শুক্রবার, ৩১ Jul ২০২৬, ০৭:৩০ অপরাহ্ন
ভয়েস ডেস্ক:
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের নানাবিধ লক্ষ্য ও আকাঙ্ক্ষা থাকলেও দেশে ‘সুশাসন’ প্রতিষ্ঠা ছিল অন্যতম প্রধান দাবি। শত শত মানুষের আত্মত্যাগ ও রক্তক্ষয়ের বিনিময়ে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ ও একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল, দুই বছর পর সেই প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ হয়েছে— তা নিয়ে এখন রাজনীতি ও নাগরিক সমাজে উঠছে নানা প্রশ্ন।
জুলাই আন্দোলনের দুই বছর পর সুশাসনের চিত্র নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন রয়েছে হতাশা ও ক্ষোভ, তেমনি রয়েছে নানা প্রত্যাশা ও আশার বাণীও। বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক নেতাদের মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয়করণ মুক্ত করা না গেলে কখনোই কাঙ্ক্ষিত সুশাসন সম্ভব নয়। অনেকে বলছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলে গঠিত সংস্কার কমিশনগুলোর জমা দেওয়া রিপোর্ট গুরুত্বসহকারে বাস্তবায়ন করা উচিত। অপরদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ভেঙে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুসংগঠিত করে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বর্তমান নির্বাচিত সরকার নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
‘প্রতিষ্ঠান দলীয়করণমুক্ত না হলে সুশাসন অসম্ভব’
জুলাই আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবিলম্বে দলীয়করণমুক্ত করার তাগিদ দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্থা শারমিন।
তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরি হলো আমাদের সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পূর্ণাঙ্গভাবে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা। নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা এবং জনগণের কাছে সেগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নিরপেক্ষ জায়গা থেকে ১২টির মতো সংস্কার কমিশন সুচিন্তিত রিপোর্ট জমা দিয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে সেই রিপোর্ট অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে আর কোনও দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।”
শিক্ষা ও পুলিশ সংস্কারের ওপর জোর দিয়ে তিনি আরও বলেন, “সাংবিধানিক সংস্কারগুলো এক প্রকার মুখ থুবড়ে পড়েছে। পুলিশ অভ্যুত্থানের পর যে ৯ দফা দাবি দিয়েছিল কিংবা পুলিশ সংস্কার কমিশনের যে সুপারিশ ছিল, সেগুলোর বিষয়ে কোনও অগ্রগতি হয়নি। পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনী আগের নিয়মে (রুলস অব প্রসিডিউর) চললে সিস্টেমেটিক কোনও পরিবর্তন আসবে না। ব্যক্তি পরিবর্তনের চেয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থার মূল সংস্কার বা সিস্টেমেটিক চেঞ্জই সুশাসনের মূল ভিত্তি।”
‘৫ মাসের শাসনামলে ইতিবাচক ছায়া পড়েনি’
সুশাসনের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জবাবদিহির গুরুত্ব তুলে ধরেছেন আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, “গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা আনা, গণহত্যার বিচার এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার মতো বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। কিন্তু সুশাসন নিশ্চিত করতে স্বাধীন বিচার বিভাগ, কার্যকর দুর্নীতি দমন কমিশন, শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন ও দলীয় প্রভাবমুক্ত পিএসসি অপরিহার্য।”
তিনি আরও বলেন, “বর্তমান নির্বাচিত সরকার তাদের প্রতিশ্রুত ‘৩১ দফা’ অনুযায়ী সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর বললেও দায়িত্ব নেওয়ার গত ৫ মাসে তার স্পষ্ট প্রভাব দেখা যায়নি। তবে কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা পূরণ না হলেও আমরা সরকারকে আরও সময় দিতে চাই, তারা যেন ওয়াদা রক্ষা করে।”
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “সুশাসন এক দিনে আসে না, এটি দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠান তৈরি ও শক্তিশালীকরণের লড়াই। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় গঠিত প্রায় ১৫টি সংস্কার কমিশনের লক্ষ্যই ছিল ভবিষ্যৎ সরকারগুলোর জন্য সুশাসনের রূপরেখা তৈরি করা। তবে দুঃখজনক হলো ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পরে সেগুলোকে আর গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয় না। তাই জুলাই জাতীয় সনদ, গণভোটের গণরায় অথবা ৩১ দফা সবকিছুই অগ্রাধিকারে পেছনে পড়ে যায়।”
তা সত্ত্বেও হতাশ হওয়ার কারণ নেই জানিয়ে এই নেতা বলেন, “এটি পুরো একটি জাতির বিনির্মাণের লড়াই। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাদের সময়, মেধা ও শ্রম দিয়ে তার অভিষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে।”
‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ হওয়া ইতিবাচক’
সুশাসন প্রতিষ্ঠায় এখন পর্যন্ত বড় কোনও দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলেও সামনে ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা দেখছে গণঅধিকার পরিষদ। দলের মুখপাত্র আবু হানিফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “ফ্যাসিবাদী শাসনামলে রাষ্ট্রের বিচার বিভাগসহ প্রায় প্রতিটি যন্ত্র ধসে করেছিল। অভ্যুত্থানের পর সুশাসনের শতভাগ প্রত্যাশা এখনও পূরণ না হলেও একটি ইতিবাচক দিক হলো— বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা তথাকথিত ‘ক্রসফায়ার’-এর মতো ঘটনা এখন বন্ধ রয়েছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “বিচার বিভাগে এখনও পুরোনো শাসনের কিছু দোসর সক্রিয় থাকায় প্রক্রিয়াটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চক্রান্ত চলছে। দীর্ঘ অন্তর্বর্তী সরকার সব ক্ষেত্রে সফল না হলেও বর্তমান নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মাত্র পাঁচ মাস পার হয়েছে। আশা করা যায়, পরিবেশ এখন ইতিবাচক এবং ক্রমান্বয়ে সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।”
‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় প্রধানমন্ত্রীর নিরলস প্রচেষ্টা’
জুলাই আন্দোলনের পর বিগত ১৮ মাসের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও সুশাসনের অগ্রগতির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনামলে দেশের প্রায় প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। অভ্যুত্থানের পর মানুষ যেভাবে পুনর্গঠন চেয়েছিল, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসে সেই প্রত্যাশা খুব বেশি পূরণ হতে পারেনি, যা নিয়ে জনমনে কিছুটা ক্ষোভও ছিল।”
তবে বর্তমান সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি বলেন, “বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকেই সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করতে দিনরাত কাজ করছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের ‘মব ভায়োলেন্স’ বা অস্থিরতা এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে এবং বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হচ্ছে। জনগণের যে সুশাসনের আকাঙ্ক্ষা, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে তা পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে।” সুত্র:বাংলাট্রিবিউন।
ভয়েস/জেইউ।