রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২৭ অপরাহ্ন
আবদুল আজিজ:
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক বাহিনীর নিধনযজ্ঞের মুখে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট শুরু হওয়া রোহিঙ্গা ঢল এবার নয় বছর পূর্ণ করল। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের নানা প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও গত নয় বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও নিরাপদে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। উল্টো রাখাইনে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সংঘাত তীব্র হওয়ায় গত দেড়-দুই বছরে নতুন করে দেড় লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে। এখন কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয় শিবিরে বসবাস করছে ১৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গা।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানের মুখে সাড়ে সাত থেকে দশ লাখ রোহিঙ্গা সমদ্র ও স্থলপথে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বনাঞ্চলে আশ্রয় নেয়। জাতিসংঘ এই দমন-পীড়নকে জাতিগত নিধনের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন বলে বর্ণনা করেছিল। এর আগেও ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালে ছোট আকারে রোহিঙ্গা ঢল বাংলাদেশে এসেছিল, কিন্তু ২০১৭ সালের ঢেউ ছিল সবচেয়ে বড় ও দ্রুততম।
ক্যাম্পের বর্তমান চিত্র:
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বর্তমানে ১১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৫২ রোহিঙ্গা বসবাস করছে। এছাড়াও ভাসানচরের আশ্রয়ন প্রকল্পে অবস্থান করছে ৩৩ হাজার ৮১৯ জন রোহিঙ্গা। যা মোট নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখ ১৭১ জন রোহিঙ্গা। স্থানীয় প্রশাসন ও বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার তথ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির চলমান গৃহযুদ্ধের কারণে নতুন অনুপ্রবেশকারীসহ অনিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১৪ লাখ ছাড়িয়ে গেছে।
৯ বছরে কী বদলেছে?
রোহিঙ্গাদের জীবনযাত্রায় তেমন কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। বাঁশ ও ত্রিপলের ছোট ছোট ঘরে গাদাগাদি করে বসবাস, সীমিত কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সংকট, খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়া এবং নিরাপত্তাহীনতা তাদের দৈনন্দিন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় অনেক পরিবার আগের তুলনায় আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। একই সঙ্গে ক্যাম্পে অপরাধ, মাদক ও মানবপাচারের ঝুঁকিও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
রাখাইনের সংঘাত ও নতুন অনুপ্রবেশ:
২০২৪ সাল থেকে রাখাইনে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর নতুন করে বাংলাদেশে ঢোকা রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ ছাড়িয়েছে। ফলে আগে থেকেই জনাকীর্ণ শিবিরগুলোতে চাপ আরও বেড়েছে। অনেকে অনানুষ্ঠানিক ও গোপন পথ ধরে সীমান্ত পার হয়েছে। পার হয়ে আসা সব রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে শিবিরগুলোতে। যা আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
ক্যাম্পে বাড়ছে অস্ত্র, মাদক ও সংঘবদ্ধ অপরাধ:
দীর্ঘ নয় বছরে আশ্রয় শিবিরগুলোয় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও মাদক চোরাচালানকে কেন্দ্রকরে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। আরাকান স্যালভেশন আর্মি (আরসা) ও আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) মতো গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষে সাধারণ রোহিঙ্গারা যেমন আতঙ্কে থাকেন, তেমনি শিবিরে দায়িত্বরত দেশি-বিদেশি ত্রাণকর্মীরাও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত ক্যাম্পগুলোতে তিন শতাধিক রোহিঙ্গা খুন হয়েছে, আর চলতি বছরের প্রথম ৮ মাসেই হত্যা, মাদক, অপহরণ ও ধর্ষণসহ বিভিন্ন অভিযোগে আড়াইশরও বেশি মামলা হয়েছে। ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথের মতো মাদকদ্রব্য, বিদেশী রাইফেল এবং ওয়ান শুটারগানের মতো দেশি অস্ত্র নিয়মিতই উদ্ধার হচ্ছে ক্যাম্প এলাকা থেকে।
তহবিল সংকট ও রেশন কাটছাঁট:
আন্তর্জাতিক অনুদান ক্রমাগত কমতে থাকায় জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডাব্লিউএফপি) রোহিঙ্গাদের মাথাপিছু মাসিক খাদ্য বরাদ্দ সাড়ে ১২ ডলার থেকে কমিয়ে ৬ ডলারে নামিয়ে আনে। শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয়ের কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, বরাদ্দ আরও কমলে অপুষ্টি ও মাতৃমৃত্যুর হার বাড়তে পারে, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের মধ্যে। ২০২৬ সালের জন্য জাতিসংঘ ও তার শতাধিক অংশীদার সংস্থা মিলে যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনার (জেআরপি) আওতায় প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা চেয়েছে। রোহিঙ্গারা এখন যা পাচ্ছে, সেটাই যথেষ্ট নয়। নতুন করে বরাদ্দ কমে গেলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ।
প্রত্যাবাসন: প্রতিশ্রুতি অনেক, নেই অগ্রগতি:
গত নয় বছরে একাধিকবার দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও পাইলট তালিকা তৈরি হলেও বাস্তবে একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো যায়নি। ২০২৫ সালের মার্চে কক্সবাজার সফরে অন্তবর্তী সরকারের তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস প্রত্যাবাসন নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করলেও দেড় বছর পরও তার বাস্তবায়ন হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাখাইনে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত না হলে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়।
৩ লাখ ৯ হাজারের তালিকায় আশা নাকি নতুন অনিশ্চয়তা?
