বুধবার, ২৪ Jun ২০২৬, ০৬:০৯ অপরাহ্ন
ডেভিড এম হাবফিংগার ও অ্যাডাম র্যাসগস, নিউ ইয়র্ক টাইমস
জেরুজালেমের যে পাহাড়ে আল আকসা মসজিদ, তার পদদেশে মুহাম্মদ সানদোকা ঘর বানিয়েছিলেন তার দ্বিতীয় ছেলের জন্মের আগে, সেটা ১৫ বছর হতে চললো।
কিন্তু ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ মনে করল, ওই বাড়ি না থাকলে পর্যটকদের কাছে পুরনো জেরুজালেম আরও দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠবে। তাই সানদোকা আর ছেলেরা মিলে নিজেদের ঘর নিজেরাই গুঁড়িয়ে দিতে বাধ্য হলেন।
৪২ বছর বয়সী সানদোকা পেশায় একজন মিস্ত্রি। একজন ইসরায়েলি পরিদর্শক যেদিন বাড়ি ভাঙার নোটিস দিতে এলেন, তখন তিনি কাজে।
সেই পরিদর্শক সানদোকার স্ত্রীকে বলে গেলেন, সামনে বিকল্প মাত্র দুটি। হয় নিজেরাই বাড়ি ভেঙে ফেলতে হবে, নয়ত সরকার এসে বাড়ি ভেঙে দিয়ে যাবে। কিন্তু তাতে ভাঙার খরচ হিসেবে ১০ হাজার ডলার সানদোকাকেই দিতে হবে।
মুহাম্মদ সানদোকার মত যারা ইসরায়েলের দখলদারিত্বের অধীনে বসবাস করছেন, এভাবেই কাটছে তাদের জীবন; প্রতি মুহূর্তে ভয়, এই বুঝি দরজায় এসে কড়া নাড়া হল।
পূর্ব জেরুজালেমে ছয় ফিলিস্তিনি পরিবারকে নিজেদের বাড়ি থেকে উচ্ছেদের জেরে যে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল, তার ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক সংঘাতে জড়ায় ইসরায়েল ও গাজা।
জর্ডান নদীর পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে কমবেশি ৩০ লাখ ফিলিস্তিনির বসবাস। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর থেকে ওই দখল ধরে রেখেছে ইসরায়েল। দশকের পর দশক ধরে শান্তি আলোচনা চলছে এবং তা ব্যর্থ হচ্ছে। সেই সাথে আরও পোক্ত হয়েছে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ।
এই ফিলিস্তিনিদের গল্পের একমাত্র ব্যতিক্রমী দিক হল, তাদের দুঃখ দুর্দশা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা। সেটা বাদ দিলে তাদের জীবনের বেশিরভাগটা জুড়ে রয়েছে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের অধীনে আতঙ্ক আর অমর্যাদা, নিদারুণ পরিচয় সঙ্কট।
এমনকী তুলনামূলকভাবে শান্ত সময়ে, যখন বিশ্বের মনোযোগ এ দিকটায় বিশেষ থাকে না, তখনও সব বয়সের সব শ্রেণির ফিলিস্তিনিদের অসম্ভবের হতাশায় ডুবে থাকতে হয়, মুখোমুখি হতে হয় তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের, আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ তাদের দুঃখজনক পথ বেছে নিতে বাধ্য করে এবং সামরিক শাসনের নিষ্ঠুরতা তাদের দেখায়-জীবন কতটা ভঙ্গুর। অর্ধশত বছর ধরে এভাবেই চলে আসছে।
সবকিছু যখন শান্ত মনে হবে, আসলে তার ভেতরেই বেড়ে উঠছে চাপা ক্ষোভ।
