বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২০ পূর্বাহ্ন
আবদুল আজিজ:
কক্সবাজার সাগরপাড়ের বস্তির কুড়েঘর থেকে সরাসরি অট্টালিকায়। অনেকটা স্বপ্নের মত। তবে আর স্বপ্ন নয়, বাস্তবে পরিণত হয়েছে জলবায়ু উদ্ধাস্তু ৪ হাজার ৪০৯ পরিবারের। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ প্রকল্পের আওতায় এসব উদ্বাস্তু মানুষ ভবনের ফ্ল্যাট পেয়ে খুবই আনন্দিত।
খুরুশকুলে ফ্ল্যাট উপকারভোগীরা বলছেন, দীর্ঘ ২৯ বছর ধরে সরকার এসে সরকার গেছে। কিন্তু, উদ্ধাস্তু এসব মানুষের কোন ভাগ্য পরিবর্তন হয়নি। খবর নেয়নি কেউ। তবে খবর নিয়েছেন বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি আমাদের তাদের ভাগ্য পরিবর্তন করেছেন। সাগরপাড়ের অস্থায়ী কুড়েঘর থেকে সরাসরি অট্টালিকায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বাস্তু এসব মানুষের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি এভাবে রক্ষা করবে স্বপ্নেও ভাবেননি। কারণ, অতীতের সরকার গুলো অসহায় মানুষদের উচ্ছেদ করতে দেখেছেন, এভাবে পুর্নবাসন দেখেননি। ফ্ল্যাট পাওয়া অকল্পনীয়।
কথা হয় বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে ফ্ল্যাটের চাবি পাওয়া ২১জন উপকারভোগীদের একজন আবু তাহের কুতুবী। তিনি জানান, ‘এটি যেন স্বপ্নের মতো। ১৯৯১ সালে ঘূর্ণিঝড়ে দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়া সহ উপকূলীয় অঞ্চল লন্ডভন্ড হয়ে যায়। এরপর থেকে একে একে কক্সবাজার সাগরপাড়ে আশ্রয় নেয় কুতুবদিয়া, মহেশখালী সহ জেলার বিভিন্ন এলাকার ৩০ হাজারেরও বেশী উদ্বাস্তু মানুষ। এসব মানুষ গুলো সাগরপাড়ে মৎস্য আহরণ ও শুটকী পল্লীতে কাজ আসছিল। বসবাসের এই দীর্ঘ সময়েও কয়েকবার উচ্ছেদ করা হয় এসব উদ্বাস্তু মানুষদের। কিন্তু, কোন সরকার পুনর্বাসন করেননি। পুনর্বাসন করেছেন বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি আমাদের কথা দিয়ে কথা রেখেছেন। আমাদের উচ্ছেদ না করেই পুনর্বাসন করেছেন। তাও কুড়েঘর থেকে অট্টালিকায়। সত্যিই এটি স্বপ্নের মত। আমরা সত্যিই আনন্দিত।’
উপকারভোগী জোবাইদা নাসরিন (৩০) জানান, ‘আমরা যারা কক্সবাজার পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডে অর্থাৎ নাজিরারটেক, সমিতিপাড়া, কুতুবদিয়াপাড়ায় দীর্ঘদিন বসবাস করে আসছি। আমরা কোনদিন কল্পনাও করিনি ফø্যাট পাব। কারণ, রাজনীতিতে প্রতিশ্রুতির কোন অভাব নেই। কিন্তু, বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিশ্রুতি দিয়ে এভাবে এত দ্রুত বাস্তবায়ন করবে আমাদের জানা ছিলনা। আমরা প্রধানমন্ত্রীর জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া প্রার্থনা করছি’।
একই কথা বলেছেন, খাইরুন্নেছা (৩৫)। তিনি জানান, ‘আশ্রয়কেন্দ্রে ফø্যাট পাওয়া অধিকাংশ মৎস্যজীবী। আমরা দীর্ঘদিন ধরে সাগরপাড়ে থাকলেও আমাদের নতুন আবাসস্থল আরো নিরাপদ ও সুন্দর পরিবেশে হয়েছে। বাঁকখালী নদীর পাড়ে এবং সাগরের কাছাকাছি স্থানে আশ্রয়কেন্দ্র হওয়ায় এখানকার মানুষ মৎস্য শিকার করে জীবিকা নির্বাহ অব্যাহত রাখতে পারবে। তাই, আমাদের জন্য নতুন আবাসস্থল হলেও কোন ধরণের অনুবিধা হবে না’।
উপকারভোগী শাজাব উদ্দিন, ইউছুপ জামান, অংকুর দাশ সহ অনেকই ফø্যাটের চাবি পেয়ে আবেগাপ্লত হয়ে পড়েছেন। তারা বলেছেন, ৯১ তে ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত হয়ে বাড়িঘর হারানো উদ্বাস্তু মানুষের খবর নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বলতে গেলে বস্তির কুড়েঘর থেকে দালানে আমাদের ঠিকানা করে দিয়েছেন। অতীতে কোন সরকার এভাবে করতে পারেনি। এতে আমরা অনেক আনন্দিত ও গর্বিত।
