মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:২৯ অপরাহ্ন
খেলাধুলা ডেস্ক:
জুলাইয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার পরাজয়ের ছয় সপ্তাহ এবং দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময়ে দেশের হয়ে ২০৭টি ম্যাচ খেলার পর সোমবার (৩১ আগস্ট) আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন লিওনেল মেসি।
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির ক্যারিয়ারের পথচলা এবং স্মরণীয় কিছু মুহূর্তের ফিরে দেখা…
অশুভ সূচনা
২০০৫ সালে এক উদীয়মান ১৮ বছর বয়সী তরুণ হিসেবে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল। বুদাপেস্টে হাঙ্গেরির বিপক্ষে এক প্রীতি ম্যাচে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে নামার মাত্র ৯০ সেকেন্ডের মাথায় রেফারির দৃষ্টিতে কনুইয়ের গুঁতো দেওয়ার অপরাধে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় তাকে। আন্তর্জাতিক অভিষেকের শুরুটা এমনভাবে স্মরণীয় হবে, তা হয়তো মেসি নিজেও ভাবেননি।
পরের বছর অর্থাৎ ২০০৬ সালের জুনে, জার্মানিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে সার্বিয়া ও মন্টেনিগ্রোর বিরুদ্ধে ৬-০ গোলের জয়ে শেষ গোলটি করে বিশ্বকাপে নিজের আত্মপ্রকাশ ঘটান মেসি। এই গেলসেনকিচেন শহরের মাঠ থেকেই শুরু হয় বিশ্বকাপের সঙ্গে মেসির সেই কিংবদন্তিতুল্য সম্পর্কের।
প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনাল
২০১৪ সালে আর্জেন্টিনা যখন ব্রাজিলের মাটিতে পা রাখে, ২৬ বছর বয়সী মেসি তখন বার্সেলোনার অর্জিত সাফল্যের ঝুলির কারণে ইতিমধ্যে বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়দের তালিকায় নাম লিখিয়ে ফেলেছেন।
তবে জাতীয় দলের হয়ে তার ক্যারিয়ারে তখন ছিল কেবলই হতাশা। ২০০৬ এবং ২০১০ (ডিয়েগো ম্যারাডোনার অধীনে) বিশ্বকাপে জার্মানির কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে বিদায়, ২০০৭ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলের কাছে হার এবং ২০১১ সালে নিজ দেশের মাটিতে আয়োজিত কোপা আমেরিকায় চরম ব্যর্থতা।
আলেহান্দ্রো সাবেয়ার দলের অধিনায়ক হিসেবে ২০১৪ বিশ্বকাপে পা রেখে প্রতিটি গ্রুপ ম্যাচেই গোল করে উড়ন্ত সূচনা করেছিলেন মেসি। এরপরের ম্যাচগুলোতে গোলের দেখা না পেলেও ম্যারাডোনার যুগের পর আর্জেন্টিনাকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ফাইনালে নিয়ে যান তিনি। তবে মারাকানা স্টেডিয়ামে জার্মানির কাছে হেরে শেষ পর্যন্ত স্বপ্নভঙ্গ হয় আলবিসেলেস্তেদের।
২০১৬- ক্যারিয়ারের চরম অন্ধকার সময়
২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই, পরের বছর কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে পেনাল্টিতে হেরে চরম হতাশায় ডুবতে হয় আর্জেন্টিনাকে। তাই আন্তর্জাতিক শিরোপার খরা কাটাতে ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত কোপা আমেরিকা সেন্টেনারিও-তে দারুণ এক মিশন শুরু করেন মেসি। আর্জেন্টিনা সহজেই ফাইনালে উঠে যায়।
নিউ ইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আবারও প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়ে চিলি। কিন্তু ম্যাচের ফলাফল আগেরবারের মতোই অধরা থেকে যায়— পেনাল্টিতে আরও একটি পরাজয়, আর এবার মেসি নিজেই শট মিস করে বসেন।ইতিমধ্যে ১০০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা মেসি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