পূর্ব জেরুজালেমের উচ্ছেদকে যদি দেশলাইয়ে কাঠি ঘষার সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে বলতে হবে, দখলদার ইসরায়েলের উসকানিমূলক আচরণ শুকনো কাঠের গাদা করে রেখেছিল আগেই।
ওই উসকানিই এ সংঘাতের জন্য প্রধান এবং ধারাবাহিক চালিকা শক্তি, যা হামাসকে রকেট ছোড়া কিবা একটি ছোরা হাতে বা গাড়ি নিয়ে কারো ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার অজুহাত তুলে দেয়।
লড়াই থেমে গেলেও ইসরায়েলের ওই উসকানি থামে না।
বাড়িতে পুলিশ আসুক, কোনো বাড়ির মালিকই তা চান না। কিন্তু পূর্ব জেরুজালেমের পরিস্থিতি আরও অন্যরকম। সেখানে ফিলিস্তিনিদের জন্য বাড়ি বানানোর অনুমোদন পাওয়া প্রায় অসম্ভব এবং বেশিরভাগ ঘরবাড়ি বানানো হয়েছে অনুমতি ছাড়াই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শাস্তি হিসেবে বাড়িটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
জেরুজালেমের পুরনো শহরের পূর্ব প্রান্তে যে উপত্যকায় সানদোকা বড় হয়েছেন, সেটা মাউন্ট অব অলিভ থেকে টেম্পল মাউন্টকে আলাদা করেছে।
১৯ বছর বয়সে বিয়ে করে বাবার বাড়ির একটি পুরানো অংশে বসবাস শুরু করেন। পরে বাড়ি সম্প্রসারণের কাজে হাত দেন। পাথরের দেয়াল গড়ে ঘরের জায়গা সঙ্কুলান করা হয়, বানানো হয় একটি রান্নাঘর। সব মিলিয়ে দেড় লাখ ডলারের মতো খরচ হয়।
সংসারে একে একে সন্তান এল ছয়টি। সবুজ উপত্যকায় রোজা আসত পিকনিকের আবহ নিয়ে। বাসায় অতিথি এলে বাচ্চারা তাদের স্বাগত জানাত ঠান্ডা পানি অথবা গরম সুপ দিয়ে। আর স্ত্রী রান্না করতেন মাকলুবা (ভাত, মুরগি) আর মানসাফ (ভেড়ার মাংসের কোরমা)। ছেলেদের নিয়ে সানদোকা আল-আকসা মসজিদে নামাজ পড়তেও যেতেন।
২০১৬ সালে পৌর কর্মীরা সানদোকার বাড়ির দরজায় একটি ঠিকানা চিহ্ন সেঁটে দেয়। তাতে যেন বৈধতা পাওয়ার একটা অনুভূতি হয়েছিল তাদের।
কিন্তু ইসলায়েল ক্রমেই ডানপন্থিদের দিকে ঝুঁকে পড়ছিল। রাষ্ট্রীয় উদ্যান কর্তৃপক্ষের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের প্রভাব বাড়তে থাকে। তারা পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ইহুদিদের নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে উদ্যোগী হয়। পুরনো জেরুজালেম ঘিরে একটি উদ্যান গড়ে তোলার পুরানো একটি পরিকল্পনা সামনে এনে কর্তৃপক্ষ একের পর এক অননুমোদিত বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দিতে শুরু করে।
একসময় সানদোকার পালা আসে।
সরকারি পরিকল্পনা দেখিয়ে বলা হয়, তার বাড়ির একটি অংশ ভবিষ্যতের পর্যটক-বাস পার্কিংয়ের জায়গায় পড়েছে।
ইসরায়েল সরকারের কর্মকর্তা জিভ হাকোহেন বাড়িতে এসে বলে যান, বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী পুরনো জেরুজালেমের নান্দনিকতা ফিরিয়ে আনতে হলে সানদোকাদের বসতি মুছে ফেলার কোনো বিকল্প নেই।
