রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬, ০৫:০৯ অপরাহ্ন
আরাফাত চৌধুরী:
কক্সবাজারের মৎস্য আহরণ ও পর্যটন খাতে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। ইরান-ইসলাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের প্রভাবে সারাদেশের মত কক্সবাজারেও জ¦ালানী সংকট দেখা দেয়ায় এ অচলাবস্তা দেখা দিয়েছে। এতে করে প্রভাব পড়েছে জনজীবনে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কক্সবাজার জেলার বেশিরভাগ পেট্রোল পাম্প জ¦ালানী তেল সংকটের অজুহাতে বন্ধ করে রেখেছে। এতে পর্যাপ্ত পরিমাণ জ¦ালানী তেল না পেয়ে কক্সবাজার উপকূলীয় অঞ্চলের অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলার, আন্ত:সড়ক, মহাসড়ক গুলোতে চলাচলরত যানবাহন থেকে শুরু করে কমবেশী সবখাতে প্রভাব পড়েছে। পর্যাপ্ত পরিমাণ জ¦ালানী তৈল না পাওয়ার কারণে অনেক মাছ ধরার ট্রলার সাগরে যেতে পারছে না। অন্যদিকে কক্সবাজার ভ্রমনে আসা লাখো পর্যটক বহনে নিয়োজিত বিভিন্ন যানবাহন পড়েছে জ¦ালানী সংকটে। বিশেষ করে পর্যটকদের কাছে সামুদ্রিক মাছের চাহিদা থাকায় আগের মত পর্যটকদের চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। একইভাবে বেকায়দায় পড়েছে সেচ পাম্প গুলোও। পেট্রোল পাম্পগুলোতে ডিজেল নেই, ফলে ধান ও সবজি চাষিরা সেচ সরবরাহ করতে হিমছিম খাচ্ছে।
কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর মাঝিরঘাট, ৬নং জেটিঘাট এলাকায় তেলের অভাবে শত শত ট্রলার অলস বসে আছে। নদীর উপকূলে থাকা ভাসমান পেট্রোল পাম্পের অধিকাংশই জ্বালানি শূন্য হয়ে পড়ায় বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে। কোনো কোনো পাম্প গত কয়েকদিন ধরে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ফলে সাগরে যেতে না পারায় কয়েক লাখ জেলে পরিবারের আয় বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে তারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। জেলেরা মাছ ধরতে না পারায় স্থানীয় বাজারগুলোতে মাছের সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমে গেছে, যার ফলে দামও সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন- জ¦ালানী সংকটের কারণে অন্তত ৫ শতাধিক হোটেল-মোটেলগুলোতে জেনারেটর চালানো সম্ভব হচ্ছে না, যা ঈদুল ফিতরের ছুটিতে আসা পর্যটকদের ভোগান্তিতে পড়েছে। এছাড়াও রেস্তোরেন্ট গুলোতে নেই সামুদ্রিক মাছ ও পর্যটকবাহী যানগুলোতে নেই জ¦ালানী। এতে করে অনেকটা দিশেহারা এতদাঞ্চলের ব্যবসায়ীরা।
জ্বালানি তেলের অপেক্ষায় প্রহর গুণছেন কক্সবাজার শহরের খুরুশকুল এলাকার তছলিম মাঝির মালিকানাধীন এফবি মায়ের দোয়া ট্রলারের জেলে দিদারুল আলম। তিনি জানান, “আমরা তো গরিব মানুষ। পেটের দায়ে জীবনঝুঁকি নিয়েই সাগরে মাছ ধরতে যাই। সাগরে যাওয়া সহজ নয়, সেখানে অনেক ঝুঁকি থাকে। তবুও সংসারের কথা ভেবে, স্ত্রী-সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে আমাদের সাগরে যেতে হয়। কিন্তু এখন সাগরে যাওয়ার জন্য তেলের ঘাটে এসে দেখি তেল নেই, পাম্প বন্ধ। তেল না পেলে আমরা সাগরে যাব কীভাবে? আর সাগরে যেতে না পারলে সংসারই বা চালাবো কীভাবে? শুধু আমি একা নই, আমার ওপর নির্ভর করছে বাড়ির অনেক মানুষ। আমরা যদি মাছ ধরতে না পারি, আয় না হয়, তাহলে পরিবারকে কীভাবে খাওয়াবো? এখন তেলের আশায় বসে আছি। কবে তেল পাবো, কবে সাগরে যেতে পারবো-সেটাও জানি না।
