রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৫১ অপরাহ্ন

দৃষ্টি দিন:
সম্মানিত পাঠক, আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। প্রতিমুহূর্তের সংবাদ জানতে ভিজিট করুন -www.coxsbazarvoice.com, আর নতুন নতুন ভিডিও পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল Cox's Bazar Voice. ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন এবং কমেন্ট করুন। ধন্যবাদ।
শিরোনাম :

আজ বিশ্ব পর্যটন দিবস: কক্সবাজার আসলেই বাজার, সমুদ্রের কিছু নেই!

কক্সবাজার আসলেই বাজার, সমুদ্রে কিছু নেই

আবদুল আজিজ:
বিশ্ব পর্যটন দিবস আজ। অপার সম্ভাবনাময় দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজার দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত থাকলেও অবকাঠামোগত উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সেবার মান উন্নয়ন হয়নি। অথচ প্রতিবছর লাখো দেশি-বিদেশি পর্যটক এখানে ছুটে আসেন সমুদ্রের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্যটকদের একটি অভিযোগ বারবার সামনে আসছে কক্সবাজারে প্রকৃতির চেয়ে বাণিজ্যের উপস্থিতিই যেন বেশি চোখে পড়ে। বিশ্ব পর্যটন দিবসে তাই নতুন করে প্রশ্ন উঠছে, কক্সবাজার কি ধীরে ধীরে সমুদ্রের শহর থেকে বাজারের নগরীতে পরিণত হচ্ছে?

কক্সবাজার সৈকতের লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে গেলেই দেখা যায় ভিন্ন এক চিত্র। সমুদ্রের ঢেউয়ের পাশাপাশি চোখে পড়ে সারি সারি অস্থায়ী দোকান, ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা, বিচ বাইক, ঘোড়া, ফটোগ্রাফার এবং নানা ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম। অনেক পর্যটকের অভিযোগ, কিছুক্ষণ নিরিবিলি বসে সমুদ্র উপভোগ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

শুধু সৈকত নয়, শহরের সড়কেও একই অবস্থা। পর্যটন মৌসুমে কলাতলী, সুগন্ধা ও ঝাউতলা এলাকায় দীর্ঘ যানজট নিত্যদিনের ঘটনা। অপরিকল্পিত পার্কিং, ফুটপাত দখল ও অতিরিক্ত যানবাহনের কারণে পর্যটকদের ভোগান্তি বাড়ছে। অনেকেই মনে করেন, পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে নগর ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়নি।

রাজধানী ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা লাভলী আক্তার নামের এক পর্যটক বলেন, “সৈকতে নামার কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিভিন্ন পণ্য বিক্রেতা ঘিরে ধরেন। সমুদ্র দেখতে এসেছি, কিন্তু, বারবার ব্যবসায়িক প্রস্তাাব শুনতে হচ্ছে।”

একই কথার সূত্র ধরে রাজশাহী থেকে আসা পর্যটক দম্পতি সোহেল মাজহার ও শিউলি কক্সবাজার ভয়েসকে বলেন-‘সমুদ্রসৈকত দেখতে লাখো পর্যটক কক্সবাজার ছুটে আসে। কিন্তু, যেভাবে মানুষ কক্সবাজারে আসছে, সেভাবে সেবার মান বাড়েনি। সবখানে গলাকাটা ব্যবসা। সংশ্লিষ্টদের মনোযোগ দেয়া দরকার।”

কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সাংবাদিক পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা দীপু বলেন- ‘কক্সবাজারের প্রধান সম্পদ সমুদ্র, বালুচর ও প্রাকৃতিক পরিবেশ। কিন্তু অপরিকল্পিত বাণিজ্য, শব্দদূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য এবং অনিয়ন্ত্রিত কার্যক্রম সৈকতের পরিবেশকে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। দিন শেষে সৈকতের বিভিন্ন স্থানে প্লাস্টিক বোতল, খাবারের মোড়ক ও অন্যান্য বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা যায়। এসব বর্জ্য শুধু সৌন্দর্য নষ্ট করে না, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে পারে।’

তবে ব্যবসায়ীদের যুক্তিও উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কক্সবাজারের বিচ বাংলা ট্যুরিজমের ম্যানেজার মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ কক্সবাজার ভয়েসকে বলেন- ‘পর্যটনকে ঘিরে হাজার হাজার মানুষের জীবিকা গড়ে উঠেছে। হকার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ফটোগ্রাফার, পরিবহন শ্রমিক, হোটেল-রেস্তোরাঁ কর্মচারীসব মিলিয়ে একটি বড় অর্থনৈতিক চক্র কক্সবাজারকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। তাই ব্যবসা বন্ধ নয়, বরং সুশৃঙ্খল ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনাই হতে পারে কার্যকর সমাধান।’

পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বের জনপ্রিয় সমুদ্রসৈকত গুলোতে বাণিজ্যিক কার্যক্রমের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা থাকে। একই সঙ্গে পর্যটকদের জন্য থাকে শান্ত পরিবেশ, পরিচ্ছন্ন সৈকত এবং উন্নত নাগরিক সুবিধা। কক্সবাজারেও সৈকত ব্যবস্থাপনায় আধুনিক পরিকল্পনা, হকারদের জন্য নির্দিষ্ট জোন, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত পার্কিং এবং যানজট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ জুরুরী।

কক্সবাজার কলাতলী-মেরিন ড্রাইভরোড হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মৌখিম খান কক্সবাজার ভয়েসকে বলেন-‘শুধু মৌসুম নয়, সারা বছর পর্যটক আনতে আন্তর্জাতিক মানের আয়োজন ও উন্নত সুযোগ-সুবিধা দরকার। সরকারীভাবে প্রতিবছর মেলা সহ নানা অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করলে বাড়বে পর্যটক। বাড়াতে হবে পর্যটক সেবার মানোন্নয়ন।”

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটি সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন-‘কক্সবাজারের সৌন্দর্য শুধু পর্যটকদের জন্য নয়, দেশের অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তাই, উন্নয়ন ও বাণিজ্যের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সমুদ্রসৈকতের উন্মুক্ততা, নান্দনিকতা ও স্বাভাবিক পরিবেশ রক্ষা করা না গেলে ভবিষ্যতে পর্যটকদের আগ্রহেও প্রভাব পড়তে পারে’।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো: আবদুল মান্নান কক্সবাজার ভয়েসকে বলেন- ‘সরকার ইতিমধ্যে টেকসই পর্যটনের উন্নয়ন গড়েত, পর্যটকদের নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে পরিকল্পনা গ্রহন করা হয়েছে। এজন্য একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরী করা হচ্ছে, যাতে বিদেশী পর্যটকদের আকৃষ্ট করা যায়। আগামী মাসে প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর উদ্বোধন করার কথা রয়েছে।

মো: আবদুল মান্নান আরো বলেন- ‘সৈকতের শৃঙ্খলা ফিরিয় আনা, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পর্যটন উন্নয়ন পরিকল্পনার বিষয়ে ও কাজ চলছে।’

এদিকে, বিশ^ পর্যটন দিবস উপলক্ষ্যে কক্সবাজারে তিনদিন ব্যাপী মেলা শুরু হয়েছে। বিশ্ব পর্যটন দিবসের মূল বার্তা হলো টেকসই, পরিবেশবান্ধব ও মানুষের জন্য উপযোগী পর্যটন গড়ে তোলা। কক্সবাজারের ক্ষেত্রেও সেই দর্শনই সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। কারণ এই শহরের পরিচয় সমদ্রকে ঘিরেই। সেই সমুদ্র যদি অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্য, দখল ও বিশৃঙ্খলার আড়ালে চাপা পড়ে যায়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের সবচেয়ে বড় পর্যটন শিল্পই।

স্থানীয় সচেতন মহলের ভাষ্য-‘কক্সবাজারে ব্যবসা অবশ্যই থাকবে, কারণ পর্যটন মানেই অর্থনৈতিক কর্মকান্ড। তবে সেই ব্যবসা যেন সমুদ্রের সৌন্দর্যকে গ্রাস না করে। প্রকৃতি, পর্যটক ও জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারলেই কক্সবাজার আবারও বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় সমুদ্র পর্যটন গন্তব্য হিসেবে নিজের মর্যাদা আরও সুসংহত করতে পারবে।

বিশ্ব পর্যটন দিবসে কক্সবাজারের প্রত্যাশা একটাই পর্যটন শিল্পকে ঘিরে গড়ে উঠুক আরও পরিকল্পিত উন্নয়ন, বাড়ুক দেশি-বিদেশি পর্যটকের আগমন, আর বিশ্বের মানচিত্রে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করুক কক্সবাজারের এই সমদ্রনগরী।

ভয়েস/আআ

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023
Developed by : JM IT SOLUTION