শনিবার, ০৯ মে ২০২৬, ০৪:২৯ অপরাহ্ন
মুফতি উবায়দুল হক খান:
মহান আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন সর্বোত্তম রূপে। তাকে দিয়েছেন জ্ঞান-বুদ্ধি, বিবেক ও চিন্তাশক্তি। কিন্তু একা এই জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে মানুষ তার স্রষ্টাকে চিনতে পারে না, ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য নির্ধারণ করতে পারে না, জীবনের উদ্দেশ্য ও করণীয় নির্ধারণেও বিভ্রান্ত হয়। তাই আল্লাহতায়ালা মানবজাতির পথপ্রদর্শক হিসেবে যুগে যুগে প্রেরণ করেছেন অসংখ্য নবী-রাসুল। তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত ওহির বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন, আদর্শরূপে কাজ করেছেন এবং সমাজে সত্য, ন্যায় ও মানবতার আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন। নবী-রাসুলের দায়িত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণী উল্লেখ করা হলো।
আল্লাহর বার্তা পৌঁছে দেওয়া : নবী-রাসুলদের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব ছিল আল্লাহর ওহি ও বার্তা মানবজাতির কাছে পৌঁছে দেওয়া। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘রাসুলের দায়িত্ব কেবল পরিষ্কারভাবে পৌঁছে দেওয়া।’ (সুরা নাহল ৩৫)
আল্লাহতায়ালা তার নবী ও রাসুলদের মাধ্যমে মানুষদের জানিয়ে দেন কী তাদের কর্তব্য, কী নিষিদ্ধ, কী করলে জান্নাত আর কী করলে জাহান্নাম। তারা কোনো কথাই নিজেদের পক্ষ থেকে বলেন না, বরং আল্লাহর নির্দেশ অনুসারেই কথা বলেন। নবীজি হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তিনি নিজের মনগড়া কথা বলেন না। এটি তো ওহি, যা তার প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়।’ (সুরা নাজম ৩-৪) অতএব, নবী-রাসুলরা আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে মানবজাতির কাছে সত্য বার্তা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন।
তাওহিদের দাওয়াত প্রদান : নবী-রাসুলদের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব ছিল আল্লাহর একত্ব ও সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করা এবং মানুষকে শিরক, কুফর ও মূর্তিপূজা থেকে বিরত করা। আল্লাহ বলেন, ‘আমি প্রত্যেক জাতির মধ্যে একজন রাসুল পাঠিয়েছি এই বলে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাগুত (সীমা লঙ্ঘন) থেকে দূরে থাকো।’ (সুরা নাহল ৩৬)
হজরত নুহ (আ.) তার জাতিকে শত শত বছর ধরে আহ্বান করেছেন, ‘হে আমার জাতি! আল্লাহর ইবাদত করো, তোমাদের তার ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই।’ একই আহ্বান করেছেন হুদ, সালেহ, শুয়াইব, মুসা, ঈসা ও শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.)। তারা মানুষের মন থেকে সব ভ্রান্ত উপাস্যকে সরিয়ে একমাত্র আল্লাহর আনুগত্যে ফিরিয়ে এনেছেন।
হেদায়েত ও জীবনব্যবস্থা শিক্ষা দেওয়া : মানুষ কেবল আল্লাহকে চিনলেই পরিপূর্ণ হয় না, সে জানতে চায়, কীভাবে জীবনযাপন করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন। তাই নবী-রাসুলরা মানুষকে আল্লাহ প্রদত্ত জীবনব্যবস্থা শিক্ষা দিয়েছেন। তারা জানিয়ে দিয়েছেন, কীভাবে নামাজ পড়তে হয়, রোজা রাখতে হয়, লেনদেন করতে হয়, পরিবার গড়তে হয় এবং সমাজে ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে হয়। আল্লাহ বলেন, ‘আমি তোমার প্রতি কিতাব নাজিল করেছি, যাতে তুমি মানুষের কাছে ব্যাখ্যা করে দাও, যা তাদের প্রতি নাজিল করা হয়েছে।’ (সুরা নাহল ৪৪) অর্থাৎ নবীরা শুধু বার্তা বহন করেননি, বরং ওহির ব্যাখ্যা, বাস্তব প্রয়োগ এবং শিক্ষাদান করেছেন। তারা ছিলেন শিক্ষক ও সমাজ সংস্কারক।
সতর্ক করা ও সুসংবাদ দেওয়া : নবী-রাসুলদের আরেকটি দায়িত্ব ছিল মানুষকে সতর্ক করা ও সুসংবাদ প্রদান করা। আল্লাহ বলেন, ‘আমি তোমাকে প্রেরণ করেছি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে।’ (সুরা ফাতির ২৪) তারা মানুষকে সতর্ক করেছেন আল্লাহর শাস্তি ও জাহান্নামের ভয়াবহতা থেকে, আবার সুসংবাদ দিয়েছেন জান্নাত ও আল্লাহর রহমতের। এভাবে তারা ভীতি ও আশা দুই শক্তির মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টি করেছেন। কেউ যেন অহংকারে মত্ত না হয়, আবার কেউ যেন হতাশ না হয়।
ন্যায়বিচার ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা : নবী-রাসুলদের দায়িত্ব কেবল আত্মিক বা আধ্যাত্মিক দিকেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তারা সমাজে ন্যায়বিচার, শান্তি ও মানবতার ভিত্তি স্থাপন করেছেন। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আমি রাসুলদের সুস্পষ্ট প্রমাণসহ পাঠিয়েছি এবং তাদের সঙ্গে নাজিল করেছি কিতাব ও (ন্যায়ের) মানদণ্ড, যাতে মানুষ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে।’ (সুরা হাদিদ ২৫)
