শুক্রবার, ০৭ অগাস্ট ২০২৬, ০২:৩৯ অপরাহ্ন
মুফতি ওমর বিন নাছির
মানুষের শরীরের ছোট্ট একটি অঙ্গ জিহ্বা। কিন্তু এই ছোট্ট অঙ্গটিই মানুষের সম্মান ও মর্যাদা যেমন বাড়াতে পারে, তেমনি ডেকে আনতে পারে অপমান, বিপদ ও ধ্বংস।
একটি সুন্দর কথা মানুষের হৃদয় জয় করে নেয়, আবার একটি কটুবাক্য বহু বছরের সম্পর্কও মুহূর্তে নষ্ট করে দিতে পারে। একটি সত্য কথা মানুষকে আল্লাহর নৈকট্য এনে দিতে পারে, আবার অসতর্ক উচ্চারিত একটি বাক্য মানুষকে গুনাহের অতলগহ্বরে নিক্ষেপ করতে পারে। তাই ইসলামে জিহ্বার হেফাজতকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কথা বলা মানুষের স্বাভাবিক প্রয়োজন
প্রয়োজনীয় ও কল্যাণকর কথা বলা যেমন প্রশংসনীয়, তেমনি অপ্রয়োজনীয়, অনর্থক ও ক্ষতিকর কথাবার্তা থেকে বিরত থাকাও একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ গুণ। ইসলাম মানুষকে সব সময় চুপ থাকতে বলেনি; বরং কখন কথা বলতে হবে এবং কখন নীরব থাকতে হবে—সে বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে। যে কথায় কল্যাণ আছে, তা বলতে হবে; আর যে কথায় অকল্যাণ, গুনাহ, বিবাদ বা মানুষের কষ্টের আশঙ্কা রয়েছে, সেখানে নীরবতাই উত্তম। আল্লাহ তাআলা রহমানের বান্দাদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘রহমানের বান্দা তারা, যারা জমিনে নম্রভাবে বিচরণ করে এবং অজ্ঞ লোকেরা যখন তাদের সঙ্গে কথা বলে, তখন তারা শান্তিপূর্ণ কথা বলে।
’ (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ৬৩)
নীরব থাকার কথা বলেছেন মহানবী (সা.)
মহানবী (সা.) মুমিনের ঈমানের সঙ্গে জিহ্বা সংযমের গভীর সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের ওপর ঈমান রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের ওপর ঈমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের ওপর ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬১২০)
এই হাদিসটি মুমিনের বাকশক্তি ব্যবহারের একটি চমৎকার নীতি শিক্ষা দেয়—কথা বলার আগে ভাবতে হবে, কথাটি কি সত্য? প্রয়োজনীয়? উপকারী? যদি হয়, তাহলে বলা উচিত।
আর যদি তা না হয়, তাহলে নীরব থাকাই নিরাপদ।
নীরবতা মুমিনের অন্যতম অবলম্বন
মানুষের অনেক বিপদের সূচনা হয় অসতর্ক কথাবার্তা থেকে। রাগের সময় বলা একটি কথা সম্পর্ক নষ্ট করতে পারে, মিথ্যা একটি কথা মানুষের অধিকার নষ্ট করতে পারে, গিবত একটি সম্পর্কের মধ্যে বিষ ঢেলে দিতে পারে, আর অপবাদ একটি নিরপরাধ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলতে পারে। এ জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে নীরবতা অবলম্বন করে, সে মুক্তি পায়।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪৮৫)
অবশ্য এখানে নীরবতা বলতে সর্বাবস্থায় চুপ থাকা বোঝানো হয়নি। অন্যায় দেখেও চুপ থাকা, সত্য প্রকাশের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও নীরব থাকা কিংবা মানুষের অধিকার রক্ষার সময় কথা না বলা ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং যে কথার প্রয়োজন নেই, যে কথা গুনাহের কারণ হতে পারে এবং যে কথা মানুষের ক্ষতি করতে পারে—সেসব থেকে নিজেকে বিরত রাখাই প্রশংসনীয় নীরবতা।
একটি কথাই বদলে দিতে পারে মানুষের পরিণতি
