বুধবার, ২৭ মে ২০২৬, ০২:৫৪ অপরাহ্ন

দৃষ্টি দিন:
সম্মানিত পাঠক, আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। প্রতিমুহূর্তের সংবাদ জানতে ভিজিট করুন -www.coxsbazarvoice.com, আর নতুন নতুন ভিডিও পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল Cox's Bazar Voice. ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন এবং কমেন্ট করুন। ধন্যবাদ।

কোরবানির তাৎপর্য ও সওয়াব

আইনাল হক:
আত্মত্যাগ, আনুগত্য ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মহান ইবাদত কোরবানি। এটি একজন মুমিন বান্দার ইমানের বহিঃপ্রকাশ এবং তার অভ্যন্তরীণ খোদাভীতি, আত্মনিবেদন ও ত্যাগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ। ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা, যেখানে মানুষের প্রতিটি ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। সেই উদ্দেশ্যকে হৃদয়ে ধারণ করেই কোরবানি পালিত হয় স্রষ্টার সন্তুষ্টির জন্য তারই দানকৃত প্রিয় বস্তু ত্যাগ করে নিজেকে সঁপে দেওয়ার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে।

ইসলামের আলোকে কোরবানি হলো নির্দিষ্ট সময় ও নির্ধারিত পন্থায় পশু জবাই করার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি ওয়াজিব ইবাদত। এই ইবাদতের সূচনা কোনো সাধারণ ঘটনা থেকে হয়নি। এটি শুরু হয়েছে আদি মানব হজরত আদম (আ.)-এর যুগে, তার পুত্রদের কোরবানির কাহিনি দিয়ে এবং পূর্ণতা পেয়েছে হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তার পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর আত্মোৎসর্গের ঘটনার মাধ্যমে। পিতা যখন প্রভুর আদেশে পুত্রকে কোরবানি করতে উদ্যত হন, তখনকার সেই একান্ত আনুগত্য ও নিষ্ঠা আজও প্রতিটি মুসলিম হৃদয়ে কাঁপন তুলে। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, তার আদেশ পালনে আপসহীনতা এবং ইমানের গভীরতা কোরবানির মাধ্যমে প্রকাশ পায়। মহান আল্লাহ সেই ত্যাগ ও আনুগত্যের প্রতিদানস্বরূপ কেয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য কোরবানিকে এক অনন্য ইবাদত হিসেবে বিধান করেছেন।

ঈদুল আজহা, যা কোরবানির ঈদ নামে পরিচিত, এটা মূলত সেই ঐতিহাসিক ত্যাগের এক স্মৃতিচারণ। এদিন মুসলিম উম্মাহ সর্বজনীনভাবে কোরবানি পালন করে থাকে। এটি শুধু নিছক পশু জবাই নয়, বরং অন্তরের অহংকার, গুনাহ এবং আত্মকেন্দ্রিকতার পশুত্বের জবাই করার শপথ।

বর্তমানে অনেকেই কোরবানিকে সামাজিক রীতিনীতির অংশ, আত্মপ্রদর্শনের উপলক্ষ বা পারিবারিক প্রথা হিসেবে দেখে থাকেন। অথচ এটি একটি শুদ্ধ নিয়ত, আত্মশুদ্ধি ও ত্যাগের নিগূঢ় আহ্বান। এই ইবাদতের মাধ্যমে একদিকে যেমন গরিব-দুঃখীদের মুখে হাসি ফোটে, তেমনি সমাজে সাম্য ও সহানুভূতির মূল্যবোধ বিস্তার লাভ করে। কোরবানি আমাদের শেখায়, আল্লাহর পথে কিছু ত্যাগ করলেই প্রকৃত অর্থে পাওয়া যায় তার অপার রহমত ও নৈকট্য।

পৃথিবীর শুরুর যুগ থেকেই কোরবানির বিধান ছিল। সুরা মায়েদায় আদম (আ.)-এর দুই সন্তানের ঝগড়া নিরসনের জন্য আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে নির্দেশিত কোরবানির বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। পরবর্তী সব নবীর শরিয়তেই কোরবানির বিধান ছিল। তবে প্রত্যেক নবীর সময়ে কোরবানির পন্থা ভিন্ন ছিল। সবশেষে কেয়ামত পর্যন্ত সব জাতি ও ভূখণ্ডের জন্য একই বিধান চলমান রয়েছে, যা বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে প্রাপ্ত শরিয়ত অর্থাৎ কোরআন-সুন্নাহর বিধান। আর এ সময়ে আমাদের ওপর যে কোরবানির পদ্ধতি চলমান তা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর শরিয়ত থেকে এসেছে। যেমনটি বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস থেকে জানতে পারি।

