শুক্রবার, ০৭ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:৪৪ পূর্বাহ্ন
এক সময়ের আত্মনির্ভরশীল আত্মমর্যাদাবান মৌলানা সিরাজুল মনির দুর্ঘনার কবলে পড়ে এখন নিঃস্ব, তারপরও তাঁর মনোবল কাজে কর্মে দৃঢ় প্রত্যয়ী একজন মানুষ। মোহাম্মদ ইরফান উদ্দিনঃ
আজ ভিক্ষুক হলেও একদিন আত্মনির্ভরশীল মানুষ ছিলেন বান্দরবানের সিরাজুল মনির মৌলানা (৫৬)। কঠিন এক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে ভিক্ষা করে এবং তা দিয়ে সংসারের অস্থিত্ব কোন রকম টিকিয়ে রেখেছেন তিনি। কক্সবাজার শহরের স্থানীয় বেশির ভাগ মার্কেট ব্যবসায়ীরা তাকে চিনেন এবং তারা মোল্লা ভাই বলেই ডাকেন। এই মৌলানা তার পঙ্গু শরীরে কক্সবাজার শহরের প্রত্যেকটা অলিগলিতে ভিক্ষা করে যাচ্ছেন দীর্ঘ ৯ বছর ধরে। হঠাৎ চোখে পড়লে ভিক্ষুক মনে হলেও নম্র ও সুন্দর ব্যবহারের অধিকারী। যদিও তিনি একদিন তার এলাকার সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন।
মোল্লা বান্দরবান জেলা লামা উপজেলার রুপাসী পাড়া গ্রামের বাসিন্দা মৃত ক্বারী আব্দুল মাবুদ এর পুত্র।
তিনি বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার লাইনঝিরি দাখিল মাদরাসা থেকে ২০০৩ ইং সালে আলিম পর্যন্ত পড়াশোনাও করেছেন।
৯ বছর আগেও আত্মনির্ভরশীল মানুষ ছিলেন তিনি।
বান্দরবন লামা উপজেলা ও বিভিন্ন জায়গায় বন বিভাগের সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে কাজ করতেন। পাহাড়ের অনেক বড় বড় গাছ কেটে দিয়ে ভালো আয় রোজগার হতো। তার এলাকায় একজন সৎ ও সম্মানিত মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি আছে তার।
৩ সন্তান আর স্ত্রীকে নিয়ে সুখে শান্তিতে দিন কাটাতেন।
কিন্তু একদিন গাছ কাটার কাজে নিয়োজিত থাকাকালীন ঘটে যায় তার জীবনের একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। গাছ কাটার সময় একটি গাছ তার শরিরে আচড়ে পড়ে ঘটে যায় দুর্ঘটনা। এতে তার পা দুমড়েমুচড়ে ভেগে যায়। বুক আর কুমরেও মারাত্মক আঘাত লাগে।
নিমিষেই তচনচ হয়ে যায় তিলে তিলে গড়া এতদিনের সাজানো জীবন। যদিও তিনি সুস্থ হয়ে গেলে সব আগের মতোই ফিরিয়ে পাওয়ার আশা ছিলো।
কিন্তু তার সুস্থ হয়ে ওঠার কোন রাস্তায় দেখে না মোল্লা। চিকিৎসকের সাথে কথা বলে জানতে পারলেন সুস্থ হতে লাগবে চিকিৎসা বাবদ প্রচুর টাকা। যার চিকিৎসা খরচ ব্যয় বহুল। তার এতদিনে সঞ্চয় আর বসতভিটা বিক্রি করেও এই টাকা সংগ্রহ করা সম্ভব ছিলো না।
এদিকে মোল্লার স্ত্রীও তার সন্তানেরা অনেক চেষ্টা করেছে,তার চিকিৎসার টাকা যোগাড় করার।
কিন্তু এত টাকা কিউ এই গরীব মোল্লাকে ধার দেয় নি।
এভাবে কয়েক মাস গেছিলো কোন রকম। কিন্তু জমানো টাকা পয়সা একেবারেই শেষ। এদিকে বাড়ির স্ত্রী সন্তানেরা অনাহারে দিন কাটাতে শুরু করলেন। জীবনে এমন বাস্তবতা মোকাবেলা করতে সাহস হারিয়ে গোপনে অঝোরে চোখের পানি ফেলতেন। কতবার চোখের পানিতে তার বালিশ ভিজে যেতো,বালিশটি সকাল হতে হতে শুকিয়ে যেতো। এতে তার পরিবারের কিউ বুঝতে পারতোনা। তারা কখনো তার চোখের পানি দেখেও নি।
মোল্লার একটাই চিন্তা, সব ত্যাগের বিনিময়ে হলেও তার স্ত্রী সন্তান যেন কষ্টে না পড়ে। যেন অনাহারে না থাকে। কারণ মোল্লা একদিকে যেমন দ্বায়িত্ববান স্বামী আরেক দিকে দ্বায়িত্ববান বাবা।
মোল্লা পঙ্গু হওয়ায় নিজের জন্য যতটা কষ্ট পাচ্ছেন,তার চেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন তার স্ত্রী সন্তানদের জন্য। সংসার কিভাবে চালাবে কিভাবে তার স্ত্রী সন্তানদের ৩ বেলা খাবার যোগাড় করে দেবে?
