মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬, ১০:৪৪ অপরাহ্ন
বাণী
সুদীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা। ২০০ বছরের বৃটিশ দাসত্বের শৃঙ্খল এবং প্রায় ২৪ বছরের পাকিস্থানি শাসক গোষ্ঠীর নিষ্পেশনের পথ ধরে ৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬ এর ৬ দফা এবং ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অব্যাহতভাবে রচিত হয় বাঙালির স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে যে জাতিগত স্বাতন্ত্র্যের লড়াইয়ের সূচনা হয়েছিলো তারই ধারাবাহিকতায় হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দীর্ঘ নয় মাস সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়। বাংলার মাটি হয় শত্রুমুক্ত।
আজ বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তির সুবর্ণ মুহূর্তে আমি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহান স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, পঁচাত্তরের পনের আগস্টের শাহাদাৎ বরণকারী জাতির পিতার পরিবারের সকল সদস্য এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্নোৎসর্গকারী জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের, যাদের বীরত্ব ও সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে মহান স্বাধীনতা। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর পাশাপাশি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবারের বিজয়ের আনন্দে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে। আজকের এই শুভদিনে আমি কক্সবাজার জেলার সকল নাগরিককে মহান বিজয় দিবস ২০২১ এর রক্তিম শুভেচ্ছা ও আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি।
মাদার অফ হিউম্যানিটি, বাংলাদেশের চারবারের নির্বাচিত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদক্ষ নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের বুকে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীর এই শুভলগ্নে বাংলাদেশ প্রবেশ করেছে সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের এক মহাসড়কে। জাতির পিতার সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন এর মাধ্যমে দারিদ্র্য আর দুর্যোগের বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশ। যে বাংলাদেশ ছিল একসময় অবহেলিত, দারিদ্রপীড়িত; যে বাংলাদেশকে নিয়ে পশ্চিমা-বিশ্ব উপহাস করত ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে; মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার দূরদর্শী, সুদক্ষ, সৃজনশীল ও সাহসী নেতৃত্বের ফলেই; সেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বের ইতিহাসে উন্নয়নের রোল মডেল ও সম্ভাবনার অপার বিস্ময়কর একটি উদীয়মান অর্থনীতির দেশ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে সোনার বাংলার স্বপ্ন আমাদের দেখিয়েছিলেন; সেই স্বপ্ন আজ বাস্তবায়িত হচ্ছে তাঁরই কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশে রূপান্তরের মাধ্যমে। স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত করার মাধ্যমে এবং খাদ্য ঘাটতির দেশকে খাদ্যে উদ্বৃত্ত দেশে পরিণত করার মাধ্যমে। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্রুত উন্নয়নশীল প্রথম ৫টি দেশের মধ্যে একটি।
ইতোমধ্যে অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সঙ্গে এসডিজি-এর লক্ষ্যমাত্রাগুলো সম্পৃক্ত করে বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। এছাড়াও জলবায়ুর ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন অর্জনের জন্য ‘বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০’ নামের শতবর্ষের একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে রূপকল্প-২০২১ এর সফল বাস্তবায়নের পর রূপকল্প-২০৪১ বাস্তবায়নের পথে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। সোয়া ৫ কোটি মানুষ নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে। সমুদ্রসীমায় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে মহাকাশ বিজ্ঞানের যুগে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্য দিয়ে ৫৭তম দেশ হিসেবে নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণকারী দেশের তালিকায় বাংলাদেশ অবস্থান করে নিয়েছে। শত ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু