বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:১৮ অপরাহ্ন

দৃষ্টি দিন:
সম্মানিত পাঠক, আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। প্রতিমুহূর্তের সংবাদ জানতে ভিজিট করুন -www.coxsbazarvoice.com, আর নতুন নতুন ভিডিও পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল Cox's Bazar Voice. ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন এবং কমেন্ট করুন। ধন্যবাদ।

গুনাহকে তুচ্ছজ্ঞান করার ভয়াবহতা

মুফতি উবায়দুল হক খান:
মানুষ স্বভাবতই ভুল করে, পাপ করে। মহান আল্লাহ মানুষকে নিষ্পাপ ফেরেশতা হিসেবে সৃষ্টি করেননি, বরং তাকে এমন একটি সত্তা বানিয়েছেন, যে ভুল করবে, আবার তওবা করে ফিরে আসবে। কিন্তু সব ভুল বা গুনাহ সমান নয়। অনেক সময় বড় গুনাহের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে দাঁড়ায় ছোট গুনাহকে তুচ্ছজ্ঞান করা। কারণ গুনাহের আকার ছোট হলেও যদি অন্তরে হালকা মনে হয়, তবে তা ধীরে ধীরে মানুষের ইমানকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।

গুনাহকে তুচ্ছজ্ঞান করার অর্থ : গুনাহকে তুচ্ছজ্ঞান করা বলতে বোঝায়, পাপ কাজকে গুরুত্বহীন মনে করা, এটাকে বড় কোনো অপরাধ মনে না করা, কিংবা ভাবা ‘এতে কিছু হবে না’, ‘এটা তো ছোটখাটো ব্যাপার’। এই মানসিকতাই সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ এতে মানুষের অন্তর থেকে আল্লাহভীতি চলে যায়।

কোরআনের আলোকে তুচ্ছজ্ঞান ভয়াবহতা : মহান আল্লাহ কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘তোমরা এটাকে (গুনাহকে) তুচ্ছ মনে করো, অথচ আল্লাহর নিকট তা খুবই গুরুতর।’ (সুরা নুর ১৫) এই আয়াত আমাদের স্পষ্ট করে দেয়, মানুষের চোখে ছোট মনে হওয়া কোনো কাজ আল্লাহর কাছে অত্যন্ত বড় অপরাধ হতে পারে। তাই কোনো গুনাহকেই হালকা মনে করা উচিত নয়।

অপর জায়গায় মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ ভালো কাজ করবে, সে তা দেখতে পাবে এবং যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করবে, সে তাও দেখতে পাবে।’ (সুরা যিলযাল ৭-৮) এই আয়াত আমাদের শেখায়, গুনাহ যত ছোটই হোক, সেটার হিসাব একদিন দিতে হবেই।

হাদিসের আলোকে তুচ্ছজ্ঞান করার পরিণতি : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা ছোট গুনাহ থেকে সাবধান থাক, কারণ এগুলো একত্রিত হয়ে মানুষকে ধ্বংস করে দেয়।’ (মুসনাদ আহমদ) এই হাদিসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ছোট গুনাহগুলোকে অবহেলা করলে তা জমতে জমতে এক সময় বড় ধ্বংস ডেকে আনে। অপর হাদিসে রাসুল (সা.) উদাহরণ দিয়ে বলেন, ছোট ছোট কাঠি একত্রিত হয়ে যেমন বড় আগুন জ্বালাতে পারে, তেমনি ছোট ছোট গুনাহ একত্রিত হয়ে মানুষের জীবনকে জ্বালিয়ে দেয়।

সাহাবায়ে কেরামের দৃষ্টিভঙ্গি : সাহাবায়ে কেরাম গুনাহকে কখনো ছোট করে দেখতেন না। তারা সামান্য ভুলকেও বড় ভয়াবহ মনে করতেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘মুমিন ব্যক্তি তার গুনাহকে এমন মনে করে, যেন সে একটি পাহাড়ের নিচে বসে আছে, তা যেকোনো সময় তার ওপর ভেঙে পড়তে পারে। আর পাপী ব্যক্তি তার গুনাহকে এমন মনে করে, যেন একটি মাছি তার নাকের ওপর বসেছে, আর সে এটাকে তাড়িয়ে দিয়েছে।’ (সহিহ বুখারি) এই বর্ণনা আমাদের বুঝিয়ে দেয়, একজন সত্যিকারের মুমিন কখনো গুনাহকে হালকা মনে করে না।