বাংলাদেশ কয়েক দফায় মোট ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন রোহিঙ্গার তথ্য মিয়ানমারের কাছে পাঠায়। মিয়ানমার জানিয়েছে, এর মধ্যে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। যাচাই হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। অপরদিকে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি এবং ৪ হাজার ২৪১ জনকে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করেছে দেশটি। তবে এই যাচাইয়ের পরও প্রত্যাবাসনের নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করা হয়নি। বরং মিয়ানমার স্পষ্টভাবে বলেছে, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে ফেরত নেওয়া হবে না। ফলে যাচাইকৃত তালিকাও আপাতত কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকছে।
ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের মধ্যে হতাশা:
ক্যাম্পে থাকা অনেক রোহিঙ্গার মতে, গত নয় বছরে একাধিকবার প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে কেউ নিরাপদভাবে নিজ বাড়িতে ফিরতে পারেনি। তাদের প্রধান দাবি মিয়ানমারের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি, নিরাপত্তা, চলাচলের স্বাধীনতা এবং নিজস্ব গ্রাম-ভিটায় ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তা। রোহিঙ্গাদের ভাষ্য, শুধু নামের তালিকা প্রকাশ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নাগরিক অধিকার নিশ্চিত না করে এবং নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি না করে প্রত্যাবাসন বাস্তবায়ন হবে না।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ‘আরকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসে’র সভাপতি মোহাম্মদ জুবাইর বলেছেন- “অনেকবার শুনেছি তালিকা হয়েছে, যাচাই হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ নিরাপদে নিজের গ্রামে ফিরতে পারেনি। শুধু তালিকা দিয় আমাদের আশা বাড়িয়ে আবার হতাশ করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের দেয়া ৩ লাখ তালিকা হাস্যকর ও নাটক বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।”
উখিয়ার কুতুপালং ৪নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নূর বেগম বলেন- “আমার পরিবারের নাম তালিকায় আছে কি না সেটাও নিশ্চিত নই। নাম থাকলেও যদি ফেরার তারিখ না থাকে, তাহলে এই তালিকার মূল্য আমাদের কাছে খুব কম। আমরা মর্যাদা নিয়ে নিজের দেশে ফিরতে চাই, এর আগে নয়।”
উখিয়ার বালুখালী ২নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ সালাম বলেন-“নয় বছর ধরে আমরা অপেক্ষা করছি। এখন ৩ লাখ ৯ হাজার মানুষের তালিকার কথা শুনছি। কিন্তু, রাখাইনে নিরাপত্তা না থাকলে কাগজের তালিকা দিয়ে তো জীবন বদলাবে না।”
সাম্প্রতিক আলোচনা: আন্তর্জাতিক চাপ ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দাবি:
রোহিঙ্গা সংকটের নয় বছর পূর্তি উপলক্ষে ঢাকায় ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে এবং মিয়ানমারের ওপর অর্থবহ চাপ তৈরির পাশাপাশি তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, সরকার এই সংকটের সমাধানকে পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে নিয়েছে। অনুষ্ঠানে মানবাধিকারকর্মীরা মানবিক সহায়তার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা কমাতে রোহিঙ্গাদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা ও জীবিকার সুযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দেন। এতে আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা তহবিল কমে আসা এবং বৈশ্বিক মনোযোগ অন্য সংকটের দিকে সরে যাওয়ায় এখনই সংকট মোকাবিলায় নতুন ও সমন্বিত কৌশল দরকার বলে মনে কনে।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব:
দীর্ঘ নয় বছরে কক্সবাজারের স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবেশ ও শ্রমবাজারে রোহিঙ্গা উপস্থিতির প্রভাব ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গারা নাগরিক না হওয়ায় অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে তাদের প্রবেশ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। খাদ্য সহায়তা আরও সীমিত হলে শিবির থেকে বেরিয়ে স্থানীয়দের জীবিকার উৎসে ভাগ বসানোর প্রবণতাও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।এ কারণে সমস্যা সমাধানে সমন্বিত নীতিগত উদ্যোগের তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম. গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন-‘সন্ধ্যার পর গোলাগুলি ও অপহরণের আশঙ্কায় অনেকে ঘর থেকে বের হতে চান না, ব্যবসায়ীরা আগেভাগেই দোকান বন্ধ করে ফেলেন। মাদক ও মানবপাচারের নেটওয়ার্ক ভাঙতে না পারলে পরিস্থিতি কক্সবাজারের সার্বিক আইনশৃঙ্খলার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়াতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করলেও ঘনবসতিপূর্ণ ও জটিল ভূ-প্রকৃতির কারণে সংঘবদ্ধ অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না।
