সোমবার, ১১ মে ২০২৬, ০৯:০৩ পূর্বাহ্ন
ভয়েস নিউজ ডেস্ক:
৫০ হাজার টাকা চাঁদা না পেয়ে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে স্বামী-সন্তানকে জিম্মি করে এক নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছে মূল অভিযুক্ত আশিকুল ইসলাম ওরফে ‘টর্নেডো আশিক’ (২৯)। চাঁদার দাবিতে ‘জিয়া গেস্ট ইন’ হোটেলে আটকে দুই দফা ওই নারীকে ধর্ষণ করে সে। এরপর হোটেল কক্ষেই তাকে আটকে রাখে।
গত রবিবার রাতে এ ধর্ষণকাণ্ডের হোতা ও প্রধান আসামি আশিককে মাদারীপুর থেকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে র্যাব। আশিক কক্সবাজারের শহরের বাসিন্দা। এ ধর্ষণ মামলায় এখন পর্যন্ত পাঁচ আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
আশিককে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে র্যাব জানিয়েছে, ভুক্তভোগী নারী ও তার স্বামীর কাছে ঘটনার এক থেকে দুদিন আগে চাঁদা দাবি করে অভিযুক্তরা। মূলত তখনই অভিযুক্তদের সঙ্গে পরিচয় হয় ভুক্তভোগী নারী ও তার স্বামীর। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে লাবণী বিচ এলাকার রাস্তা থেকে ওই নারীকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
র্যাব আরও জানিয়েছে, আট মাসের অসুস্থ শিশু সন্তানের চিকিৎসার ব্যয় জোগাতে সাহায্যের আশায় কক্সবাজারে যান ওই দম্পতি। তারা বেশ কিছুদিন ধরে সেখানে অবস্থান করছিলেন। ঘটনার দুদিন আগে আশিক ওই দম্পতির কাছে চাঁদা দাবি করে। গ্রেপ্তারের পর চাঁদা দাবি ও ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছে সে। কক্সবাজারের অন্তত আটটি হোটেলের পর্যটকদের নিয়মিত ফাঁদে ফেলে মুক্তিপণ আদায় করত আশিক। তার বিরুদ্ধে কক্সবাজার সদর থানায় অস্ত্র, মাদক, নারী নির্যাতন ও চাঁদাবাজিসহ ১২টি মামলা আছে। সর্বশেষ ধর্ষণ মামলার পর গ্রেপ্তার এড়াতে দাড়ি-গোঁফ কামিয়ে আত্মগোপনে ছিল আশিক। সে এ পর্যন্ত পাঁচবার গ্রেপ্তার হয় এবং সর্বশেষ একটি মামলায় আড়াই বছর জেল খেটে সম্প্রতি জামিনে ছাড়া পেয়েছে।
তবে এ ঘটনায় র্যাব ও পুলিশের বক্তব্যে ভিন্নতা পাওয়া গেছে। এ ধর্ষণকাণ্ডের পর গত ২৪ ডিসেম্বর কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. হাসানুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, ধর্ষণের ঘটনায় একজন অভিযুক্ত ওই নারীর পূর্বপরিচিত। তাদের মধ্যে কী নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল, অন্য কোনো বিষয় ছিল কি না, এসব বিষয় নিয়ে পুলিশ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করছে।
ভুক্তভোগী নারীকে জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে তুলে নেওয়া এবং ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের এসপি মো. জিল্লুর রহমান। আদালতে ওই নারীর জবানবন্দি শেষে গত শুক্রবার রাতে জিল্লুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, গত তিন মাসে স্বামী-সন্তান নিয়ে কয়েকবার কক্সবাজারে এসেছিলেন ঢাকার যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা ওই নারী। যাদের বিরুদ্ধে তিনি ধর্ষণের মামলা করেছেন, তাদের একজনের সঙ্গে তার আগে থেকেই ‘পরিচয় ছিল’।
এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘ওই নারীকে আশিক মোটরসাইকেলে করে মেইন রোড দিয়ে নিয়ে যায়। সেখানে অনেক লোকজন ছিল। তিনি (নারী) বাইকের পেছনে বসা ছিলেন। কিন্তু তিনি চিৎকার-চেঁচামেচি কিছুই করনেনি।’
