রবিবার, ০৪ জানুয়ারী ২০২৬, ০২:১৪ পূর্বাহ্ন

দৃষ্টি দিন:
সম্মানিত পাঠক, আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। প্রতিমুহূর্তের সংবাদ জানতে ভিজিট করুন -www.coxsbazarvoice.com, আর নতুন নতুন ভিডিও পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল Cox's Bazar Voice. ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন এবং কমেন্ট করুন। ধন্যবাদ।

সন্তানের প্রতি দ্বীনি দায়িত্ব পালনে ইব্রাহিম (আ.)

মাওলানা মনিরুজ্জামান:
পরিবার গড়ে ওঠে ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও নৈতিক চর্চার ওপর। আর সেই পরিবারের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছেন বাবা। সন্তানের জীবনপথে আলোর দিশা দেন বাবা। তার চিন্তা, দোয়া, সিদ্ধান্ত ও দিকনির্দেশ সন্তানের ইমান ও চরিত্রকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ইসলাম পিতৃত্বকে কেবল ভরণপোষণের দায়িত্বে সীমাবদ্ধ রাখেনি। বরং সন্তানের বিশ্বাস, নৈতিকতা, পারিবারিক জীবন ও মানসিক ভারসাম্যের অভিভাবক হিসেবে পিতাকে দেখেছে। নবী ও রাসুলদের জীবনে এই পিতৃত্বের দায়িত্ব সর্বোচ্চ সৌন্দর্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষ করে ইব্রাহিম (আ.) ও তার পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর ঘটনা পিতৃত্বের এক অনুপম আদর্শ, যা আজও মুসলিম পরিবারকে পথ দেখায়।

সহিহ বুখারির বর্ণনায় এক দীর্ঘ হাদিসে ইব্রাহিম (আ.)-এর মাধ্যমে একজন পিতার দায়িত্ব, দূরে থেকেও সন্তানের খোঁজখবর নেওয়ার কৌশল, পারিবারিক জীবনে হেকমতপূর্ণ হস্তক্ষেপ এবং ইমানি ও নৈতিক মানদণ্ডে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনন্য দৃষ্টান্ত উপস্থাপিত হয়েছে।

হাদিসটি ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইব্রাহিম (আ.) ইসমাইলের মা (হাজেরা) ও শিশু ইসমাইলকে সঙ্গে নিয়ে কাবাঘরের নিকট এবং জমজমের ওপরে একটি বড় গাছের নিচে (বর্তমান) মসজিদের সবচেয়ে উঁচু জায়গায় তাদের রাখলেন।

তখন মক্কায় না ছিল জনমানব, না ছিল কোনো পানি। সুতরাং সেখানেই তাদের রেখে গেলেন এবং একটি থলের মধ্যে কিছু খেজুর আর একটি মশকে স্বল্প পরিমাণ পানি দিয়ে গেলেন। তারপর ইব্রাহিম (আ.) ফিরে যেতে লাগলেন। ইসমাইল (আ.)-এর বিয়ের পর ইব্রাহিম (আ.) তার রেখে যাওয়া পরিজনকে দেখার জন্য এখানে এলেন। কিন্তু এসে ইসমাইলকে পেলেন না। পরে তার স্ত্রীর কাছে তার সম্পর্কে জানতে চাইলেন। স্ত্রী বলেন, ‘তিনি আমাদের রুজির সন্ধানে বেরিয়ে গেছেন।’ আবার তিনি পুত্রবধূর কাছে তাদের জীবনযাত্রা ও অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। পুত্রবধূ বললেন, ‘আমরা অতিশয় দুর্দশা, দুরবস্থা, টানাটানি এবং ভীষণ কষ্টের মধ্যে আছি।’ তিনি ইব্রাহিম (আ.)-এর কাছে নানা অভিযোগ করলেন।

তিনি পুত্রবধূকে বললেন, ‘তোমার স্বামী বাড়ি এলে তাকে আমার সালাম জানাবে এবং বলবে, সে যেন তার ঘরের দরজার চৌকাঠ বদলে নেয়।’ এই বলে তিনি চলে গেলেন। ইসমাইল (আ.) যখন বাড়ি ফিরে এলেন, তখন তিনি ইব্রাহিম (আ.)-এর আগমন সম্পর্কে একটা কিছু ইঙ্গিত পেয়ে স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাদের কাছে কেউ কি এসেছিলেন?’ স্ত্রী বললেন, ‘হ্যাঁ, এই এই