জিভ হাকোহেনের ভাষায়, “ব্যক্তিগত ক্ষতির গল্প তো সবসময়ই দুঃখজনক, কিন্তু ফিলিস্তিনি বসতিগুলো তো তৃতীয় বিশ্বের কথা মনে করিয়ে দেয়।”
সানদোকা একজন আইনজীবী ভাড়া করলেন, সরকারের কাছে আবেদন করলেন তার বাড়িকে ছাড় দেওয়ার জন্য।
কিন্তু কয়েক মাস পর আবারও যখন সরকারের লোক বাড়িতে এল, তিনি ছিলেন বাইরে। কান্নায় ভেঙে পড়ে তার স্ত্রী জানালেন, এবার পুলিশ এসেছিল।
পশ্চিম তীরের এক কোণের একটি গ্রাম আল মুগরাইরের ঘটনা। প্রতিবেশীর বাড়িতে ইসরায়েলি সেনাদের অভিযানের আওয়াজে রাত ২টার সময় ৫০ বছরের বদর আবু আলিয়ার ঘুম ভেঙে যায়।
সেনাবাহিনী এসে তাদের রুটিনমাফিক কাজ শুরু করে। বাচ্চাদের বিছানা থেকে তোলা হয়। বাড়ির সবাইকে বাইরে দাঁড় করানো হয় এবং পরিচয়পত্র দেখা হয়।
কোন ব্যাখ্যা ছাড়াই ঘরগুলো তছনছ করে তারা। দুই ঘণ্টা পর তারা চলে যায়, সঙ্গে নিয়ে যায় পাশের বাড়ির এক কিশোরকে, চোখ বাঁধা অবস্থায়।
চার দিন আগে ওই কিশোর একটি প্রতিবাদ কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিল। এক ইসরায়েলি স্নাইপার যখন আরেক ফিলিস্তিন কিশোকে গুলি করে হত্যা করল, গ্রেপ্তার ওই কিশোর তখন পাথর-নিক্ষেপকারীদের মধ্যে ঘোরাঘুরি করে কাঁদুনে গ্যাসের ক্যানেস্তারা টোকাচ্ছিল।
আল মুগরাইর সেইসব হাতেগোনা গ্রামের একটি, যেখানে এখনও নিয়মিত শুক্রবার প্রতিবাদ কর্মসূচি চলে। বসতি স্থাপনকারীরা কিছু গ্রামবাসীর জমিতে যাওয়ার পথ আটকে দিয়েছিল। তার পর থেকে এই প্রতিবাদ কর্মসূচির শুরু। বিক্ষোভের মধ্যে গুলিতে এক কিশোরের মৃত্যু প্রতিবাদ সমাবেশে শোকের আরেকটি পরত হিসেবে যুক্ত হয়।
সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাতে ফিলিস্তিনিদের বাড়িতে অভিযান চালানো হয়, কারণ সেটাই তুলনামূলক নিরাপদ। আর ঘরবাড়ি তছনছ করা হয় মূলত অস্ত্রের খোঁজে। গেরিলা হামলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত এ ধরনের অভিযান চালানো হয়।
তবে এসব অভিযান গেরিলা কার্যক্রমকে উৎসাহিতই করে।
আবু আলিয়া যখন সেই রাতের অভিযানের বর্ণনা দিচ্ছিলেন, তার কণ্ঠে ফুটে উঠছিল ক্ষোভ। তিনি বলছিলেন, “সৈনিকদের দেখে আমার ছেলে ভয় পেয়েছিল, তার চোখে ছিল পানি। কিন্তু তার জন্য আমি কিছুই করতে পারছিলাম না।”
“এরকম পরিস্থিতিতে আপনার প্রতিশোধ নেওয়ার কথা মনে জাগবে। আপনার ভেতরে নিজেকে রক্ষার তাগিদ তৈরি হবে। কিন্তু নিজেদের রক্ষার জন্য আমাদের কিছুই নেই।”
সুতরাং ফিলিস্তিনিদের পাথর ছোড়া চলবে।
“আমরা তো এম-১৬ রাইফেল নিয়ে বসতি স্থাপনকারীদের হত্যা করতে পারছি না। আমাদের একমাত্র সম্বল তো ওই পাথর। একটি বুলেট আপনাকে মুহূর্তে খুন করতে পারে। একটি ছোট পাথর তেমন কিছুই করতে পারে না। কিন্তু এটা ছুড়ে আমি অন্তত একটা বার্তা দিতে পারছি।”