গুনাহকে তুচ্ছজ্ঞান করার ভয়াবহতা : এক. ইমান দুর্বল হয়ে যায়। যখন মানুষ গুনাহকে ছোট মনে করে, তখন তার অন্তর থেকে আল্লাহভীতি চলে যায়। ফলে ইমান দুর্বল হতে থাকে। দুই. গুনাহের প্রতি আসক্তি তৈরি হয়। প্রথমে ছোট মনে করে যে গুনাহ করা হয়, তা ধীরে ধীরে অভ্যাসে পরিণত হয়। এরপর মানুষ বড় গুনাহেও লিপ্ত হয়ে যায়। তিন. তওবার গুরুত্ব কমে যায়। যে ব্যক্তি গুনাহকে তুচ্ছ মনে করে, সে তওবা করার প্রয়োজনও অনুভব করে না। ফলে সে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরে যায়। চার. আল্লাহর শাস্তির ঝুঁকি বাড়ে। গুনাহ যতই ছোট হোক, তা যদি অবহেলা করা হয়, তাহলে তা আল্লাহর গজব ডেকে আনতে পারে। পাঁচ. অন্তর কালো হয়ে যায়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যখন বান্দা একটি গুনাহ করে, তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে।’ (তিরমিজি) যদি সে তওবা না করে, বরং গুনাহ চালিয়ে যায়, তাহলে পুরো অন্তর কালো হয়ে যায়।

যেসব কারণে মানুষ গুনাহকে তুচ্ছজ্ঞান করে : এক. অজ্ঞতা এবং গুনাহের পরিণতি সম্পর্কে না জানা। দুই. খারাপ পরিবেশ। যেখানে পাপকে স্বাভাবিক মনে করা হয়। তিন. শয়তানের প্ররোচনা। শয়তান ছোট গুনাহকে ছোট করে দেখায়। চার. অহংকার। নিজের ভুলকে গুরুত্ব না দেওয়া। পাঁচ. বারবার গুনাহ করা। অভ্যাস হয়ে গেলে তা আর খারাপ মনে হয় না।

গুনাহ থেকে বাঁচার উপায় : এক. তাকওয়া অর্জন করা। সবসময় মনে রাখা, মহান আল্লাহ আমাদের দেখছেন। দুই. ছোট গুনাহকেও বড় মনে করা। গুনাহের আকার নয়; বরং যার বিরুদ্ধে গুনাহ করা হচ্ছে, তিনি মহান আল্লাহ। তিন. দ্রুত তওবা করা। যেকোনো ভুল হলে সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া। চার. নেক আমলের অভ্যাস করা। নেক কাজ গুনাহকে মুছে দেয়। পাঁচ. ভালো পরিবেশে থাকা। ভালো মানুষের সঙ্গে থাকলে গুনাহ থেকে দূরে থাকা সহজ হয়।

গুনাহ সংগঠিত হলে করণীয় : গুনাহ করা মানুষের স্বভাবগত দুর্বলতা, কিন্তু গুনাহকে তুচ্ছজ্ঞান করা একটি মারাত্মক আত্মিক রোগ। এটি ধীরে ধীরে মানুষের অন্তরকে ধ্বংস করে দেয় এবং তাকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। তাই একজন মুমিনের উচিত, ছোট হোক বা বড়, প্রতিটি গুনাহকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা, অনুতপ্ত হওয়া এবং দ্রুত তওবা করা। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে গুনাহ থেকে হেফাজত করুন, গুনাহকে তুচ্ছজ্ঞান করা থেকে বাঁচার তৌফিক দান করুন এবং আমাদের অন্তরকে পবিত্র রাখুন। আমিন।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিআতুস সুফফাহ আল ইসলামিয়া, গাজীপুর

ভয়েস/আআ

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023
Developed by : JM IT SOLUTION