জিহ্বার ব্যাপারে ইসলামের সতর্কতা কত গভীর, তা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয় বান্দা কখনো আল্লাহর সন্তুষ্টির এমন একটি কথা বলে, যার মাধ্যমে আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। আবার কখনো বান্দা আল্লাহর অসন্তুষ্টির এমন কথা বলে, যার পরিণতি সম্পর্কে সে চিন্তাও করে না; অথচ সে কথার কারণে সে জাহান্নামে পতিত হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪৭৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সংযতভাষী
মহানবী (সা.)-এর জীবনেও আমরা কথাবার্তায় সংযমের অসাধারণ দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। জাবির ইবনু সামুরা (রা.)-এর বর্ণনায় জানা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) অধিকাংশ সময় নীরব থাকতেন এবং খুব কম হাসতেন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৬৩০৮)
এর অর্থ এই নয় যে তিনি মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন না। বরং তিনি প্রয়োজনীয়, সত্য, সুন্দর ও কল্যাণকর কথা বলতেন। তাঁর প্রতিটি কথা ছিল অর্থবহ, প্রজ্ঞাপূর্ণ ও মানুষের কল্যাণমুখী। তাই একজন মুসলিমের জন্য তাঁর জীবনই সর্বোত্তম আদর্শ—বেশি কথা নয়, বরং ভালো কথা।
জিহ্বার অপব্যবহার জাহান্নামের কারণ হতে পারে
গিবত, অপবাদ, মিথ্যা, গালমন্দ, কটূক্তি, অশ্লীলতা, পরনিন্দা ও মানুষের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি—এসব গুনাহের বড় একটি অংশ জিহ্বার মাধ্যমে সংঘটিত হয়। এ জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষকে সতর্ক করেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, কোন কাজ মানুষকে সবচেয়ে বেশি জান্নাতে প্রবেশ করাবে? তিনি বলেন, ‘আল্লাহভীতি, উত্তম চরিত্র ও ভালো আচরণ।’ আবার জিজ্ঞেস করা হলো, কোন কাজ মানুষকে সবচেয়ে বেশি জাহান্নামে প্রবেশ করাবে? তিনি বলেন, ‘মুখ ও লজ্জাস্থান।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২০০৪)
নীরবতা— আত্মশুদ্ধির মাধ্যম
মানুষকে অনেক ইবাদত করতে শারীরিক পরিশ্রম করতে হয়, কখনো অর্থ ব্যয় করতে হয়, কখনো সময় দিতে হয়। কিন্তু অনর্থক কথা থেকে নিজেকে বিরত রাখার জন্য কোনো অর্থের প্রয়োজন নেই, বিশেষ কোনো আয়োজনও প্রয়োজন নেই। শুধু নিজের জিহ্বার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হয়। সালাফে সালেহিন জিহ্বার সংযমকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। ওমর (রা.)-এর একটি প্রসিদ্ধ বাণী হলো, ‘চুপ থাকার কারণে আমি কখনো লজ্জিত হইনি; কিন্তু কথা বলার কারণে আমি বহুবার লজ্জিত হয়েছি।’ কথাটি মানুষের জন্য গভীর শিক্ষা বহন করে। কারণ বলা কথা ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। মুখ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর একটি শব্দও আর নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না।
ইসলামে নীরবতা মানে মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা নয়; বরং নিজের জিহ্বাকে আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিরাপদ রাখা। তাই নীরবতা তখনই ইবাদত হয়ে ওঠে, যখন তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অনর্থক ও গুনাহের কথা থেকে নিজেকে বিরত রাখার মাধ্যম হয়। আমাদের জিহ্বা যেন মিথ্যা, গিবত, অপবাদ, অশ্লীলতা ও কটু কথার পরিবর্তে কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া, সত্য ও কল্যাণের কথায় ব্যস্ত থাকে। আর যখন বলার মতো ভালো কিছু নেই, তখন নীরব থাকাই হোক আমাদের নিরাপদ আশ্রয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের জিহ্বাকে সংযত রাখার, সত্য ও সুন্দর কথা বলার এবং অনর্থক কথাবার্তা থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
ভয়েস/জেইউ।