আকৃতির একজন বয়স্ক লোক এসেছিলেন। আপনার সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞেস করছিলেন। আমি তাকে আপনার খবর দিলাম। আবার আমাকে আমাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে আমি তাকে জানালাম যে আমরা খুবই দুঃখ-কষ্ট ও অভাবে আছি।’

ইসমাইল (আ.) বললেন, ‘তিনি তোমাকে কোনো কিছু অসিয়ত করে গেছেন কী?’ স্ত্রী বললেন, ‘হ্যাঁ, তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়ে গেছেন, আপনাকে তার সালাম পৌঁছাতে এবং আরও বলেছেন, আপনি যেন আপনার দরজার চৌকাঠ বদলে ফেলেন।’

ইসমাইল (আ.) বললেন, ‘তিনি ছিলেন আমার পিতা এবং তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়ে গেছেন, যেন তোমাকে আমি তালাক দিয়ে দিই। কাজেই তুমি তোমার বাপের বাড়ি চলে যাও।’ সুতরাং ইসমাইল (আ.) তাকে তালাক দিয়ে দিলেন এবং ‘জুরহুম’ গোত্রের অন্য একটি মেয়েকে বিয়ে করলেন। অতঃপর যত দিন আল্লাহ চাইলেন ইব্রাহিম (আ.) তত দিন তাদের থেকে দূরে থাকলেন। পরে আবার দেখতে এলেন। কিন্তু ইসমাইল (আ.) সেদিনও বাড়িতে ছিলেন না। তিনি পুত্রবধূর ঘরে প্রবেশ করলেন এবং ইসমাইল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। স্ত্রী জানালেন, তিনি আমাদের খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে গেছেন।

ইব্রাহিম (আ.) জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমরা কেমন আছ?’ তিনি তার কাছে তাদের জীবনযাত্রা ও সাংসারিক অবস্থা সম্পর্কেও জানতে চাইলেন। পুত্রবধূ জবাবে বলেন, ‘আমরা ভালো অবস্থায় এবং সচ্ছলতার মধ্যে আছি।’ এ বলে তিনি আল্লাহর প্রশংসাও করলেন। ইব্রাহিম (আ.) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমাদের প্রধান খাদ্য কী?’ পুত্রবধূ জবাবে বলেন, ‘মাংস’। এরপর বলেন, ‘তোমাদের পানীয় কী?’ পুত্রবধূ বলেন, ‘পানি’। ইব্রাহিম (আ.) দোয়া করলেন, ‘হে আল্লাহ! এদের মাংস ও পানিতে বরকত দাও।’

আলাপ শেষে ইব্রাহিম (আ.) পুত্রবধূকে বললেন, ‘তোমার স্বামীকে আমার সালাম বলবে এবং তাকে আমার পক্ষ থেকে হুকুম করবে, সে যেন তার দরজার চৌকাঠ বহাল রাখে।’ অতঃপর ইসমাইল (আ.) যখন বাড়ি এসে স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমাদের কাছে কেউ এসেছিলেন কি?’ স্ত্রী বললেন, ‘হ্যাঁ, একজন সুন্দর আকৃতির বৃদ্ধ এসেছিলেন।

অতঃপর স্ত্রী তার প্রশংসা করলেন এবং বললেন, ‘তিনি আপনার সম্পর্কে জানতে চাইলেন, আমি তখন তাকে আপনার খবর বললাম। অতঃপর তিনি আমাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। আমি তাকে খবর দিলাম যে আমরা ভালোই আছি।’ স্বামী বললেন, ‘আর তিনি তোমাকে কোনো অসিয়ত করেছেন কী?’ স্ত্রী বলেন, ‘তিনি আপনাকে সালাম বলেছেন এবং আপনার দরজার চৌকাঠ অপরিবর্তিত রাখার নির্দেশ দিয়ে গেছেন।’ ইসমাইল (আ.) তার স্ত্রীকে বললেন, ‘তিনি আমার আব্বা, আর তুমি হলে চৌকাঠ। তিনি নির্দেশ দিয়ে গেছেন, আমি যেন তোমাকে স্ত্রী হিসেবে বহাল রাখি।’ (সহিহ বুখারি)

ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর আদেশে হাজেরা (আ.) ও শিশু ইসমাইল (আ.)-কে মক্কার জনমানবহীন স্থানে রেখে যান এবং খেজুর ও পানি দিয়ে যান। এতে বোঝা যায়, পিতার দায়িত্ব হলো, নিজের সাধ্যানুযায়ী ব্যবস্থা করা এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা করা।