এসব ভেবে কুল কিনারা পাচ্ছে না। অনেক ভাবে চেষ্টা করেছেন পঙ্গু জীবন নিয়ে কিভাবে আয় উপার্জন করা যায়? সেরকম কিছু করতেও পুঁজি লাগে, সে পুঁজি তার নাই।
শেষমেষ নিলেন ভিক্ষা করার সিদ্ধান্ত।
পঙ্গু শরীরে বিনা পুঁজিতে করার কাজ যে আর নাই। একেতো গরিবদের সুস্থ শরীরেও পরিশ্রমের বিনিময়ে কাজ পাওয়া কঠিন। তার ওপরে পঙ্গু।
এদিকে আবার ভিক্ষা সবখানে করা যাচ্ছেনা।
কেননা নিজের এলাকায় ভিক্ষা করা কখনোই মোল্লার পক্ষে সম্ভব না। এতদিনের অর্জন করা মানসম্মান এটা কখনোই মেনে নেওয়া যায় না। কেননা কিছু মানুষের কাছে মৃত্যুর চেয়ে আত্মসম্মান বড়। নিজে এবং তার সমাজ এটা এত সহজে মানতে পারেনা।
তাই মোল্লার পঙ্গু জীবনটাকেই মেনে নিয়ে চলে আসেন তার অপরিচিত একটি শহরে। যার নাম কক্সবাজার।
মোল্লার অপরিচিত শহর কক্সবাজারে দীর্ঘ ৯ বছর ধরে ভিক্ষা করে যাচ্ছেন। তার কাছে এখন নিশ্চয় আর অপরিচিত নয়। শহরের প্রত্যকটা অলিগলিতে তার ছায়া পড়েছে। ভিক্ষা করতে পিলপিল করে ছুটেছেন তার শরীরের ভার বহণ করার কাটের তৈরি পা দিয়ে।
ভিক্ষা করা মোল্লার কাছে মোটেই পছন্দ না। তাই মাঝে মাঝে এই পঙ্গু শরীরেও কক্সবাজার সমুদ্রে ভিক্ষা করা টাকায় অল্প পুঁজি নিয়ে নানান ব্যবসায় করেছিলেন। সমুদ্র সৈকতে বাচ্ছাদের খেলনা, পান সিগারেট বিক্রি সহ নানান ক্ষুদ্র পরিসরের ব্যবসা করে দেখেছেন। কিন্তু লাভ হয় অতি অল্প। এত অল্প আয় নিয়ে তার সংসারকে চালানো সম্ভব হচ্ছেনা। তাই বারবার বেঁচে নিতে হয় তার চরম অপছন্দের কাজটি। ভিক্ষা করা।
তাছাড়া তিনি মুসলিম ও নামাজী মানুষ। নারী-পুরুষের বেপর্দা চলাচল তার খুবই অপছনদের বিষয়। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে ভিক্ষা করতে গেলে ঢাকা শহরের ও বিদেশের ফ্যাশন করা পোষাক পরিধান করা কোন পর্যটক দেখলে মনে মনে দুঃখ পেতেন আর তাদের জন্য মোনাজাত করেন যাতে তারা শালীন হয়ে ওঠেন।
মাঝে মাঝে তাদের নিয়ে তিনি বিভিন্ন সংগীত তৈরি করেন এবং তা নিজে গুণগুন করে গাই আর নিজেকে প্রশান্তি দেয়। ইতিমধ্যে তার নিজের লেখা ও খালি গলায় গাওয়া একটি সংগীত কক্সবাজার ভয়েসের ফেসবুক পেইজে পাবলিশ করা হয়েছে। তিনি আরো জানান মনের দুঃখ,কষ্ট,বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন। এবং তা নিজে নিজে পড়ে প্রশান্তি বোধ করেন। ভিক্ষার পাশাপাশি লিখে যাবেন প্রতিনিয়ত তার চিন্তাভাবনা।
এভাবে দেশের কতশত মৌলানা আছে। তাদের জীবন যুদ্ধের এক অংশ অংশীদার হওয়ার চিন্তা কে করে?
ভয়েস/জেইউ।