পরিবেশ ও বনভূমির ওপর প্রভাব:
গত নয় বছরে উখিয়া-টেকনাফে বসতি নির্মাণ ও জ্বালানি কাঠ সংগ্রহের কারণে প্রায় ৮ হাজার একর বনভূমি ধ্বংস হয়ে গেছে, যার বড় অংশই ধ্বংস হয় প্রথম বছরেই। পাহাড় কেটে ও গাছ সাফ করে গড়ে তোলা হয়েছে একের পর এক শিবির, যা বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলও ধ্বংস করেছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন হিসেবে স্বীকৃত টেকনাফ উপদ্বীপের উপকূল, সেন্ট মার্টিন ও সোনাদিয়া দ্বীপের প্রতিবেশও এখন হুমকির মুখে। এ ছাড়া ক্যাম্পের বর্জ্যে স্থানীয়দের প্রায় ৩০০ একর কৃষিজমি চাষের অযোগ্য হয়ে পড়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কক্সবাজারের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে।
পরিবেশবাদি সংগঠন গ্রীণ এনভায়রনমেন্ট মুভমেন্ট টেকনাফ উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন বলেন-“দীর্ঘমেয়াদে এ সংকট শুধু মানবিক নয়, এটি পরিবেশ, নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপরও বড় চাপ সৃষ্টি করছে। এক সাথে বিপুল সংখ্যক মানুষের বসবাসের কারণে উখিয়া ও টেকনাফের বনাঞ্চলের বড় অংশ উজাড় হয়েছে। ক্যাম্প নির্মাণ, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ এবং পাহাড় কেটে বসতি গড়ে তোলার ফলে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। কমে গেছে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল, বাড়ছে ভূমিধস ও পরিবেশগত ঝুঁকি।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ.এন.এম. সাজেদুর রহমান বলেন- “রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন যত দীর্ঘ হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপহরণ বাণিজ্য ও ইয়াবাসহ মাদক পাচার, অস্ত্র, চাঁদাবাজি, মানবপাচার এবং ক্যাম্পভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতায় উদ্বেগ বাড়ছে। এসব অপরাধ দমনে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।”
কক্সবাজারে শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো: মিজানুর রহমান বলেন- “রোহিঙ্গা প্রত্যাসন শুরু করা যায়নি কারণ, যেখান থেকে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসেছে সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি উল্লেখ করে কক্সবাজারের ‘আরআরআরসি’ কমিশনার জানালেন-রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান হলো স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। নতুন তালিকা যাচাই প্রক্রিয়ার একটি অংশ, তবে মিয়ানমারে অনুকূল পরিবেশ তৈরি না হলে প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। আমরা আশা করছি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতায় দ্রুত টেকসই প্রত্যাবাসন শুরু হবে।”
সামনের পথ:
নয় বছর পরও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু না হওয়া রোহিঙ্গা সংকটকে বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকটে পরিণত করেছে। বিশেষজ্ঞ ও কূটনীতিকরা বলছেন, রাখাইনে স্থিতিশীলতা ফেরানো, মিয়ানমারের ওপর কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ বজায় রাখা এবং তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের সুযোগ সম্প্রসারণ — এই তিনটি পথ একসঙ্গে এগোলেই কেবল সংকট থেকে টেকসই উত্তরণ সম্ভব। ততদিন কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং শিক্ষা ও জীবিকার সুযোগ বাড়ানোই হয়ে উঠছে সবচেয়ে জরুরি অগ্রাধিকার।
নয় বছরে বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছে প্রায় ১৪ লাখ রোহিঙ্গাকে। প্রত্যাবাসনের জন্য লাখ লাখ মানুষের তালিকা প্রস্তুত হলেও বাস্তবে একজনও নিজ দেশে ফিরতে পারেননি। ফলে রোহিঙ্গা সংকট এখন শুধু মানবিক নয়, বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জেও পরিণত হয়েছে।
ভয়েস/আআ