দূরে থাকলেও সন্তানের খোঁজ নেওয়া : লেখাপড়া বা জীবিকার তাগিদে সন্তান দূরে অবস্থান করলে বা সন্তান বড় হলেও সন্তানের সার্বিক খোঁজখবর নিতে হবে। ইসমাইল (আ.) প্রাপ্তবয়স্ক ও বিবাহিত হওয়ার পরও ইব্রাহিম (আ.) বারবার মক্কায় এসে সন্তানের অবস্থা দেখেছেন। পিতার দায়িত্ব শুধু শিশুকাল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়, সন্তান বড় হলেও তার জীবনযাত্রা, ইমান ও পরিবার সম্পর্কে সচেতন থাকা দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।

সন্তানের সাংসারিক জীবনে নজর রাখা : ইব্রাহিম (আ.) সরাসরি পুত্রবধূর সঙ্গে কথা বলে সংসারের অবস্থা, ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা ও অভিযোগপ্রবণতা পর্যবেক্ষণ করেন। পিতা সন্তানের দাম্পত্য জীবনের নৈতিক মান পর্যবেক্ষণ করতে পারেন এবং প্রয়োজনে দিকনির্দেশনা দিতে পারেন।

পরামর্শ দেওয়া : ইসমাইল (আ.)-এর প্রথম স্ত্রী ছিলেন অভিযোগকারী ও অকৃতজ্ঞ। দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন কৃতজ্ঞ ও আল্লাহর প্রশংসাকারী। ইব্রাহিম (আ.) কোনো পার্থিব মানদণ্ডে নয়, বরং সবর, শোকর ও ইমানি চরিত্রের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেন। এতে বোঝা যায়, পিতার দায়িত্ব হলো সন্তানের জীবনকে দ্বীনি মূল্যবোধে পরিচালিত করা।

ইব্রাহিম (আ.) সরাসরি বলেননি, ‘তোমার স্ত্রীকে তালাক দাও, বরং বলেছেন, দরজার চৌকাঠ বদলে ফেলো বা বহাল রাখো।’ এভাবে পিতার উপদেশ হওয়া উচিত শালীন, দূরদর্শী ও হেকমতপূর্ণ। যাতে সন্তানের সম্মান ও স্বাধীনতাও বজায় থাকে।

দোয়া করা : ইব্রাহিম (আ.) দোয়া করেন, ‘হে আল্লাহ! এদের মাংস ও পানিতে বরকত দাও।’ সন্তানের জন্য দোয়া করা পিতার অন্যতম মহান দায়িত্ব, যা সন্তান ও সমাজ উভয়ের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে।

রিজিক সম্পর্কে সচেতনতা : ইব্রাহিম (আ.) প্রশ্ন করেছেন, ‘তোমরা কেমন আছ? খাদ্য কী? পানীয় কী?’ পিতা সন্তানের হালাল রিজিক, জীবনযাত্রা ও মানসিক স্বাচ্ছন্দ্য সম্পর্কে সচেতন থাকবেন।

কৃতজ্ঞতা ও অভিযোগের ভাষা পর্যবেক্ষণ : একই প্রশ্নে ইসমাইল (আ.)-এর দুই স্ত্রী দুই রকম জবাব দেন। একজন অভিযোগ করেন। অন্যজন আল্লাহর প্রশংসা করেন। খোঁজ নেওয়ার সময় কথাবার্তার ভঙ্গি ও মানসিকতা লক্ষ করাও পিতার দায়িত্ব।

একজন পিতা হলেন সন্তানের ইমান, চরিত্র, পরিবার ও ভবিষ্যতের নৈতিক অভিভাবক। পিতার দায়িত্ব শুধু ভরণপোষণ নয়, বরং দোয়া, দিকনির্দেশনা, তত্ত্বাবধান ও হেকমতপূর্ণ হস্তক্ষেপ। আর সন্তানের খোঁজখবর হবে নিয়মিত, বিচক্ষণ, দ্বীনি মানদণ্ডে এবং সম্মান ও মমতার সঙ্গে। এটাই ইব্রাহিম (আ.)-এর আদর্শ। আর এ আদর্শই সব পিতার জন্য চিরন্তন পথনির্দেশ। আর পিতার দায়িত্ব সময় ও দূরত্বে সীমাবদ্ধ নয়। সন্তান ছোট হোক বা বড়, কাছে থাকুক বা দূরে, তার সার্বিক অবস্থার প্রতি সচেতন থাকা পিতৃত্বের অপরিহার্য অংশ। দায়িত্বশীল পিতা সন্তানের জীবনে হস্তক্ষেপ করেন হেকমতের সঙ্গে এবং প্রজ্ঞা ও শালীনতার ভাষায়।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও প্রবন্ধকার

ভয়েস/আআ

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023
Developed by : JM IT SOLUTION