বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:১৮ অপরাহ্ন
১৬ অক্টোবর বিকালে মহেশখালী উপজেলার ছোটমহেশখালী মুদির ছড়া খালে জীবিকার সন্ধানে কর্মহীনএক জেলে। ছবি মহেশখালী প্রতিবেদক, এস.এম রুবেল জিকির উল্লাহ জিকু:
বুধবার (১৪ অক্টোবর) থেকে টানা ২২ দিন সাগরে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সরকার।দেশে ইলিশ সম্পদ বৃদ্ধি করতে এই নিষেধাজ্ঞা।
এই বন্ধ সময়ে সরকার সহায়তা প্রদান করে। জেলেদের আভিযোগ সময়মতো সরকারের দেয়া সহায়তা পাননা তারা। অবরোধ শেষ হওয়ার আগে-পরে জেলেদের সহায়তা দেয়া হয়। কিছু জেলে ভরণপোষণ কষ্ট করে চালাতে পারলেও আবরোধ চলাকালীন অবসর সময়ে বেশির ভাগ জেলের পরিবার নিয়ে অর্ধাহার-অনাহারে থাকতে হয় এমন তথ্য জানালেন কক্সবাজার নুনিয়াছড়ার ফিশিং বোটের এক মাঝি।
কথা হয় জেলে মহেশখালী উপজেলার পৌরসভা বাসিন্দা মাঝি আবুল কালামের সাথে তিনি বলেন, ‘তাঁর দুই স্ত্রী সন্তান ৬জন সহ মোট ৯জন সদস্য। এবছরের শুরুতে ভালো মাছে আহরণ হলেও বন্ধের শেষের দিকে তেমন বোটে মাছ পাইনি। এদিকে টানা ২২ দিন বন্ধ তাই পরিবারের ভরণপোষণ নিয়ে কষ্টে আছি। তারপরও সরকারের সহয়তা যদি বন্ধের প্রথম সময়ে দিত উপকারে আসত।’
বদরখালীতে থাকেন জেলে মো. করিম ফিশিং করেন (ভাসা জাল বোটে) তিনিও প্রায় একই সুরে বলেন, ৫ জনের পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি। চালের সহায়তাটা বন্ধের সময়ে শুরুর দিকে দিলে অন্তত কিছুটা কাজে আসে।
মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নের তাজিয়া কাটার জেলে মো. শাহ আলম বলেন, অবরোধের সময় আমরা বেকার থাকি। অবরোধের কর্মহীন সময় সরকারি প্রণোদনা পেলে আমার পরিবার পরিজন নিয়ে খেয়ে থাকতে পারি। কিন্তু প্রনোদোনার চাল পেতে অবরোধ শেষ হয়ে যায়। তখন আর এই সহায়তা কাজে আসেনা। তাই সহায়তার চাল অবরোধের শুরুতে দিলে আমাদের জন্য অনেক ভালো হয়।
কক্সবাজার সদর, উখিয়া, মহেশখালী, পেকুয়া ও চকিরয়া উপজেলা জেলে সম্প্রদায়ের সাথে কথা হলে জানান, বিগত সময়ে জেলেদের জন্য দেয়া বরাদ্দের চাল পেয়েছে অন্য শ্রেণি পেশার মানুষ। মূল অনেক জেলে বাদ পড়ে যায়। আবার অনেকে নতুন জেলে তালিকায় নাম না থাকায় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। চাল সহায়তা দিতে গড়িমসি করা হয়।সঠিকমতো সময়ে চাল পান না।
কক্সবাজার জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এস.এম খালেকুজ্জামান (১৫ অক্টোবর) বলেন, নিষেধাজ্ঞার শুরুতেই প্রকৃত জেলেদের সহায়তা নিশ্চিত করতে মৎস অধিদপ্তর কাজ করছে। ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে ১৪ অক্টোবর থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত মোট ২২ দিন ইলিশ প্রজনন ক্ষেত্রে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। এই সময় সারাদেশের ন্যায় কক্সবাজারে ইলিশ আহরণ, বিপণন, পরিবহন, ক্রয় বিক্রয়, বিনিময় এবং মজুদও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। বন্ধ সময়ে কর্মহীন হয়ে পড়ে ৮ উপজেলার নিবন্ধিত ৪৮ হাজার ৩শত ৯৩ জন জেলে ২০ কেজি করে সরকারি সহায়তা পাবে। তিনি আরো জানান, ইতিমধ্যে সব উপজেলায় বরাদ্ধ পাঠানো হয়েছে। দাপ্তরিক কাজ শেষে সংশ্লিষ্ট উপজেলার ইউএনও এবং স্থানীয় চেয়ারম্যানের মাধ্যমে বিতরণ করা হবে। পাশাপাশি নতুন জেলেদের নিবন্ধনের কাজও চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। শেষে সঠিক বন্টনে নজর রাখবেন জানান।
জেলা মৎস্য অফিসের প্রধান সহকারি বেলাল উদ্দিন জানান, ৮ উপজেলার মোট নিবন্ধিত জেলে কক্সবাজার সদর-৭১২০জন, পেকুয়া-৩৯৬৭জন, মহেশখালী- ১১,৪৪২ জন, কুতুবদিয়া ৮৪৫৯ জন, চকরিয়া ৩৮৫৭ জন, উখিয়া ৩৩৯২জন, টেকনাফ ৮৮৮৩ জন, রামু ২২৭৩জন। যারা প্রত্যেকে ২০ কেজি করে সহায়তা পাবেন।
এদিকে একাধিক জেলেরা অভিযোগ করেন- সরকারি বরাদ্দের চাল বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম করে জনপ্রতিনিধিরা। জেলেদের জন্য সরকারের দেয়া বরাদ্দের চাল পায় জনপ্রতিনিধিদের স্বজন, ব্যবসায়ী, গাড়িচালকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ। অথচ আমাদের জেলে পেশায় থাকা অনেক জেলেরা সরকারি এ সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। জেলে ছিলেন সাগরে মারা গেছেন ওই পরিবারও সহায়তা পান না। তাদের বিষয়েও খেয়াল রাখা দরকার মনে করেন জেলেরা।
সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার জেলার মৎস্যজীবি, মৎস্য ব্যবসায়ী, ট্রলার ও নৌকা মালিক, জেলে, আড়ৎদার এবং বরফকল মালিকদের নিয়ে ‘মা ইলিশের প্রজনন রক্ষায়’ মৎস্য বন্দর এবং সকল উপজেলার বিভিন্ন স্থানে জনসচেতনতামূলক সভা করেছে। সরকার ঘোষিত ২২ দিনের মা ইলিশ রক্ষার সরকারের অভিযান সফল করতে সভায় অংশগ্রণকারীরা মাছ আহরণ, বিপনন থেকে বিরত থাকতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছেন।
জানাযায়, প্রজনন মৌসুমে মোহনা অঞ্চলে ইলিশ বেশি ডিম ছাড়ে। এ জন্য নিষেধাজ্ঞা চলার সময় উপকূলে সরকার ঘোষিত ছয়টি ইলিশের অভয়াশ্রমে ব্যাপক নজরদারী করবে মৎস্য বিভাগ ও আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী।
‘আশ্বিনের বড় পূর্ণিমার আগের ৪ দিন, পূর্ণিমার দিন এবং পরের ১৭ দিনসহ ২২ দিন ইলিশ মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকবে। এ সময় ইলিশ মাছ সাগর থেকে এসে নদীর মোহনায় ডিম ছাড়ে। একটি বড় ইলিশ ২৩ লক্ষ পর্যন্ত ডিম ছাড়তে পারে। গবেষনালব্দ ফলাফলে এটাই প্রমানিত। তা-ই প্রতিবছর সরকার এ সময়টাতে ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দিয়ে থাকেন।
ইলিশের প্রজনন সময়ে সারা দেশে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাত করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ। এ সময় যদি কেউ আইন অমান্য করে তাঁকে এক বছর থেকে সর্বোচ্চ দুই বছরের সশ্রম কারাদন্ড অথবা ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত করা হবে।
ভয়েস/জেইউ।