অতএব, নবীরা ছিলেন সমাজ সংস্কারক। তারা শোষণ, দুর্নীতি, জুলুম ও অবিচারের বিরুদ্ধে লড়েছেন। হজরত মুসা (আ.) ফেরাউনের অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। মুহাম্মদ (সা.) মক্কার অন্যায়-অবিচার দূর করে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছেন।
আদর্শ : নবী-রাসুলরা কেবল মুখে দাওয়াত দেননি, বরং নিজের জীবনে সেই বার্তা বাস্তবায়ন করেছেন। তাদের জীবনই মানবতার জন্য আদর্শ। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের জীবনে রয়েছে উত্তম আদর্শ, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের আশা রাখে।’ (সুরা আহজাব ২১)
নবীরা ছিলেন সত্যবাদী, আমানতদার, ধৈর্যশীল ও দয়ালু। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘আমি উত্তম চরিত্রকে পরিপূর্ণ করতে প্রেরিত হয়েছি।’ (মুসনাদ আহমদ) তার প্রতিটি আচরণ, সিদ্ধান্ত ও কর্ম ছিল দিকনির্দেশনামূলক, যা মানুষকে দেখিয়েছে, কীভাবে বাস্তব জীবনে আল্লাহর আদেশ অনুসরণ করতে হয়।
শয়তনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম : মানুষের চিরশত্রু শয়তান সর্বদা চায় মানুষকে বিভ্রান্ত করতে। নবী-রাসুলদের অন্যতম দায়িত্ব ছিল এই শয়তানি প্ররোচনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা এবং মানুষকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা। তারা মানুষকে বুঝিয়েছেন, এই দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী, আর পরকালে আছে জবাবদিহি। তারা শিখিয়েছেন আত্মসংযম, পরহেজগারি ও তাকওয়া, যা মানুষকে শয়তানের কবল থেকে রক্ষা করে।
মানুষের মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব স্থাপন : নবীরা মানুষের মধ্যে বিভেদ, ঘৃণা ও শ্রেণিবৈষম্য দূর করেছেন। তারা ঘোষণা করেছেন, সব মানুষ আদম ও হাওয়ার সন্তান, কোনো জাতি বা বর্ণে শ্রেষ্ঠত্ব নেই, শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তাকওয়ায়। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘কোনো আরবের ওপর অনারবের, কোনো শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, যদি না তা তাকওয়ার কারণে হয়।’ (মুসনাদ আহমদ) তারা জাতি, ধর্ম, ভাষা ও বর্ণের ঊর্ধ্বে এক মানব পরিবার গড়ার আহ্বান করেছেন, যা পরবর্তী সময় ইসলামের মাধ্যমে বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বে রূপ নেয়।
আল্লাহর বিধান কার্যকর করা : নবী-রাসুলদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল আল্লাহর বিধান বাস্তবায়ন করা। তারা শুধু তত্ত্বগত শিক্ষা দেননি, বরং বাস্তবে আল্লাহর আইন অনুযায়ী সমাজ পরিচালনা করেছেন। নবী করিম (সা.) মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে দেখিয়েছেন কীভাবে কোরআনের নীতি বাস্তব জীবনে কার্যকর হয়। তার শাসনে বিচার, শিক্ষা, অর্থনীতি ও রাজনীতি সবক্ষেত্রেই ছিল আল্লাহর হুকুমের আধিপত্য।
উম্মতের জন্য দোয়া ও করুণা প্রদর্শন : নবী-রাসুলরা তাদের উম্মতের প্রতি ছিলেন অতুলনীয় দয়ালু ও সহানুভূতিশীল। তারা দিনরাত আল্লাহর কাছে উম্মতের জন্য দোয়া করেছেন, তাদের জন্য কেঁদেছেন, কষ্ট সহ্য করেছেন। কোরআনে নবী করিম (সা.) সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যেই এসেছে এক রাসুল, তোমাদের কষ্ট তাকে কষ্ট দেয়। তিনি তোমাদের জন্য কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি পরম দয়ালু ও দয়ার্দ্র।’ (সুরা তওবা ১২৮) এই ভালোবাসা ও করুণাই তাকে মানবতার সর্বোচ্চ শিক্ষক ও দিকনির্দেশক করে তুলেছে।
নবুয়তের ধারার পূর্ণতা : নবী মুহাম্মদ (সা.) হলেন শেষ নবী। তারপর আর কোনো নবী বা রাসুল আসবেন না। আল্লাহ বলেন, ‘মুহাম্মদ তোমাদের মধ্যে কোনো পুরুষের পিতা নন, বরং তিনি আল্লাহর রাসুল এবং সর্বশেষ নবী।’ (সুরা আহজব ৪০) তার দায়িত্ব ছিল পূর্ববর্তী সব নবী-রাসুলের দাওয়াতকে পূর্ণতা দেওয়া এবং মানবজাতির জন্য পরিপূর্ণ জীবনবিধান প্রতিষ্ঠা করা। কোরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমে এই দিকনির্দেশ আজও অক্ষুন্ন রয়েছে।
তাদের ত্যাগ, ধৈর্য ও আহ্বান মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম উদাহরণ। মানুষ যদি নবী-রাসুলদের শিক্ষা ও আদর্শ অনুসরণ করে, তবে পৃথিবী পরিণত হবে শান্তি, ন্যায় ও মানবতার স্বর্গভূমিতে আর পরকালে লাভ করবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাতের চিরস্থায়ী সুখ।
লেখক : মুহাদ্দিস ও শিক্ষা সচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর
ভয়েস/আআ/সূত্র: দেশরূপান্তর।