এদিকে গতকাল সোমবার সকালে রাজধানীর কারওয়ানবাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া আশিক ও তার সহযোগীরা ভুক্তভোগী নারী ও তার পরিবারের কাছে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে। কিন্তু চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে লাবণী বিচ এলাকার রাস্তা থেকে ভুক্তভোগী নারীকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে তুলে নিয়ে যায় তারা। পরে আশিকুল ওই নারীকে ধর্ষণ ও জিয়া গেস্ট ইন হোটেলে আটকে রেখে তার স্বামীর কাছে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। এরপর ভুক্তভোগী নারীকে হোটেলে আটকে রেখেই আশিক হোটেল থেকে বের হয়ে যায়। বিষয়টি ব্যাপকভাবে স্থানীয় পর্যায়ে ও বিভিন্ন মাধ্যমে জানাজানি হলে সে আত্মগোপনে চলে যায়। বেশভুষা পরিবর্তন করে ঘটনার দুদিন পর কক্সবাজার থেকে একটি এসি বাসযোগে ঢাকায় আসে। পরে ঢাকা থেকে পটুয়াখালী যাওয়ার পথে মাদারীপুরের মোস্তাফাপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে গ্রেপ্তার হয়।
তিনি বলেন, ভুক্তভোগী ওই নারী স্বামী-সন্তানসহ কক্সবাজারের একটি হোটেলে বেশ কিছুদিন অবস্থান করছিলেন। তাদের সঙ্গে আট মাস বয়সের একটি শিশুসন্তান রয়েছে। শিশুটির জন্মগতভাবে হার্টে ছিদ্র থাকায় তার চিকিৎসায় ১০ লাখ টাকা প্রয়োজন। শিশুর চিকিৎসার টাকা সংগ্রহের আশায় স্বামীসহ কক্সবাজারে অবস্থান করছিল পরিবারটি। তারা বিত্তবান পর্যটকদের কাছ থেকে টাকা সাহায্য চাইত। এ সময় ওই নারী অপহরণ ও ধর্ষণের শিকার হন। অপহরণের ঘটনায় ভুক্তভোগী নারীর স্বামী র্যাব-১৫-এর কাছে সহায়তা চান। এরপর র্যাব ভুক্তভোগীর স্বামীকে নিয়ে উদ্ধারে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায় ও একপর্যায়ে ওই নারীকে উদ্ধার করে।
খন্দকার আল মঈন বলেন, গত ২৩ ডিসেম্বর রাতে জিম্মি করার সহযোগিতার অভিযোগে জিয়া গেস্ট ইন হোটেলের ম্যানেজার রিয়াজ উদ্দিন ছোটনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। এরপর এ ঘটনায় হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে আসামিদের শনাক্ত ও জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে র্যাব। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে র্যাব সদর দপ্তর গোয়েন্দা শাখা, র্যাব-৮ ও ১৫-এর অভিযানে গত রবিবার রাতে আশিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছে।
ঝুপড়ি ঘরে নিয়ে ওই নারীকে ধর্ষণের ঘটনার বিষয়ে আশিক ‘অবগত নয়’ জানিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে র্যাবের এ কর্মকর্তা বলেন, ‘এ সময় ওই নারীকে তার সহযোগীদের কাছে রেখে আশিকুল মোটরসাইকেল আনতে বাসায় গিয়েছিল।’
আশিকুলের বিষয়ে র্যাবের এ কর্মকর্তা বলেন, অপরাধজগতে জড়িয়ে বারবার গ্রেপ্তার হলেও জামিনে মুক্তি পাওয়ায় স্থানীয়দের কাছে সে ‘টর্নেডো আশিক’ নামে পরিচিত। সে কক্সবাজারে পর্যটন এলাকায় একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের হোতা। এ চক্রের সদস্য সংখ্যা ৩০-৩৫ জন। সে ২০১২ সাল থেকে কক্সবাজার পর্যটন এলাকায় বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। ২০১৪ সালে প্রথম অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হয়। আশিক ও তার সিন্ডিকেট পর্যটন এলাকা কক্সবাজারে চুরি, ছিনতাই, অপহরণ, জিম্মি, চাঁদাবাজি, জবরদখল, ডাকাতি ও মাদক কারবারসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত। সে পর্যটন এলাকায় বিভিন্ন হোটেলে ম্যানেজারের সঙ্গে যোগসাজশে ট্যুরিস্টদের ফাঁদে ফেলে ব্ল্যাকমেইল করত। অন্তত আটটি হোটেলে এ ধরনের অপকর্ম করত বলে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়াও কক্সবাজারে আধিপত্য বিস্তারসহ বিভিন্ন রকম জবরদখল ও অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত রয়েছে সে। পর্যটন এলাকার সুগন্ধা নামক স্থানে ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট জোর করে কম টাকা দিয়ে ভাড়া নিয়ে দ্বিগুণ ও তিনগুণ ভাড়া সংগ্রহ করে মূল মালিকদের বঞ্চিত করে থাকে আশিকুল। সে বিভিন্ন ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি দখল করে ও চাঁদা দাবি করে থাকে। তার চক্রের সদস্যরা রাত্রিকালীন সময়ে সি-বিচে আসা ট্যুরিস্টদের হেনস্তা, মোবাইল ছিনতাই, ফাঁদে ফেলা ও নিয়মিত ইভটিজিং করত। পাশাপাশি হোটেল-মোটেল জোনে বিভিন্ন ট্যুরিস্টদের সুযোগ বুঝে ফাঁদে ফেলে ব্ল্যাকমেইল করে টাকা আদায় করত।