বসতি স্থাপনকারীরাও পাল্টা বার্তা পাঠায়। তারা আল মুগরাইরের কয়েকশ জলপাই গাছ কেটে ফেলেছে- যা স্থানীয়দের আয়ের অন্যতম উৎস ছিল। তারা একটি মসজিদ জ্বালিয়ে দিয়েছে, গাড়ি ভাঙচুর করেছে। ২০১৯ সালে এক বসতি স্থাপনকারীর বিরুদ্ধে এক ফিলিস্তিনি গ্রামবাসীর পিঠে গুলি করার অভিযোগ উঠলেও, সেই মামলার সুরাহা এখনও হয়নি।
এই দুঃসহ বেদনা মাজেদা আল-রাজাবি ভুলতে পারবেন না কখনো। ইসরায়েলি দখলদারিত্ব তার পরিবারকে টুকরো করে দিয়েছে।
দুই বার বিয়ে বিচ্ছেদের মধ্যে দিয়ে যাওয়া শিক্ষক আল-রাজাবির বয়স এখন ৪৫ বছর। পাঁচ সন্তানকে মানুষ করতে দারুণ ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে তাকে। এর কারণ ইসরায়েলের নীতি। ফিলিস্তিনিরা কে কোথায় জন্ম নিয়েছে- তার ভিত্তিতে তাদের পরিচয়পত্র দেয় ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ।
আল-রাজাবি পশ্চিম তীরের হেবরনে বড় হয়েছেন, তাই তার পরিচয়পত্র সবুজ রঙের। তার সাবেক দুই স্বামী জেরুজালেমের, তাই তাদের পরিচয়পত্রের রঙ নীল।
নীল পরিচয়পত্রধারীরা সাধারণ ইহুদি নাগরিকদের মত ইসরায়েলের সবখানে চলাফেরার সুযোগ পান, কিন্তু সবুজ পরিচয়পত্রধারীদের সে সুযোগ নেই।
বিয়ে বিচ্ছেদের পর রাজাবির সন্তানরা জন্মসূত্রে নীল পরিচয়পত্র পেলেও তার নিজের পরিচয়পত্র সবুজই থেকে গেছে।
তার দুই সাবেক স্বামী জেরুজালেম শহরের শুয়াফাত শরণার্থী শিবিরের বসবাস করেন, যেটা শহরের মাঝখানে নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাইরে থাকা একটি আইনহীন বস্তি। পশ্চিম তীরের বাসিন্দাদের সেখানে বসবাসের অনুমতি নেই, তবে এই নিয়ম সবসময় মানা হয় না।
রাজাবি ভেবেছিলেন, বিয়ে করে সংসার নিয়ে জীবনে এগিয়ে যাবেন। কিন্তু তা হয়নি। তার ভাষায়, সাবেক দুই স্বামীই তাকে সবসময় ‘ছোট করে রাখত’।
দ্বিতীয় বিয়েও যখন টিকল না, সবুজ পরিচয়পত্র নিয়েই পাঁচ সন্তানকে বড় করার লড়াইয়ে নামলেন রাজাবি। কিন্তু তার সন্তানদের পরিচয়পত্র যে নীল। ফিলিস্তিনিদের জীবনে রঙের এই পার্থক্যও প্রাণঘাতি হয়ে উঠতে পারে।
একদিন তার মেয়ে অসাবধানে ঘর পরিষ্কার করার রাসায়নিক খেয়ে ফেললে দ্রুত তাকে কাছের হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করে আল-রাজাবি। কিন্তু সেই হাসপাতাল আবার পড়েছে জেরুজালেমে। শুয়াফাতে শিক্ষকতা করার কারণে জেরুজালেমে প্রবেশের পাস ছিল তার। কিন্তু সেটার মেয়াদ সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত। আর তখন বাজে রাত ৮টা। সৈন্যরা তাকে আটকে দিল।
ছেলেমেয়েরা এখন বড় হয়েছে। নীল পরিচয়পত্রের সুবাদে তারা অবাধে জেরুজালেমে যাতায়াত করতে পারে। কিন্তু সন্তানদের মা হয়েও সেই সুযোগ থেকে রাজাবি বঞ্চিত।
