মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৫৫ অপরাহ্ন
বিনোদন ডেস্ক:
বলিউড সিনেমার শীর্ষ অভিনেত্রীদের তালিকা মোটেও ছোট নয়। যেমন: ঐশ্বরিয়ার রাই বচ্চন, দীপিকা পাড়ুকোন, আলিয়া ভাট, ক্যাটরিনা কাইফ, আনুশকা শর্মা, কারিনা কাপুর খান প্রমুখ। এসব অভিনেত্রীরা ধীরে ধীরে সিনেমায় নিজেদের উপস্থিতি সীমিত করছেন। আবার কেউ কেউ প্রচলিত বাণিজ্যিক সিনেমা থেকেই দূরে সরে গেছেন। এ ক্ষেত্রে ক্যাটরিনা কাইফ, আনুশকা শর্মার নাম স্মরণ করা যেতেই পারে।
অন্যদিকে, কৃতি স্যানন, তৃপ্তি দিমরি, জাহ্নবী কাপুর, রাশমিকা মান্দানা ও অনন্যা পান্ডের মতো নতুন প্রজন্ম বছরে তিন-পাঁচটি সিনেমায় অভিনয় করছেন। শীর্ষস্থানীয় অভিনেত্রীদের পর্দার অনুপস্থিতি মোটেও কাকতালীয় নয়; বরং পুরোপুরি পরিকল্পিত। কী সেই পরিকল্পনা, যার জন্য রুপালি পর্দায় তাদের সরব উপস্থিতি নেই? চলুন এই প্রশ্নের উত্তর জানার চেষ্টা করা যাক—
পরিবার ও নিজেকে বেছে নেওয়া
আলিয়া ভাট, দীপিকা পাডুকোন ও কিয়ারা আদভানির হাতে এখন এক বা দুটি সিনেমার কাজ রয়েছে। অথচ কয়েক বছর আগেও আলিয়া ভাট অভিনীত তিনটি সিনেমা বছরে মুক্তি পেয়েছে। দীপিকা পাডুকোনেরও বছরে তিনটি করে সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। আলিয়া ভাট ‘আলফা’, দীপিকা পাডুকোন ‘কিং’-এর মতো বছরে একটি করে সিনেমা করছেন। তবে ক্যাটরিনা কাইফ ও আনুশকা শর্মার মতো শীর্ষ তারকাদের ক্ষেত্রে সেই নিয়মও প্রযোজ্য নয়।
ব্যক্তিগত জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়ে আলোচনার বাইরে সরে যাওয়ার ‘ট্রেন্ড’ শুরু করেছিলেন ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন। অন্য অভিনেত্রীরাও সেখান থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। এখন শুধু পরিবারের জন্য সময় নয়, নিজের জন্য সময় দেওয়াও গুরুত্ব পাচ্ছে। শ্রদ্ধা কাপুরের হাতেও মাত্র একটি সিনেমার কাজ রয়েছে। বড় পরিচালক বা সুপারস্টার নায়কের সঙ্গে সিনেমা করার সুযোগ থাকলেও হঠাৎ আসা কোনো দুর্দান্ত কাজের জন্য নিজের শিডিউল ফাকা রাখতেই বেশি আগ্রহী তারা।
নজর টাকাপয়সায়
অভিনেত্রীদের পারিশ্রমিক এখনো অভিনেতাদের তুলনায় অনেক কম। একই সঙ্গে তাদের ক্যারিয়ারও তুলনামূলকভাবে ছোট। অভিনেতারা যেখানে ৬০ বছর বয়সেও প্রধান নায়কের চরিত্রে অভিনয় করছেন, সেখানে অভিনেত্রীদের চল্লিশের কোঠাতেই অবসরের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। সুতরাং অভিনেত্রীরা দ্বিতীয় আয়ের পথ বেছে নিয়েছেন। গত পাঁচ বছরের বড় একটি সময় নিজের বিউটি ব্যবসার সাম্রাজ্য গড়তে ব্যয় করেছেন ক্যাটরিনা কাইফ। গত বছর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীপিকা পাডুকোন ঘোষণা করেন—স্টার্টআপে বিনিয়োগ করতে চান তিনি। এজন্য মানুষের কাছে ব্যবসায়িক ধারণাও চেয়েছিলেন এবং সেগুলো মূল্যায়নের জন্য একটি দলও গঠন করেছেন। বলা যায়, নিজের ব্যক্তিগত ‘শার্ক ট্যাংক’ চালু করেছেন এই অভিনেত্রী।
তামান্না ভাটিয়া নিজের জুয়েলারি ব্যবসা শুরু করেছেন। আলিয়া ভাটের রয়েছে শিশুদের পোশাকের ব্যবসা। তাছাড়া আরো বেশ কয়েকটি ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন, যেগুলো থেকে ভালো রিটার্ন পেয়েছেন। অর্থাৎ সিনেমা এখন আর তাদের আয়ের প্রধান উৎস নয়। তারা ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠানের মালিক; তারকাখ্যাতি ব্যবহার করে নিজেদের ব্র্যান্ড তৈরি করছেন।
স্ট্রিমিংয়ের আকর্ষণ
যেসব অভিনেত্রীরা ওটিটির গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন, তাদের নিয়ে কথা বলা যাক। ‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান সিজন টু’-তে সামান্থা রুথ প্রভু দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন। প্রিয়াঙ্কা চোপড়া ‘সিটাডেল’, ‘দ্য ব্লাফ’-এর মতো প্রকল্পে কাজ করেছেন। কারিনা কাপুর খান ‘জানে জান’-এ দারুণ অভিনয় করেছেন। আলিয়া ভাটকে দেখা গেছে ‘হার্ট অব স্টোন’ ও ‘ডার্লিংস’-এ। তামান্না ভাটিয়া অভিনয় করেছেন ‘লাস্ট স্টোরিজ টু’-তে।
