মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬, ০৫:১৪ অপরাহ্ন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান এক মাসের সংঘাত নতুন মোড় নিয়েছে। ইরানের তেলের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র খার্গ দ্বীপে স্থল সেনা পাঠিয়ে তা দখলের হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে সামরিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই দুঃসাহসিক অভিযান মার্কিন সেনাদের জীবনকে চরম ঝুঁকিতে ফেলবে এবং এতে যুদ্ধের সমাপ্তি নাও ঘটতে পারে। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি এ খবর জানিয়েছে।
সোমবার এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে ট্রাম্প জানান, ইরানের সঙ্গে সামরিক অভিযান বন্ধের আলোচনায় ভালো অগ্রগতি হচ্ছে। তবে দ্রুত কোনও চুক্তিতে পৌঁছানো না গেলে এবং ইরান যদি হরমুজ প্রণালি খুলে না দেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র, তেলকূপ এবং খার্গ দ্বীপ গুঁড়িয়ে দেবে।
পরে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, হয়তো আমরা খার্গ দ্বীপ দখল করব, হয়তো করব না। আমাদের হাতে অনেক বিকল্প আছে। তবে এটি দখল করার অর্থ হলো আমাদের সেখানে বেশ কিছু সময় অবস্থান করতে হবে।
ইরানি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি তা উড়িয়ে দিয়ে বলেন, আমি মনে করি না তাদের কোনও প্রতিরক্ষা আছে। আমরা খুব সহজেই এটি দখল করতে পারি।
ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে ৩৩ কিলোমিটার দূরে পারস্য উপসাগরে অবস্থিত এই দ্বীপটি দেশটির অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। ইরানের উপকূলীয় এলাকা অগভীর হওয়ায় বড় তেলের ট্যাঙ্কারগুলো সেখানে ভিড়তে পারে না। ফলে দেশটির মোট তেল রফতানির ৯০ শতাংশই এই দ্বীপের টার্মিনাল দিয়ে সম্পন্ন হয়। রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক পেট্রাস কাটিনাসের মতে, খার্গ দ্বীপ ছাড়া ইরানের টিকে থাকা কঠিন কারণ এটি দেশটির অর্থনীতির প্রধান কেন্দ্র।
ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের ইরান বিশেষজ্ঞ ড্যানি সিট্রিনোভিজ মনে করেন, খার্গ দ্বীপ দখল করা যতটা কঠিন, তা ধরে রাখা তার চেয়েও বেশি কঠিন হবে। তিনি বলেন, এটি হয়তো অর্থনীতিতে আঘাত হানবে, কিন্তু ইরানকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করার মতো চূড়ান্ত কোনও আঘাত এটি নয়।
তার মতে, এই পদক্ষেপ সংঘাতকে আরও উসকে দেবে এবং ইরান ও তার প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো লোহিত সাগর থেকে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত ড্রোন ও মাইন হামলা বাড়িয়ে দিতে পারে।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির সামরিক বিশ্লেষক মাইকেল আইজেনস্টাট বলেন, স্থল সেনা পাঠানো মানসিকভাবে ইরানিদের ওপর বড় ধাক্কা হতে পারে, কিন্তু এতে মার্কিন সেনাদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়বে।
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, দ্বীপটি মূল ভূখণ্ডের খুব কাছে হওয়ায় ইরান সেখানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বৃষ্টির মতো ছুঁড়তে পারে। পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় রাডারে ধরা পড়ার আগেই ড্রোনগুলো দ্বীপে আঘাত হানার সক্ষমতা রাখে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরাসরি দ্বীপ দখল না করে সমুদ্রপথে অবরোধ তৈরি করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নিরাপদ কৌশল হতে পারে। এতে ইরানি অস্ত্রের নাগালের বাইরে থেকে তেলবাহী জাহাজগুলো জব্দ করা সম্ভব হবে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্বালানি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ক্লেটন সিগেল বলেন, খার্গ দ্বীপের অবকাঠামো ধ্বংস করা হবে আত্মঘাতী। কারণ দীর্ঘমেয়াদে ইরানের রাজস্ব আয়ের পথ বন্ধ করে দিলে সাধারণ মানুষের সমর্থন হারাবে যুক্তরাষ্ট্র।
ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে ২ হাজার ৫০০ নৌ-সেনাবাহী একটি মার্কিন জাহাজ পৌঁছেছে। এছাড়া ক্যালিফোর্নিয়া থেকে আরও ২ হাজার ৫০০ এবং ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের ১ হাজার সেনা মোতায়েনের প্রক্রিয়া চলছে। যদিও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আগে বলেছিলেন যে স্থল সেনার প্রয়োজন হবে না, তবে সোমবার তিনি সুর বদলে বলেন, প্রেসিডেন্টের হাতে অনেক বিকল্প আছে।
ভয়েস/আআ