আজ উদ্বোধনের অপেক্ষায় মাত্র। চার-লেন, ছয়-লেন ও আট-লেন জাতীয় মহাসড়ক, উড়াল সেতু, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মেরিন ড্রাইভ, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেতু, বঙ্গবন্ধু টানেল নির্মাণের মাধ্যমে যুগান্তকারী উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। চট্টগ্রাম শহরের সাথে আনোয়ারাকে যুক্ত করতে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে তৈরি হচ্ছে সাড়ে তিন কিলোমিটারের বঙ্গবন্ধু টানেল। সরকারের কৌশলী পদক্ষেপ ও দূরদর্শী নীতির কারণে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্র সীমানা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে ২০১২ সালে মিয়ানমার ও ২০১৪ সালে ভারতের কাছ থেকে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের রাষ্ট্রীয় সমুদ্র, ২০০ নটিক্যাল মাইল অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল মহীসোপান এলাকায় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে বাংলাদেশ। বিশ্বমন্দা, করোনা সংকট সফলভাবে মোকাবিলা করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিসহ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রতিটি সূচকে এগিয়ে চলেছে আমাদের প্রিয় স্বদেশ।
উন্নয়নের এ জয়যাত্রায় কক্সবাজার জেলা অগ্রগামী। কক্সবাজারকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু করে গড়ে তুলতে এবং এ জেলায় আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনশিল্প বিকাশে চলমান রয়েছে ৯৮ টি উন্নয়ন প্রকল্প। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত হতে জেলার অভিগম্যতা নিশ্চিত করতে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উন্নীতকরণ, সমুদ্রে রানওয়ে সম্প্রসারণ ও চট্টগ্রামের দোহাজারী হতে কক্সবাজার হয়ে মিয়ানমার এর সীমান্তবর্তী ঘুনদুম পর্যন্ত রেললাইন স্থাপন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে কক্সবাজার হতে টেকনাফ পর্যন্ত দেশের প্রথম মেরিন ড্রাইভ সড়কের নির্মাণকাজ। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়িতে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল ও সিঙ্গেল পয়েন্ট ম্যুরিং স্থাপনের মাধ্যমে মহেশখালীকে বাংলাদেশের ‘পাওয়ার হাব’ এ রূপান্তরের কাজ। আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন শিল্প গড়ে তোলার লক্ষ্যে চলমান রয়েছে সাবরাং এক্সক্লুসিং ট্যুরিস্ট জোন, নাফ ট্যুরিজম পার্ক ও সোনাদিয়া ইকোট্যুরিজম পার্ক এর নির্মাণ প্রকল্প। উন্নয়নের পাশাপাশি জলবায়ু উদ্বাস্তু পুনর্বাসন কিংবা বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের আশ্রয়দান করে মানবিক আশ্রয়স্থল হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে স্বকীয়ভাবে জায়গা করে নিয়েছে কক্সবাজার জেলা এবং বাংলাদেশ।
বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের জনগণকে রাজনৈতিক মুক্তি প্রদান করেন, আর বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা তাঁর সুযোগ্য ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ক্ষুধা ও দারিদ্রকে জয় করে দেশের জনগণকে অর্থনৈতিক মুক্তি প্রদান করার মধ্য দিয়ে বিশ্বসভায় একটি উন্নয়নশীল এবং মর্যাদাবান জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আদর্শ, মূল্যবোধ ও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ বাস্তবায়নে আমাদের সকলকেই স্ব স্ব অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করে যেতে হবে। পরিকল্পিত উন্নয়নের ধারা আরও বেগবান হোক, দেশের সকল নাগরিকই উন্নয়নের সুফল ভোগ করুক; মহান বিজয় দিবস ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এটাই আমাদের প্রত্যাশা। জেলা প্রশাসন, কক্সবাজারের সার্বিক আয়োজনে সকল সম্মানিত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও পরিবারের সদস্যবৃন্দ, জনপ্রতিনিধিবৃন্দ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজ, সরকারি/বেসরকারি কর্মকর্তা/কর্মচারীবৃন্দ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সকল সাংবাদিককে জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও শুভেচ্ছা।
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মহান বিজয় দিবস ২০২১ সফল হোক। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।
মোঃ মামুনুর রশীদ
জেলা প্রশাসক,কক্সবাজার।