুল।
প্রশাসনের অনুমতি পায়নি তারপরও নুনিয়াছড়া ফিশারি ঘাট থেকে চান্দেরপাড়া রাবার ড্যাম পর্যন্ত বাঁকখালী নদীতে অসংখ্য বাঁধ দেয়া হয়েছে। চলিত বছরে ১০ টির অধিক স্পার নির্মিত হয় আরো হচ্ছে একাধিক। দীর্ঘদিন ধরে নদীতে কংক্রিটের বস্তার সাহায্যে স্পার নির্মাণ অব্যাহত থাকার কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে যায়।নদীর যে পাশে কৃত্রিম বাঁধ দেওয়া হয়েছে তার বিপরীতে নদীরকূল কিনারা প্রবল ভাঙ্গন সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে নদীর জোয়ার ভাটার পানির স্রোতের প্রবল বাঁধা সৃষ্টি হয়ে একদিকে গভীরতা অন্যদিকে চর সৃষ্টির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে স্থানীয় সচেতন মহল।
নদীর মাঝখানে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বাঁধ দেয়ার কারণে বড়ুয়াপাড়া, রুমালিয়ারছড়, ছনখোলা, এসএমপাড়া ও চৌধুরীপাড়া, খুরুশকুল এলাকা ব্যাপক ভাঙনের কবলে পড়েছে। উক্ত এলাকাসমূহের মসজিদ, কবরস্থান সহ বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়াও ভেঙে গেছে ঘরবাড়ি। বাঁধ দিয়ে নদীর গতিপথ পরিবর্তন করায় হুমকির মূখে পড়ে উক্ত এলাকাবাসীরা। এছাড়া বাঁকখালী নদীর তীরের কোটি কোটি টাকা মূল্যের জমিও হাতিয়ে নেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছেন তারা।
সোহেল উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি জানান, নদীতে স্পার ও বাঁধ নির্মাণ অব্যাহত থাকায় বর্ষা মওসুম ছাড়াও প্রতিদিন জোয়ারের তোড়ে বিলীন হচ্ছে অনেক মুল্যমান জমি ও মানুষের গায়ের ঘামবিক্রির টাকায় তিল তিল করে গড়ে তোলা স্থাপনা ও মুল্যবান জমি। নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে রাস্তা ঘাট। নদীতে নির্মিত এসব অবৈধ স্পার ও বাঁধ তুলে না দিলে জোয়ার ভাটা, বিশেষ করে বর্ষা মওসুমে বাঁকখালী নদীতে স্থাপনা, রাস্তা ঘাট বিলীন হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। ছনখোলা খেয়াঘাট এলাকার পশ্চিমের রাস্তা ও জেটি ভেঙে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এমনকি হাজার একর চাষযোগ্য জমি লবণাক্ত পানিতে ডুবে থাকার কারণে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে।
গোদারপাড়া এলাকার বাসিন্দা আজিজুল ইসলাম জানান, বাঁকখালী নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়ে কয়েক বছরের ব্যবধানে কয়েক হাজার পরিবার অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন। এখানে ছিল স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ, মক্তব ও কবরস্থান। বর্তমানে ১৫-২০টি বাড়ী টিকে আছে পাড়াটিতে। যাদের অন্যত্তে ঘরবাড়ি করার সামর্থ্য নেই, তারা কোন রকম কোণঠাসা হয়ে ওই এলাকাতে বসবাস করছেন। নদীর বুকে স্পার ও বাঁধ দেওয়া বন্ধ করে দিলে এবং অবৈধ ভাবে নির্মিত বাঁধ গুলো সরিয়ে নিলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ফিরে আসবে। এবং ওই এলাকার সহস্রাধিক মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ফিরে পাবে। নদী দখলকারিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে মাননীয় জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ।