বাঁকখালী নদীর চেয়ারম্যান ঘাট এলাকায় নোঙ্গর করা এফবি শাহ মজিদিয়া ট্রলারের মাঝি আব্দু শুক্কুর জানান, “আমরা তেল নেওয়ার জন্য পাম্পে এসে খোঁজ নিচ্ছি, কিন্তু এখানে তেল আসেনি। পাম্পের লোকজনও বলছে, তেল না থাকলে তারা দেবে কোথা থেকে। তেল ছাড়া তো সাগরে যাওয়া সম্ভব নয়। তেলের আশায় আমরা দুই দিন ধরে ঘাটে অপেক্ষা করছি। আমাদের ট্রলারের জন্য প্রায় দুই হাজার লিটার তেল প্রয়োজন, কিন্তু তেল না পাওয়ায় সাগরে যেতে পারছি না।”
জেলে মোহাম্মদ সেলিম জানান, “৬ নম্বর ঘাটে নদীতে নোঙর করে রাখা ট্রলারগুলোতে প্রায় ৫০০ জেলে পরিবার বেকার বসে আছি। এই ৫০০ পরিবারের আয়ের ওপর অন্তত ৫ হাজার মানুষের সংসার চলে। কিন্তু ডিজেল সংকটের কারণে গত পাঁচ দিন ধরে আমরা ট্রলারে বসে আছি, সাগরে যেতে পারছি না। ট্রলার মালিকরাও কোনো টাকা দিতে পারছেন না।”
বাঁকখালী নদীর চেয়ারম্যানঘাট এলাকার ফারিয়া ট্রেডিং পাম্পের ম্যানেজার রিয়াজ উদ্দিন জানান, “প্রায় সাত থেকে আট দিন ধরে তেলের সংকট চলছে। আমাদের পাম্পে প্রতিদিন ন্যূনতম প্রায় ৯ হাজার লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে তেল সরবরাহ একেবারেই কমে গেছে, প্রায় আসছেই না। এ কারণে যেসব মাছ ধরার ট্রলার তেল নিতে আসছে, তাদেরকে আমরা তেল দিতে পারছি না। সাধারণত একটি ট্রলার সাগরে যাওয়ার সময় অতিরিক্ত তেল মজুত করে নেয়। আগে যেসব ট্রলার মজুত থাকা তেল নিয়ে সাগরে গেছে, তারা হয়তো এই ট্রিপ শেষ করে ফিরতে পারবে। কিন্তু এরপর যদি তেলের সংকট না কাটে, তাহলে তাদের জন্য আবার সাগরে যাওয়া সম্ভব হবে না। দ্রুত সময়ের মধ্যে জ্বালানি তেল সংকট নিরসনে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন জেলা ফিশিং বোট মালিক সমিতি ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি-সাগরে মাছ শিকারে যেতে পারায় অনিশ্চিয়তার মুখে পড়েছে লাখো জেলে পরিবার।”
শুধু বাঁকখালী নদীর মাঝির ঘাট নয়, নদীর উপকূলে আছে মোট ২১টি ভাসমান পেট্রোল পাম্প। এই পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেলের সরবরাহের ওপর নির্ভর করে কক্সবাজারের কয়েক হাজার মাছ ধরার ট্রলার। কিন্তু অনেক পাম্প গত সাতদিন ধরে বন্ধ, আবার কিছু পাম্প তিনদিন ধরে চালু নেই। ফলস্বরূপ, নদীর তীরে এসে ট্রলারগুলো তেল পেতে পারছে না। এর কারণে নদীতে নোঙর করা ট্রলারের সারি দেখা যাচ্ছে, আর এসব ট্রলারে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন হাজার হাজার জেলে।
কক্সবাজার মৎস্য ব্যবসায়ী ঐক্য সমবায় সমিতি লিমিটেডের মুখপাত্র মো. আজাদুর রহমান বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে তেলের সংকট তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন উপকূলের জেলেরা। কক্সবাজারে প্রায় ৬ হাজার মাছ ধরার ট্রলার রয়েছে। কিন্তু তেলের অভাবে সেগুলো সাগরে যেতে পারছে না। গত ৭ দিন ধরে আমরা বিভিন্ন ঘাটের ২১টি ভাসমান পাম্পে খোঁজ নিয়েছি, কিন্তু কোথাও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। তেল না থাকলে ট্রলার সাগরে পাঠানোর কোনো উপায় নেই।”
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো: আবদুল মান্নান জানান, “বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের সাথে আমাদের কথা হয়েছে। যারা নিবন্ধনকৃত নৌযান আছে তদের জ¦ালানী তৈল প্রদান করা হবে। এবং যারা নিবন্ধনকৃত নয় তাদেরও সীমিত আকারে জ¦ালানী তৈল প্রদান করা হচ্ছে।”
ভয়েস/আআ