তাকে সবসময় ইসরায়েলের নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাইরে ফিলিস্তিনের অংশেই থাকতে হয়। যখন তার সন্তানেরা জাফা অথবা হাইফা যায়, অথবা হেবরনের ভেতর দিয়ে সংক্ষিপ্ত পথে জেরুজালেমে যায়, ‘পশ্চিম তীরের বাসিন্দা’ বলে তাকে ব্যাঙ্গ করে তারা।
রাজাবির এক মেয়ের বয়স এখন ২১ বছর। বাগদত্তার সঙ্গে সে জেরুজালেমে বেড়াতে যায়। মা হিসেবে রাজাবিও তাদের কাছে থাকতে পারতেন। কিন্তু পরিচয়পত্রের রঙ তা হতে দেবে না।
শুয়াফাত শিবিরের শিক্ষকতার কাজ ছেড়ে রাজাবি সম্প্রতি পশ্চিম তীরে আরেকটু ভালো পরিবেশে শিক্ষকতার চাকরি নিয়েছেন। কিন্তু তার ফলে তার সন্তানদের নীল পরিচয়পত্র বাতিল হওয়ার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ যদি জানতে পারে যে তার সন্তানদের প্রাথমিক ঠিকানা পশ্চিম তীরে, তাদের মায়ের সঙ্গে। তাহলে সন্তানদের পরিচয়পত্র বাতিল হয়ে যেতে পারে।
রাজাবি এখন শুধু আশা করেন, তার সন্তানরা পৃথিবীটা দেখুক, আরেকটু ভালো করে বাঁচার সুযোগ পাক।
ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভে কাঁদুনে গ্যাস ছুড়ছে ইসরায়েলি সেনারা।
ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভে কাঁদুনে গ্যাস ছুড়ছে ইসরায়েলি সেনারা।
নিজের কবর খোঁড়া
ইসরায়েলের সঙ্গে যতই মিলেমিশে থাকার চেষ্টা করুক, ফিলিস্তিনিরা প্রায়ই নিজেদের আবিষ্কার করেন একটি চক্রের মধ্যে।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে এক সময় ভালোই উপার্জন করতেন মাজেদ ওমর। কিন্তু ২০১৩ সালে তার ছোট ভাই ইসরায়েলের নিরাপত্তা বেষ্টনীর একটি ফাঁকা জায়গা দিয়ে পার হওয়ার সময় নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে আহত হন।
এর জের সামলাতে হয় ৪৫ বছরের ওমরকে। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ তার কাজের অনুমতি বাতিল করে দেয় শুধু এই সন্দেহে যে, তিনি হয়ত প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করবেন। ইসরায়েলিদের দাবি, এমনটা নাকি হরহামেশাই ঘটে।
তো ওই কারণে ১৪ মাস কর্মহীন ছিলেন ওমর। এরপর ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ আবার কাজের অনুমতি দেয়, তবে সেটা শুধু অধিকৃত পশ্চিম তীরে দ্রুত বেড়ে চলা বসতি নির্মাণ প্রকল্পের জন্য।
সেখানে কর্মীদের মজুরি ইসরায়েলের চেয়ে অর্ধেক। প্রতিদিন সকালে দেহ তল্লাশির মধ্য দিয়ে যেতে হয় এবং সারাদিন তাদের ওপর নজরদারি করে সশস্ত্র প্রহরীরা।
ওমর এখন পরিণত হয়েছেন ইহুদি বসতি নির্মাণ প্রকল্পের ফোরম্যানে, যে প্রকল্পের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের জমিতে ইহুদিদের জন্য অবৈধ বসতি গড়ে চলেছে ইসরায়েল।
