শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:০৪ অপরাহ্ন
ভয়েস প্রতিবেদক, টেকনাফ:
বনবিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও জেলেদের চেষ্টায়
তিনদিন পর সাগর থেকে উদ্ধার বনের দুই হাতি
টেকনাফ পাহাড় থেকে পথ ভুলে নাফনদে নেমে পড়া দুইটি হাতি গতকাল মঙ্গলবার বিকাল ৫ টায় শাহপরীর দ্বীপ সংলগ্ন বঙ্গোপসাগর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। স্থানীয় জেলেদের সহযোগীতায় বনবিভাগ হাতি দুটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। হাতি দুটি গত শনিবার সকাল ১০ টার দিকে টেকনাফ পৌরসভার নাইট্যংপাড়া সংলগ্ন নাফনদে নেমে আসে। গত চারদিন ধরে নাফনদ ও বঙ্গোপসাগরে ভাসতে থাকে এই হাতি দুটি। হাতি দুটি বনে ফেরাতে তিনদিনের ব্যর্থ চেষ্টার পর গতকাল চুতুর্থ দিনে সাগর থেকে উদ্ধার হয়। উদ্ধার হওয়া হাতি দুটি বনের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান বনবিভাগের টেকনাফ রেঞ্জ কর্মকর্তা সৈয়দ আশিক আহমদ।
টেকনাফ বনবিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা সৈয়দ আশিক আহমদ বলেন, প্রথম দিন থেকে হাতি দুটি বনে ফেরাতে চেষ্টা অব্যাহত ছিল। তবে হাতি দুটি বন ছেড়ে অনেক দূর চলে যাওয়ায় ফেরানো কঠিন হয়ে যায়। তৃতীয় এবং চতুর্থদিনে হাতি দুটি শাহপরীর দ্বীপ সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করে। পরে আমি গতকাল মঙ্গলবার শাহপরীর দ্বীপ পৌঁছে হাতি উদ্ধারের চেষ্টা করলে প্রথমে স্থানীয় জেলেরা সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেয়। তাদের সহযোগীতায় চারটি বোট প্রস্তুত করে, রশি এনে হাতি একটি একটি করে হাতি দুটি সাগর থেকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে সৈকত তীরে নিয়ে আসা হয়। সন্ধ্যায় হাতি দুটি একসঙ্গে মেরিন ড্রাইভ এলাকা দিয়ে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
তিনি আরো বলেন, হাতি দুটি গত চারদিনই নাফনদ এবং সাগরে খাবার সংকটে ছিল। উদ্ধার পরবর্তী হাতি দুটিকে পর্যাপ্ত খাবার দেয়া হয়েছে। হাতি দুটি উদ্ধারের ক্ষেত্রে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, বিজিবি ও কোস্টগার্ডসহ স্থানীয়দের যথেষ্ট সহযোগীতা ছিল। যদিও আমাদের আধুনিক কোন সুযোগ সুবিধা ছিলনা, এরপরও আমরা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে হাতি দুটি বনে ফেরাতে সক্ষম হয়েছি।
শাহপরীর দ্বীপ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই যায়েদ হাসান বলেন, সাগরে ভাসমান হাতি দুটি উদ্ধার করতে পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা ভূমিকা রেখেছে। উদ্ধার অভিযানে উৎসুক মানুষের ভীড় নিয়ন্ত্রন করা অনেকটা কঠিন ছিল। আমরা উপজেলা প্রশাসন ও বনবিভাগের নির্দেশনায় সেটি নিয়ন্ত্রন করেছি।
স্থানীয় বাসিন্দা ফয়সাল মাহমুদ বলেন, গত শনিবার নাফনদে দুটি হাতি দেখতে পাই। দ্বিতীয় দিন হাতি দুটি নদের ¯্রােতে ভেসে শাহপরীর দ্বীপ ঘোলার চর এলাকায় চলে আসে। তৃতীয় দিনে দক্ষিণে সাঁতরে বঙ্গোপসাগরে চলে যায়। তিন ধরে চেষ্টা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ হাতি দুটি বনে ফেরাতে ব্যর্থ হয়। অবশেষে শাহপরীর দ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দা ও জেলেদের সহযোগীতায় হাতি দুটি অন্তত সাগর থেকে উদ্ধার হয়। গত চার দিনে হাতি দুটি খাবারের অভাবে অনেকটা রোগাক্রান্ত হয়ে গেছে।
স্থানীয় কলেজ ছাত্র মাসুদ মির্জা অভিযোগ করে বলেন, দুটি হাতি চার দিন সাগরে ভাসলেও হাতি নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন বেসরকারী সংস্থার লোকজনকে শুধু ছবি তুলতে ব্যস্থ দেখেছি। বিশেষ করে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনসারভেশন অব বাংলাদেশ (আইইউসিএন) এ্যালিফ্যান্ট রেসপন্স টিম হাতি দুটি উদ্ধারের ক্ষেত্রে কোন ভূমিকায় রাখেনি। তারা শুরু থেকে ভূমিকা রাখতে পারলে টেকনাফ পাহাড়ের কাছাকাছি অবস্থান করার সময় প্রথম দিনেই হাতি দুটি উদ্ধার করতে পারতেন। এখনো স্থানীয় বাসিন্দা ও জেলেদের প্রাণবাজি রেখে উত্তাল সাগরে নেমে বনবিভাগকে সহযোগীতা না দিলে হাতি দুটি উদ্ধার করা অনেক কঠিন হয়ে পড়তো।
প্রসঙ্গত, টেকনাফ ও উখিয়ায় হাতির আবাসস্থল হিসেবে জায়গাগুলো রোহিঙ্গা ক্যাম্পের দখলে চলে যাওয়ায় হাতিগুলো পাহাড়ে চলাচলে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে নিয়মিত। এছাড়া রোহিঙ্গাদের কারণে দিনদিন পাহাড় উজাড় হয়ে যাওয়ায় সেখানে হাতির খাদ্যসংকটও দেখা দিয়েছে। এ কারণে প্রতিনিয়ত হাতিগুলো লোকালয়ে ঢুকে পড়ে বিভিন্ন সময় তা-ব চালায়। গত শনিবার দুপুরে হাতি দুটি প্রথম টেকনাফ নাইট্যং পাড়াস্থ নাফনদে নেমে আসে। ওইদিন হাতি দুটি বনে ফেরাতে ব্যর্থ হলে পরের দিন রবিবার ভাটার টানে হাতি দুটি ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণে শাহপরীর দ্বীপ পৌঁছে। এরপর তৃতীয় দিন সাগরের ¯্রােতের টানে অসহায় হাতি দুটি নাফনদের মোহনা অতিক্রম করে বঙ্গোপসাগরে চলে যায়। হাতি দুটি সাগরেও দুইদিন ভাসমান ছিল। দুইদিন নাফনদে এবং দুইদিন সাগরে ভেসে থাকার পর চতুর্থ দিন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসহ প্রশাসন, স্থানীয় বাসিন্দা ও জেলেদের সহযোগীতায় হাতি দুটি উদ্ধার করে মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন টেকনাফ পাহাড়ের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া হয়।
ভয়েস/জেইউ।