সাহাবিরা তাকে প্রশ্ন করেছিলেন কোরবানি কী? তখন আল্লাহর রাসুল (সা.) উত্তর দিলেন এটি তোমাদের পিতা ইবরাহিম (আ.)-এর সুন্নত। (ইবনে মাজাহ) আমরা যে কোরবানি করি তা মহান রব আমাদের দান করেছেন হজরত ইব্রাহিম (আ.) এবং তার পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর মধ্যে সংঘটিত কোরবানির পরীক্ষা থেকে, যা সুরা সফফাতে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে।

কোরবানির গুরুত্ব : কোরবানি হলো ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব আমল। কোরবানির দিনগুলোতে যে ব্যক্তির কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জাকাতের নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকবে তার জন্য একটি পশু কোরবানি করা ওয়াজিব। ওয়াজিব কোরবানি পরিত্যাগকারীর ওপর বিশ্বনবী (সা.) কঠিন সতর্কবার্তা পেশ করেছেন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশে নামাজ আদায় করো এবং পশু কোরবানি করো।’ (সুরা কাউসার আয়াত ২)

রাসুল (সা.) বলেছেন, হে লোক সকল! প্রত্যেক (সামর্থ্যবান) পরিবারের ওপর কোরবানি দেওয়া অপরিহার্য। (সুনান ইবনে মাজাহ) রাসুল আরও বলেন, যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করে না সে যেন আমাদের ইদগাহে না আসে। (মুসনাদে আহমাদ)

কোরবানির ফজিলত : কোরবানির ফজিলত সম্পর্কে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, আল্লাহতায়ালার কাছে কোরবানির দিন মানবজাতির কোরবানি অপেক্ষা অধিকতর পছন্দনীয় কোনো আমল নেই। বিচার দিনে কোরবানির পশুকে তার শিং, পশম ও খুরসহ উপস্থিত করা হবে। পশুর রক্ত জমিনে পড়ার আগেই আল্লাহতায়ালার কাছে তা বিশেষ মর্যাদায় পৌঁছে যায়। সুতরাং তোমরা আনন্দচিত্তে কোরবানি করো। (তিরমিজি)

যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) বর্ণনা করেন, কোরবানি সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরাম (রা.) রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেন, কোরবানি কী? রাসুল (সা.) উত্তরে বলেন, তোমাদের পিতা ইব্রাহিম (আ.)-এর সুন্নত। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) জিজ্ঞেস করেন, এতে আমাদের জন্য কী পুণ্য রয়েছে? রাসুল (সা.) বলেন, প্রতিটি পশমের পরিবর্তে একটি করে পুণ্য রয়েছে। আবার জিজ্ঞেস করেন, (অধিক) পশম বিশিষ্ট পশুর (ভেড়া) বেলায় কী হবে? রাসুল (সা.) বলেন, প্রতিটি পশমের পরিবর্তে একটি করে পুণ্য রয়েছে। (মিশকাত)

বলা বাহুল্য, কোরবানিসহ মুমিনের প্রতিটি ইবাদত ও পুণ্যকাজ শুধু আল্লাহতায়ালার হুকুম পালন এবং সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশে হতে হবে। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘বলো, নিশ্চয় আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।’ (সুরা আনআম ১৬২)

আল্লাহতায়ালা আরও ইরশাদ করেন, ‘কোরবানির জন্তুর গোশত, রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া (অন্তরের বিশ্বস্ততা)।’ (সুরা হজ ৩৭)

কোরবানিদাতার জন্য সর্বাগ্রে আবশ্যক হচ্ছে, নিয়ত পরিশুদ্ধ করা তথা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যে এবং হুকুম পালনার্থে কোরবানি করা। পাশাপাশি কিছু জরুরি মাসয়ালাও জেনে নিতে হবে। যাতে করে শরিয়ত নির্দেশিত পন্থায় নিখুঁত ও সঠিকভাবে কোরবানি সম্পাদন করা যায়। অন্যথায় কোরবানি ত্রুটিযুক্ত এবং কবুল হওয়ার ব্যাপারে ঝুঁকি থেকে যায়। মহান আল্লাহ আমাদের যথাযথভাবে কোরবানি করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক গবেষক

ভয়েস/আআ

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023
Developed by : JM IT SOLUTION