ওমর বলেন, “ছোট করে দেখলেও, এটা অনেকটা নিজের কবর খোঁড়ার মত কাজ। কিন্তু আমরা এমন এক সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি, যখন সবাই দেখছে কোথায় ভুল হচ্ছে, অথচ এড়ানোর পথ নেই।”
সহিংসতা অনেক সময় হঠাৎ এবং সংক্ষিপ্ত পরিসরে ঘটে যায়। কিন্তু তার জেরে যে সঙ্কট আর ভীতি তৈরি হয়, তা বিপর্যয়কর।
বেথেলহেমের বাড়ি থেকে রামাল্লায় কর্মস্থলে যাওয়ার পথে ৪০ বছরের নিল আল-আজ্জাকে ইসরায়েলি তল্লাশি চৌকি পার হতে হয়, যা তার জন্য একটি আতঙ্কের পথ।
বাড়িতে তিনি দেয়ালের ঘেরাটোপে থাকেন এবং পেছনের উঠোনে সবজি বাগান পরিচর্যা করেন। কিন্তু যখন তিনি কাজে যান, তখন তার সুরক্ষার কোনো উপায় নেই। ফিলিস্তিনের অগ্নি নির্বাপন ও অ্যাম্বুলেন্স সেবার একজন ব্যবস্থাপকের পদে কাজ করেও স্বস্তি পান না আল-আজ্জা।
সম্প্রতি তল্লাশি চৌকিতে একজন সেনা সদস্য তাকে থামিয়ে গাড়ির কাচ নামাতে বলে। জানতে চায়, তার কাছে কোন অস্ত্র আছে কিনা।
আল-আজ্জা জানান- ‘নেই’। নারী সেনা সদস্যটি তখন যাত্রীর বসার দিকের দরজা খুলে নিজেই ভেতরটা দেখে সজোরে দরজা বন্ধ করে দেন।
আপত্তি জানাতে গিয়েও থেমে যান আল-আজ্জা। সৈন্যদের সঙ্গে তর্কাতর্কির ফল যে গুলি খেয়ে মৃত্যু, এই ফিলিস্তিনির তা ভালোভাবেই জানা।
“আমি আমার সম্পদ ও আত্মমর্যাদা টিকিয়ে রাখতে চাই, আর সেজন্য আমাকে কিছু দামও চুকাতে হয়।”
এসব তল্লাশি চৌকির কারণে আধঘণ্টার রাস্তা পার হতে প্রায়ই দুই থেকে তিন ঘণ্টা লেগে যায় আল-আজ্জার।
ইসরায়েলিদের বক্তব্য হচ্ছে, পলাতক হামলাকারীদের আটকাতে, অবৈধ অস্ত্রের খোঁজে তল্লাশি করতে এবং বিক্ষোভ শুরু হলে পশ্চিম তীরকে দুই ভাগ করে ফেলতে এসব তল্লাশিচৌকি জরুরি।
বুদবুদের ভেতরে
কোন ফিলিস্তিনিই দখলদার ইসরায়েলিদের নাগালের বাইরে নন- এমনকি যারা একটু ভালো অবস্থায় আছেন, রামাল্লায় সুযোগ-সুবিধার এক ‘বুদবুদের’ মধ্যে থাকেন, তারাও নন।
সনডোস ম্লেইতাতের পরিচিত প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো ভয়ের স্মৃতি আছে। তার নিজের স্মৃতিটা ৫ বছর বয়সের। ইসরায়েলের ট্যাংকগুলো যখন নাবলুস গুঁড়িয়ে দিচ্ছিল, ছোট ভাইকে নিয়ে পালিয়ে থাকতে হয়েছিল তাকে।
এখন ম্লেইতাতের বয়স ৩০, তিনি একটি ওয়েবসাইট চালান, যার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিরা মনোচিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে।
তিনি বলেন, কেউ তার বুকের ভেতর বয়ে চলা ক্ষতকে জাগিয়ে রাখতে চায় না। সবাই সামাজিক রীতিনীতির মধ্যে নিরাপত্তা খোঁজে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে, ফেইসবুক আর ইনস্টাগ্রামের লাইকের মধ্যে ‘অনুমোদনের’ সুখ পাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু এসব শুধু দখলদারিত্বের দমবন্ধ হয়ে আসার অনুভূতিকেই আরও দৃঢ় করে তোলে।
