সোমবার, ০৮ Jun ২০২৬, ০১:৫২ অপরাহ্ন
মুফতি মাহবুব হাসান:
পৃথিবীর বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে রয়েছে সমুদ্র। এর গভীরতা, বিশালতা, গর্জন, সৌন্দর্য ও রহস্য যুগে যুগে মানুষকে বিস্মিত করেছে। সভ্যতার বিকাশ, বাণিজ্যের সম্প্রসারণ, জীবিকার সংস্থান এবং প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় সমুদ্রের অবদান অপরিসীম। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে সমুদ্র শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ বা জলরাশির আধার নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর অসীম ক্ষমতা, প্রজ্ঞা ও সৃষ্টিশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে সমুদ্রকে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে উল্লেখ করা হয়েছে।
কোথাও এটিকে মানুষের জন্য আল্লাহর নেয়ামত, কোথাও তার কুদরতের প্রমাণ, আবার কোথাও শিক্ষা ও উপদেশের উৎস বলা হয়েছে।
পবিত্র কোরআনের বহু আয়াতে সমুদ্রের কথা এসেছে। সমুদ্রের বিশালতা মানুষকে তার সীমাবদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মানুষ যতই শক্তিশালী হোক, সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের সামনে সে কতটা অসহায়, তা মুহূর্তেই উপলব্ধি করতে পারে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, রাত ও দিনের পরিবর্তনে, সমুদ্রে চলমান জাহাজে, যা মানুষের উপকারে আসে…।’ (সুরা বাকারা ১৬৪)
এই আয়াতে সমুদ্রকে আল্লাহর সৃষ্টির এক বিস্ময়কর নিদর্শন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। মানুষের জন্য উপকারী জাহাজ সমুদ্রপথে চলাচল করে, দেশ থেকে দেশে পণ্য পরিবহন করে এবং সভ্যতার অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নেয়। মানুষ হয়তো জাহাজ নির্মাণ করে, কিন্তু সমুদ্রকে চলাচলের উপযোগী করে সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ।
সমুদ্র মানুষের জন্য বিশাল নেয়ামত। খাদ্যের অন্যতম উৎসও এটি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই সে সত্তা, যিনি সমুদ্রকে নিয়োজিত করেছেন, যাতে তোমরা তা থেকে তাজা (মাছের) গোশত খেতে পারো এবং তা থেকে বের করতে পারো অলংকারগুলো, যা তোমরা পরিধান করো। আর তুমি তাতে নৌযান দেখবে তা পানি চিরে চলছে, যাতে তোমরা তার অনুগ্রহ অন্বেষণ করতে পারো এবং যাতে তোমরা শুকরিয়া আদায় করো। (সুরা নাহল ১৪)
এ আয়াতে সমুদ্রের দুটি বড় নিয়ামতের কথা বলা হয়েছে। প্রথমত, মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী মানুষের খাদ্যের জোগান দেয়। দ্বিতীয়ত, মুক্তা ও প্রবালের মতো মূল্যবান সামগ্রী সমুদ্র থেকে আহরণ করা হয়, যা মানুষের অলংকার ও অর্থনৈতিক সম্পদের উৎস।
কোরআনে সমুদ্রের গভীর রহস্যের প্রতিও ইঙ্গিত করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘অথবা (তাদের অবস্থা) বিশাল সমুদ্রে গভীর অন্ধকারের মতো, যাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে ঢেউয়ের ওপরে ঢেউ, তার ওপরে মেঘ, একের পর এক অন্ধকারের স্তর।’ (সুরা নুর ৪০)
সমুদ্রের গভীরে সূর্যের আলো প্রবেশ করে না। সেখানে বিরাজ করে ঘন অন্ধকার। আধুনিক বিজ্ঞান বহু শতাব্দী পরে সমুদ্রের গভীর স্তরের এই বাস্তবতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে সক্ষম হয়েছে। অথচ কোরআন প্রায় চৌদ্দশ বছর আগে সেই বাস্তবতার প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
সমুদ্র মানুষের ইমান ও তাওয়াক্কুলেরও শিক্ষা দেয়। যখন মানুষ স্থলে থাকে, তখন অনেক সময় নিজের শক্তি ও সামর্থ্যরে ওপর নির্ভর করে। কিন্তু উত্তাল সমুদ্রে যখন জাহাজ দুলতে থাকে এবং চারদিকে মৃত্যুভয় ঘিরে ধরে, তখন সে একমাত্র আল্লাহকেই স্মরণ করে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যখন ঢেউ তাদের ছায়ার মতো আচ্ছন্ন করে নেয়, তখন তারা একনিষ্ঠ অবস্থায় আনুগত্যভরে আল্লাহকে ডাকে। অতঃপর যখন তিনি তাদের উদ্ধার করে স্থলে পৌঁছে দেন, তখন তাদের কেউ কেউ মধ্যপথে থাকে। আর বিশ্বাসঘাতক ও কাফের ছাড়া কেউ আমার নিদর্শনাবলি অস্বীকার করে না।’ (সুরা লুকমান ৩২)
এই আয়াত মানুষের স্বভাবকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। বিপদে মানুষ স্রষ্টার দিকে ফিরে আসে, কিন্তু নিরাপত্তা লাভের পর অনেকেই তাকে ভুলে যায়। সমুদ্র তাই মানুষকে আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা ও কৃতজ্ঞতার শিক্ষা দেয়।
লেখক : ইসলামি গবেষক
ভয়েস/আআ