আশিকের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় আছে কি না সাংবাদিকদের এ প্রশ্নের জবাবে খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আশিকুলের সরাসরি কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়নি।’
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আশিকুল স্বীকার করেছে ইতিপূর্বে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক সদস্যকে সুযোগ বুঝে ফাঁদে ফেলে তাকে ব্ল্যাকমেইল করেছে। তার হাত থেকে কেউই রেহাই পায়নি।
অন্য এক প্রশ্নের উত্তরে কমান্ডার মঈন বলেন, ‘বিভিন্ন বিষয়ে নারীর চরিত্র হননের বিষয় এসেছে। নারীর প্রতি যথাযথ সম্মান রেখে আমরা কাজ করার চেষ্টা করি। বিভিন্ন সময় ভিকটিম ব্লেমিং গেম আমরা দেখেছি। আমরা মনে করি এ বিষয়গুলো জনসম্মুখে বলার মতো বিষয় নয়।’
গত ২২ ডিসেম্বর রাতে কক্সবাজারে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন এক নারী। এদিন রাত ২টার দিকে ‘জিয়া গেস্ট ইন হোটেল’ থেকে ওই নারীকে উদ্ধার করে র্যাব। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী নারীর স্বামী বাদী হয়ে ২৩ ডিসেম্বর আশিকুল ইসলাম আশিক, ইসরাফিল হুদা জয়, রিয়াজ উদ্দিন ছোটন ও বাবুর নাম উল্লেখসহ আরও দুই-তিনজনকে অজ্ঞাত আসামি করে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, ২২ ডিসেম্বর (বুধবার) বিকেলে সৈকতের লাবণী পয়েন্টে এক মার্কেটে ভিড়ের মধ্যে অপরিচিত এক যুবকের সঙ্গে তার স্বামীর ধাক্কা লাগলে কথাকাটাকাটি হয়। পরে সন্ধ্যার দিকে পর্যটন গলফ মাঠের সামনে থেকে তার শিশুসন্তান ও স্বামীকে অটোরিকশায় করে তুলে নিয়ে যায় কয়েকজন যুবক। আর তিন যুবক আরেকটি অটোরিকশায় করে ওই নারীকে তুলে নিয়ে গিয়ে গলফ মাঠের পেছনে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণ করে। ওই তিন যুবক তাকে পরে নিয়ে যায় জিয়া গেস্ট ইন হোটেলে। তৃতীয় তলার একটি কক্ষে আটকে রেখে তাকে আরেক দফা ধর্ষণ করা হয়। ঘটনা কাউকে জানালে সন্তান ও স্বামীকে ‘হত্যা করা হবে’ বলে হুমকি দিয়ে বাইরে থেকে রুম আটকে চলে যায় ওই তিন যুবক। পরে ওই নারীর স্বামীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অভিযান চালিয়ে জিয়া গেস্ট ইন হোটেল থেকে ওই নারীকে উদ্ধার করে র্যাব।
কক্সবাজারে গ্রেপ্তার ৩ আসামি রিমান্ডে : সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মামলায় গ্রেপ্তার তিনজনের দুদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন কক্সবাজারের মুখ্য বিচারিক হাকিম আলমগীর মোহাম্মদ ফারুকী। গতকাল বিকেল পৌনে ৫টার দিকে তিনি এ আদেশ দেন। এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ট্যুরিস্ট পুলিশের কক্সবাজার জোনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মহিউদ্দিন।
মোহাম্মদ মহিউদ্দিন জানান, প্রত্যেকের পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছিল। রিমান্ডপ্রাপ্তরা হলো কক্সবাজার শহরের দক্ষিণ বাহারছড়া এলাকার রেজাউল করিম শাহাবুদ্দিন (২৫), চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারার উলুবনিয়া এলাকার মামুনুর রশীদ (২৮) ও কক্সবাজার শহরের পশ্চিম বাহারছড়া এলাকার মেহেদী হাসান (২১)। এ নিয়ে এ মামলায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হলো।
ভয়েস/আআ/সূত্র: দেশরূপান্ত