“এগুলো সবই হচ্ছে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা। জনগণ মেনে নেওয়ার বা পোষ মানার একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যায়। তারা এর কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং ভাবতে শুরু করে, তারা কিছুই বদলাতে পারবে না।” ম্লেইতাত বলেন, একটি প্রতিবাদ সমাবেশে তার চাচাকে ইসরায়েলি সৈন্যরা গুলি করে হত্যা করার পর তার ছোট ভাইকে মাত্র ১৮ বছর বয়সে বিয়ে করিয়ে দেওয়া হয়, যাতে সে চাচার পথে না যায়।
একটি জাতি যখন শুধু একটুখানি স্বস্তির জীবনের চিন্তায় তাদের যৌবন কাটিয়ে দিতে বাধ্য হবে, তাদের পক্ষে স্বাধীনতা অর্জন করা সম্ভব নয় বলেই মনে করেন ম্লেইতাত।
“তারা হয়ত ভাববে যে একদিন তারা এই বুদবুদ থেকে বের হয়ে যাবে, অথচ তারা পারবে না।” রোজগার ভালো থাকলে মাসে ১ হাজার ৮০০ ডলারের মত আয় করেন মুহাম্মদ সানদোকা। তার আশা ছিল, আইনজীবী হয়ত বাড়ি ভেঙে ফেলা নির্দেশ ঠেকাতে পারবেন। হয়ত শুধু জরিমানা করে ছেড়ে দেবে কর্তৃপক্ষ।
“কিন্তু তার বদলে আমি বাড়ি থেকে একদিন আমার স্ত্রীর আতঙ্কিত ফোন কল পেলাম। বললো, বাড়িতে পুলিশ। ওরা তখন কাঁদছে।”
সানদোকা ভাবলেন, যথেষ্ট হয়েছে। নিজের বাড়ি তিনি নিজেই ভেঙে ফেলবেন।
এক সোমবার সকালে, ধার করে আনা একটা বড় হাতুড়ি দিয়ে সানদোকার ছেলেরা পালা করে নিজেদের বাড়ির ভাঙার কাজে হাত দেন। নিজেদের বাড়ি নিজেরাই গুঁড়িয়ে দেয় তারা, যেন একটা বালির প্রসাদ। সেই কাজ শেষ হতেই অবসাদ ঘনায়।
১৫ বছরের মুসা বলে, “মনে হচ্ছে, আমরা যেন নিজেদের গায়েই আগুন দিলাম।” তার ভাই ২২ বছরের মুয়াতাজ বলেন, “আমাদের জমি ওদের দরকার। ওরা চায়- আমরা সবাই জেরুজালেম ছেড়ে যাই।” ২০২০ সালে পূর্ব জেরুজালেমে ১১৯ জন ফিলিস্তিনির ঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তাদের ৭৯ জনকে বাধ্য করা হয়েছে নিজেদের ঘর নিজেদেরকেই ভেঙে ফেলতে।
সানদোকা ধ্বংসাবশেষের ওপর বসে একটি সিগারেট ধরান। সেটা শেষ করে ওই ধ্বংসস্তূপের ছবি তুলে পুলিশের কাছে পাঠান।
জেরুজালেমে বসবাসের অধিকার জলাঞ্জলি দিয়ে পশ্চিম তীরে যাওয়ার কথা সানদোকা ভাবতেও পারেন না। আবার জেরুজালেমের অন্য এলাকায় বাস করার সামর্থ্য তার নেই। এক বন্ধু সাময়িক আশ্রয় হিসেবে তার বাড়ির দুটি কামরা সানদোকার পরিবারের জন্য ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু সানদোকার স্ত্রী চান স্থায়ী ঠিকানা।
“সে আমাকে বলেছে, আমি যদি তাকে বাড়ি কিনে দিতে না পারি, তাহলে সম্পর্ক শেষ। প্রত্যেকে যার যার পথে চলে যেতে পারে।”
মাথা ঘরিয়ে পুরনো জেরুজালেমের দিকে তাকান সানদোকা। নিচু কণ্ঠে বলেন, “এরা এগোচ্ছে খুব ধীরে ধীরে। অনেকটা সিংহের মত… একটা খায়, তারপর আরেকটা। শেষ পর্যন্ত চারপাশের সবকিছু খেয়ে ফেলে।” সূত্র:বিডিনিউজ।
ভয়েস/জেইউ।