সম্প্রতি সময়ে বাঁকখালী নদীতে বাঁধ ও স্পার নির্মাণ হচ্ছে স্থানীয়দের এমন অভিযোগ পেয়ে সরেজমিনে গিয়ে সত্যতা পাওয়া গেছে। জাহাঙ্গীর কাশেমের মৎস্য প্রজেক্টের দক্ষিণে বাঁকখালী নদীতে বাঁধ তৈরিতে শ্রমিকদের কাজ করতে দেখা যায়। পুরাতন স্পারগুলোর দীর্ঘ বাড়াচ্ছে। ২টি নতুন বাঁধের কাজ সম্পন্ন করতে দেখা গেছে। জাহাঙ্গীর কাশেমের মৎস্য প্রজেক্ট পুর্বে ভিপি/খস খতিনভূক্ত প্রায় ৭/৮ একরের অধিক সরকারি জমি জবর দখল করে মৎস্য প্রজেক্ট করতেও দেখতে পাওয়া যায়। এর বিপরীতে বাঁকখালী নদীর দক্ষিণে ৩ একরের সামান্য বেশী রেজিস্ট্রি জমির মালিকানা হওয়ার সুবাদে গোদারপাড়া হইতে এসএম পাড়ার শেষ সীমানা পর্যন্ত বাঁকখালী নদীর শত একর জমি ভোগ দখলে আছেন মৃত মুসলিম উদ্দিন চৌধুরীর ছেলে আওয়ামীলীগ নেতা আতিক চৌধুরী। তার জোত দখল ও জোর দখলীয় সীমানাতে নদীর বুকে ৮ টি বাঁধ দিয়ে বিপরীত দিকে ভাঙ্গন সৃষ্টি ও তার দিকে চর তুলে পরিধি বাড়াতে আছে যুগধরে।
আতিক চৌধুরী বাঁকখালী নদীর দুই তৃতীয়াংশ দখল করে ইতিমধ্যে নতুন করে সীমানা প্রাচীর ও পুরাতন বাঁধের দীর্ঘ বৃদ্ধি, নতুন স্পার নির্মাণ দেয়া শুরু করেছেন। ছনখোলা খেয়াঘাটের আন্দরে ২/১ মাসের ভিতর তিনটি নতুন বাধ(স্পার) দিয়েছেন। প্রতিদিন শ্রমিকেরা নদীর চর থেকে মাটি বালি বস্তা নিয়ে বাঁধ নির্মাণের কাজ করতে দেখা গেছে যায়।অন্য দিকে ছনখোলা এলাকার দক্ষিণে বসুন্ধরা এ্যকোয়া নামের মৎস্য হ্যাচারীর দক্ষিণে বাঁকখালী নদীতে একাধিক স্পার দিয়ে রেখেছেন এজিএম ফেরদৌস সাহেব। গত ১৫/২০ দিনের ব্যবধানে নদী থেকে শক্তিশালী ড্রেজার মেশিনের সাহায্যে বালু উত্তোলন পূর্বক কয়েক হাজার বস্তা ভর্তি করে নদীতে ৪টি কৃত্রিম বাঁধ দিয়েছে সে। কিছু দিন আগে তার হ্যাচারীতে প্রতিদিন শত শত শ্রমিক মাসলাগাত কাজ করতে দেখা যায়।
এব্যাপারে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছনখোলা ঘাটের এক মাঝি জানান, ঘাটের আশেপাশেই বাঁধ দেওয়ার কারনে মানুষ নিয়ে নৌকা পারাপারের কষ্টের সীমা নেই। স্পারের গায়ে পানির ধাক্কা লেগে সবসময় এই স্থানে স্রোতের টান লেগে থাকে।আর বৃদ্ধি পেয়েছে নদীর গভীরতা। ২/১ বছর আগে নির্মিত যাত্রী পারাপার জেটি ভেঙ্গে যায়। ঘাট পারাপার এর আওতাভুক্ত স্থানে অটো চোরাবালি সৃষ্টি হয়েছে। দুর্ঘটনাক্রমে কোন সময় ঘাটের নৌকা ডুবে গেলে সাঁতার কাটতে জানা মানুষও নদী থেকে উঠতে না পেরে মারা যায়।এখন আরো সন্নিকটে নতুন করে ২টি বাঁধের কাজ শুরু করেন তারা। আল্লাহ জানেন সামনে বর্ষা মৌসুমে থেকে কিভাবে ঘাটে নৌকা পারাপার করতে হয়।
এবিষয়ে অভিযুক্তদের এবং কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার জানান, বাঁকখালী নদীর উপরে বাঁধ সর্ম্পূন্ন অবৈধ। এতে কাউকে অনুমতি দেয়া হয়নি। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে শীঘ্রই ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ভয়েস/জেইউ।