হতাশ মেসি ঘোষণা করেন, জাতীয় দলের হয়ে আমার দিন শেষ। আমি আমার সাধ্যমতো সব চেষ্টা করেছি, চার-চারটি ফাইনাল খেলেছি এবং চ্যাম্পিয়ন হতে না পারাটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।তবে এই আবেগি ঘোষণার ছয় সপ্তাহ পর মেসি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন এবং স্বল্পকালীন সেই অবসর ভেঙে পুনরায় জাতীয় দলে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন।
অবশেষে প্রথম শিরোপা জয়
২০১৮ সালে লিওনেল স্কালোনি আর্জেন্টিনার কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় অধ্যায়টি একেবারে অন্যরকম আলোয় উদ্ভাসিত হয়।
২০২১ সালে কোভিড মহামারির বিশ্বজুড়ে তাণ্ডবের মাঝে আর্জেন্টিনা যায় কোপা আমেরিকা খেলতে। মারাকানায় অনুষ্ঠিত ফাইনালে অ্যানহেল ডি মারিয়ার একমাত্র গোলে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আয়োজক ব্রাজিলকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে দীর্ঘ ২৮ বছরের খরা কাটিয়ে প্রথম বড় কোনও শিরোপা উঁচিয়ে ধরে মেসির আর্জেন্টিনা।
কাতারে সাফল্যের স্বর্ণশিখর
কাতারে অনুষ্ঠিত ২০২২ বিশ্বকাপের পর হয়তো মেসির অবসর নেওয়াটা স্বাভাবিক হতো। ততদিনে বার্সেলোনার এই কিংবদন্তি খেলোয়াড় পিএসজির জার্সিতে খেলছেন এবং ৩৫ বছর বয়সে এসে নিজের ক্যারিয়ারের সেরা ফুটবল উপহার দিয়ে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বজয়ের দৌড়ে নিয়ে যান।
পুরো টুর্নামেন্টের সাতটি ম্যাচে তিনি সাতটি গোল করেন এবং তিনটিতে সহায়তা (অ্যাসিস্ট) করেন। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সেই মহাকাব্যিক ফাইনালে করেন জোড়া গোল এবং টাইব্রেকারে নিজের শটটি জালে জড়িয়ে দিয়ে আর্জেন্টিনাকে ইতিহাসজুড়ে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বসেরার ট্রফি এনে দেন।
সেই মহাকাব্যিক সাফল্যের পর মেসি বলেছিলেন, অবশ্যই আমি এভাবে ক্যারিয়ার শেষ করতে চেয়েছিলাম। এর চেয়ে বেশি কিছু চাওয়ার থাকতে পারে না।
কিন্তু বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে আরও কিছুদিন খেলে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল তার, আর সেই পথচলা বজায় থাকে সাম্প্রতিক সময়ের বিশ্বকাপ পর্যন্ত।
আরও এক ফাইনাল হারের বেদনাবিধুর বিদায়
২০২৪ সালের কোপা আমেরিকায় দেশের হয়ে আরও একটি ট্রফি জিতে নিয়ে এ বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে দলকে নেতৃত্ব দেন মেসি। ক্যারিয়ারের ৩৯তম জন্মদিনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মেসির বয়স নিয়ে যে সংশয় ছিল, প্রথম পাঁচ ম্যাচে আটটি গোল করে এবং দলকে ফাইনালে তুলে তা যেন তিনি তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেন।
মেসি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার (৩৪টি) অনন্য রেকর্ড তৈরি করার পাশাপাশি মোট ২১টি গোল করেন। তিনি ইতিহাসের মাত্র দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার কৃতিত্ব অর্জন করেন।
তবে ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে স্পেনের কাছে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। আর এভাবেই ২০৭টি ম্যাচ এবং ১২৫টি গোলের সমৃদ্ধ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পরিশেষে এক বিষাদময় সমাপ্তি ঘটে লিওনেল মেসির।
ভয়েস/আআ