কক্সবাজার নাজিরারটেক শুটকী ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আতিক উল্লাহ জানান, ‘বৃহস্পতিবার ২১জনকে ফø্যাটের চাবি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ৬শ’টি পরিবার ফø্যাটের মালিকানা বুঝে নিবেন। আমরা যারা এখনও পায়নি, তারা পরবর্তীতে ফ্ল্যাট বুঝে পাবো বলে আশা করছি’।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বেলা ১১টার পরপরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কক্সবাজারের খুরুশকুলের ‘শেখ হাসিনা বিশেষ আশ্রয়কেন্দ্র’ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। প্রথম দফায় ৬শ’ পরিবারকে ফø্যাট বরাদ্ধেও আওতায় ২১জন উপকারভোগীদের মাঝে চাবি হস্তান্তর করেন। পরে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ৬শ’ পরিবারকে ফ্ল্যাট হস্তান্তর প্রক্রিয়া শেষ করবে। এভাবে পর্যায়ক্রমে ৪৪০৯টি পরিবারের মধ্যে ফ্ল্যাট বরাদ্ধ দেয়া হবে এমনটি জানিয়েছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো: কামাল হোসেন।
জেলা প্রশাসক মো: কামাল হোসেন বলেছেন, ‘কক্সবাজারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১০টি বিশেষ অগ্রাধিকার উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম শেখ হাসিনা আশ্রয়ণ প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ১৯টি পাঁচতলা ভবনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সেখানে বিমানবন্দর সম্প্রসারনের কারনে ক্ষতিগ্রস্থ জলবায়ু উদ্ধাস্তু ৬০০ পরিবার পাচ্ছে নতুন ফ্লাট হস্তান্তর শুরু হয়েছে। এ প্রকল্পে পর্যায়ক্রমে ৪হাজার ৪৪৮ পরিবার পাবে নির্মিত ফ্লাট’।
দেশে এটিই প্রথম সর্ববৃহৎ এবং সর্বাধিক বাজেটের এ আশ্রয়ণ প্রকল্প। প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে প্রায় ২৫৩ দশমিক ৩৫০ একর জমি অধিধহণ করা হয়। এ প্রকল্পে ১৩৯টি ৫ তলা ভবন নির্মাণ করা হবে। যার মধ্যে শেখ হাসিনা টাওয়ার নামে একটি ১০ তলা বিশিষ্ট সুউচ্ছ ভবনও থাকবে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্বাবধায়নে ২০১৭ সালে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের বাকি ভবনগুলোর কাজও এগিয়ে চলছে। এ প্রকল্পে বসবাসকারি পরিবারের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে স্কুল, মসজিদ, স্বাস্থ্য সেবার জন্য হাসপাতাল সহ বিনোদনের পাশাপাশি প্রকল্প এলাকায় আশ্রয় পাওয়া মৎস্যজীবীদের কর্মসংস্থানের জন্য নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘুর্ণিঝড় ও জ¦লোচ্ছাসে কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসলিলা হয়। মহেশখালী কুতুবদিয়া সহ উপকূলের বিশাল এলাকা সমুদ্রে বিলিন হয়ে যায়। এতে গৃহ হারা হয় হাজার হাজার মানুষ। এসব মানুষ জীবনের তাগিদে আশ্রয় নেয় কক্সবাজার শহরের বিমানবন্দরের পশ্চিমে বালিয়াড়ী ও ঝাউবাগান এলাকায়। যা পরবর্তীতে কক্সবাজার পৌরসভার ১ নং ওয়ার্ডে রুপান্তরিত হয়। যেখানে বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ বসবাস করছে। জলবায়ু উদ্ভাস্তু এসব মানুষ ঝুকিপুর্ণ এলাকায় বসবাস করে আসছিল। বিশ্বমানের পর্যটন শিল্প বিকাশ ও ভৌগোলিক গুরুত্ব বিবেচনায় কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নিত করা হচ্ছে। বিমানবন্দর সম্প্রসারণের লক্ষ্যে পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়া পাড়া, নাজিরাটেক এবং সমিতি পাড়া এলাকার বিপুল পরিমাণ ভূমি অধিগ্রহণ করে সরকার। অধিগ্রহণের আওতায় পড়া জমিতে ৪ হাজার ৪০৯টি পরিবার বাস করতো। ২০১১ সালে ৩ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কক্সবাজারে এক জনসভায় এসব জলবায়ু উদ্ভাস্তু পরিবারের জন্য পুনর্বাসনের নির্দেশনা দেন। তারই প্রেক্ষিতে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে গ্রহন করা হয় খুরুশকুল আশ্রয়ন প্রকল্প। যার নাম দেয়া হয়েছে শেখ হাসিনা আশ্রয়ণ প্রকল্প। সেনা বাহিনীর তত্তাবধানে প্রথম পেইজে ৫তলা বিশিষ্ট ১৯ টি ভবন নির্মান করা হয়েছে।
ভয়েস/আব