বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:৩৪ অপরাহ্ন
কাজ না পেয়ে প্রায় সময় এভাবে বসে থাকে শহীদ সরণী মোড়ে স্থানীয় শ্রমিকরা (ছবি১০অক্টোবর সকালের ছবি ধারণ করেছন রায়হান ছিদ্দিক)
জিকির উল্লাহ জিকু:
কক্সবাজার শহরে শ্রমবাজারের প্রায়ই রোহিঙ্গাদের দখলে এমন অভিযোগ স্থানীয় শ্রমিকদের। স্থানীয় শ্রমিক আবুল হাসেম বলেন, খুব কম মজুরীতে (বার্মাইয়া) রোহিঙ্গারা কাজ করে। যার কারণে স্থানীয়দের কথাও শুনতে হয় অপরদিকে কাজ হারাতে হয়। যেকারণে প্রায়ই পরিবার নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়।
জানাযায়, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিলম্ব হওয়া, অনেক পুরোনো রোহিঙ্গাদের আত্মীয়তার সুবাদেও কক্সবাজার শহরসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ছড়িয়ে পড়েছে রোহিঙ্গারা।
সূত্রমতে, গত তিন বছরে শুধুমাত্র কক্সবাজার শহর ও আশপাশের এলাকাগুলোতে বসতি গড়েছে অন্তত অর্ধলাখ রোহিঙ্গা। এর আগেও মিয়ানমার থেকে অনুপ্রবেশের পর স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছে তিন লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। এসব রোহিঙ্গা প্রথমে ভাড়া বাসায় উঠে জেলে শ্রমিক, রিকশা, ইজিবাইক ও বিভিন্ন চাষাবাদে শ্রমিক হিসেবে অবস্থান নেয়। পরে ধীরে ধীরে বসতি শুরু করে।এসব রোহিঙ্গার একাংশ শহরে চুরি, ছিনতাই ও ইয়াবা পাচারসহ নানা অপকর্মে লিপ্ত রয়েছে। এরমধ্যে চতুর রোহিঙ্গারা স্থানীয় প্রভাবশালীদের সাথে পরিচয় সখ্যতা গড়ে তুলে পরে লোভের বশীভূত করে মরণনেশা ইয়াবার কারবারে যুক্ত করে। স্থানীয় অনেক প্রভাবশালীরাও অর্থের লোভে তাদের (রোহিঙ্গাদের) শেল্টার দিয়ে তাদের আশ্রিত করে নিজেদের আর্থিক সুবিধার স্বার্থে। শহরে রোহিঙ্গা সমস্যা পুলিশ প্রশাসনও অনুভব করতে পারছেন জেলা ও উপজলার বিভিন্ন অপরাধ বিশ্লেষণ করে।
জেলা পুলিশের পরিকল্পনা:
কক্সবাজার জেলা পুলিশ কার্যালয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) রফিকুল ইসলাম নিজ কার্যালয়ে গতকাল গণমাধ্যম কর্মিদের বলেন, শহরে বা ক্যাম্পের বাইরে কত রোহিঙ্গা আছে এর সঠিক তথ্য (অফিসিয়ালভাবে) নাই।তবে বর্তমান সময়ের প্রয়োজনে এবিষয়ে কাজ করবে সংশ্লিষ্ট দফতর। টাউনে রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণের জন্য খুব শীঘ্রই কার্যালয়ে একটি হট নাম্বার (যেখানে শুধু রোহিঙ্গাদের বিষয়ে তথ্য দিতে পারবেন যে কেউ) চালু করার পরিকল্পনার কথা তিনি জানান। এসময় প্রয়োজনে যেকোন সময় তাঁহার অফিসিয়াল নাম্বারেও তথ্য দিয়ে সহযোগিতার অনুরোধ করেন।
সূত্র জানান, কক্সবাজার শহরের সমিতিপাড়া, কুতুবদিয়া পাড়া, পাহাড়তলী, ফদনার ডেইল, বাসটার্মিনাল এলাকা, নুনিয়ারছড়া, ঘোনারপাড়া এবং ফতের ঘোনা এলাকায় বেশির ভাগ রোহিঙ্গা বাস করে বিভিন্নভাবে পরিচয় গোপন করে। এসব এলাকার স্থানীয়দের সাথে কথা হলে তারা জানান, যেসব রোহিঙ্গারা বার্মার সাথে যোগাযোগ আছে এসব রোহিঙ্গারা স্থানীয় প্রভাবশালীদের হাত করে জড়িয়ে পড়ে মরণ নেশা ইয়াবা’য়।এই ইয়াবা ব্যবসা আর সিন্ডিকেট ঠিক রাখতে বিভিন্ন অপকর্মসহ ধ্বংস করে দেয় জেলার আইনশৃঙ্খলা।
স্থানীয় শ্রমিদের উদ্বেগ:
ঘোনারপাড়ার বাসিন্দা টিনের মিস্ত্রি মোহাম্মদ আলী উদ্বেগের সাথে বলেন, প্রায়ই সময় কাজে গেলে মজুরি নিয়ে তর্কাতর্কি হয়। উদারহণ হিসেবে রোহিঙ্গাদের সস্তায় কাজ করা যায় বলে উল্লেখ করেন তারা।তিনি আরো বলেন, দেখাযায় রোহিঙ্গারা শুধুমাত্র পেটের মূল্যে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। নুনিয়ারছড়ার বাসিন্দা পেশায় বোট শ্রমিক মনির বলেন, ফিশারি ঘাট এলাকায় অনেক রোহিঙ্গা কাজ করে। তারা খুবই কম মজুরি নিয়ে বোটের শ্রমিক হিসেবে বোটে যায়। যার ফলে স্থানীয় শ্রমিকের কদর থাকেনা। একজন ফিশিং বোটের মালিক নাম না জানার শর্তে বলেন, বার্মাইয়া শ্রমিক না থাকলে অনেক ফিশিংবোট চলবেনা। শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, দিন দিন স্থানীয় ডেইল শ্রমিকদের উদ্বেগ বাড়ছে। অন্যদিকে পুলিশ প্রশাসনের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বাড়ছে।
গ্রেফতার হওয়া রোহিঙ্গাদের উদ্দেশ্য ছিল শহর :
উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের দুইগ্রুপে সংষর্ষের ঘটনায় জড়িত ১৬ জন রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করেছে গতকাল আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়ান (এপিবিএন)।এপিবিএন সূত্র জানান, শনিবার সকালে উখিয়ার বালুখালী চেকপোস্ট ও সোনার পাড়া চেকপোস্টে পৃথক অভিযানে এসব রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করা হয়েছে। কুতুপালং ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের দুইগ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় জড়িত ছিল। তারা গ্রেফতারের ভয়ে ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছিল। এপিবিএন এর উখিয়ার বালুখালী চেকপোস্টের সদস্যরা তল্লাশীর সময় ৪ টি রামদাসহ ৪ জন রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা এসব রোহিঙ্গারা শহরে বা উপজেলায় আত্মগোপনের উদ্দেশ্য ছিল।
শহরের সচেতন মহলের দাবি:
শহরে অবস্থান করা রোহিঙ্গাদের কারণে প্রায়ই কাজ না পেয়ে স্থানীয় শ্রমিকদের বসে থাকতে হয়। ফলে স্থানীয় শ্র্রমিকরা কষ্টে জীবনযাপন করে। শহরে শ্রমিকখাতে রোহিঙ্গা আধিপত্য বিস্তাররোধ আর আইনশৃঙ্খলার স্বার্থে আইনী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেয়া জরুরী।
কক্সবাজার বার্তার পক্ষ থেকে কথা হয়, মানবাধিকার সংগঠনের নেতা কলিম উল্লাহর সাথে তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয় শ্রমিকদের কাজের সমস্যা এটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার কক্সবাজার শহরে। এর থেকে পরিত্রাণ জরুরি। রোহিঙ্গারা একদিকে স্থানীয়দের থেকে কাজ কেড়ে নিচ্ছে অপরদিকে অনৈতিক কাজ আর আইনশৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজের কারণে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটায়। তাই শহরে অবস্থান করা রোহিঙ্গাদের আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ জররী বলে তিনিও মনে করেন।
২০১৭ সালের ২৫ আগষ্টের পর মায়ানমার থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম পালিয়ে এদেশে আশ্রয় নেয়। মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দেওয়া হলে এখন সেই রোহিঙ্গারা বিষফোঁড়ায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে উখিয়া-টেকনাফের জনসংখ্যার দ্বিগুন রোহিঙ্গা বসবাস করছে। এসব রোহিঙ্গারা টেকনাফ, উখিয়ার,এবং কক্সবাজার শহর ও শ্রমবাজার প্রায় দখলে নিয়েছে। কিছুতেই তাদের অবাধ বিরচণ থামানো যাচ্ছেনা।
ভয়েস/জেইউ।