চিত্রনাট্য ও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র নিয়ে ভ্যারাইটি ইন্ডিয়ার সঙ্গে কথা বলেছেন পরিচালক আব্বাস বার্মাওয়ালা। তিনি বলেন, “অনেক অভিনেত্রী স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছেন। কারণ সেখানে ভালো চরিত্র পাওয়া যায়। এসব অভিনেত্রী বক্স অফিসের সাফল্য পেয়েছেন ঠিকই। কিন্তু এখন তাদের অনেকেই পুরস্কার ও জাতীয় পর্যায়ের স্বীকৃতি চান। সিনেমার বক্স অফিসে তারা মূল্য যোগ করেছেন। এখন তারা আরো কিছু চান।”
পরিচালক রাহুল ঢোলাকিয়াও একই মত পোষণ করেছেন। তার ভাষায়—“তারা শীর্ষ অভিনেত্রী এবং অত্যন্ত জনপ্রিয়। দর্শক তাদের আরো বেশি পর্দায় দেখতে চান। একইসঙ্গে অন্য কোথাও তাদের অগ্রাধিকার রয়েছে। আমাদের এমন আরো ভালো চরিত্র লিখতে হবে, যা তাদের আকৃষ্ট করতে পারে।”
পরিচালক, চিত্রনাট্যকার সুপর্ণ ভার্মা বলেন, “শুরুতে ভারতে ওটিটি নিয়ে কিছুটা নেতিবাচক ধারণা থাকলেও এখন তেমন কোনো বাধা নেই। অভিনেত্রীরা তাদের তারকামূল্য অনুযায়ী পারিশ্রমিক পাচ্ছেন। অর্থের দিক থেকেও এটি কোনোভাবেই পিছিয়ে নেই।”
বর্তমান সময়ে যেসব সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, সেগুলোতে নারী চরিত্র কেন্দ্রীয় ভূমিকায় নেই। হিন্দি সিনেমার শীর্ষস্থানীয় নায়িকাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে এমন প্রকল্পে কাজ করা মানানসই নয় বলে মনে করেন পরিচালক মুদাসসার আজিজ। এ বিষয়ে তিনি বলেন, “তাই তারা এসব সিনেমা এড়িয়ে চলছেন। আর এ ধরনের সিনেমার সংখ্যাও বাড়ছে। ‘টক্সিক’, ‘পুষ্পা’, ‘অ্যানিমেল’ কিংবা ‘ধুরন্ধর’-এর মতো সিনেমার দিকে সবাই ঝুঁকছেন। এসব সিনেমায় নারী চরিত্রের ভূমিকা নিয়ে যত কম বলা যায়, ততই ভালো। দর্শকের দৃষ্টিভঙ্গিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
ঝুঁকি এড়িয়ে চলা
এটি এমন একটি ইন্ডাস্ট্রিতে, যেখানে একজন অভিনেতার শেষ সিনেমার ফলাফলই অনেকটা তার অবস্থান নির্ধারণ করে। অভিনেত্রীরা বুঝতে পারছেন যে একটি সিনেমা বক্স অফিসে ব্যর্থ হলে শুধু সেই সিনেমার বাজেটই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, তাদের নিজস্ব ব্র্যান্ডমূল্যও কমে যায়। যখন একজন অভিনেতার বাজারমূল্য তার সর্বশেষ সিনেমার সাফল্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, তখন নতুন সিনেমার সেটে পা রাখাও অনেকটা অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি হয়ে যায়। বক্স অফিসের অনিশ্চয়তা থেকে নিজেদের দূরে রেখে এই তারকারা নিজেদের করপোরেট পার্টনারশিপ ও ব্র্যান্ডমূল্যকে সিনেমার ব্যর্থতার প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখছেন। একটি শক্তিশালী বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য যখন প্রায় ঝুঁকিমুক্তভাবে চলছে, তখন কেন সেটিকে একটি উচ্চঝুঁকির থিয়েট্রিক্যাল সিনেমার জন্য বাজি ধরবেন?
সিদ্ধান্তটা ব্যক্তিগত
তারকা অভিনেতারাও যে কাজ থেকে বিরতি নেন না, তা নয়। শাহরুখ খান ২০১৮ সালে ‘জিরো’ সিনেমা মুক্তির পর দীর্ঘ বিরতিতে ছিলেন। ২০২৩ সালে ফিরে ‘পাঠান’, ‘জওয়ান’ ও ‘ডানকি’-এর মতো সিনেমা উপহার দেন। আমির খানও কয়েক বছর পরপর একটি সিনেমায় অভিনয় করার জন্য পরিচিত। তবু তাদের তারকাখ্যাতিতে কোনো ভাটা পড়েনি। তাহলে অভিনেত্রীরা কেন একই কাজ করতে পারবেন না?
প্রদর্শক ও পরিবেশক অক্ষয় রাঠি মনে করেন, “এটি পুরোপুরি ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। কারিনা কাপুর খান কিংবা ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চনের মতো অভিনেত্রীরা কয়েক দশকে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। তাদের তারকাখ্যাতি এক রাতের মধ্যে তৈরি হয়নি। দর্শক সবসময়ই তাদের বড়পর্দায় দেখতে আগ্রহী। একইসঙ্গে ধীরে কাজ করার সিদ্ধান্ত নতুন প্রজন্মের অভিনেত্রীদেরও উজ্জ্বল হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। হিন্দি সিনেমায় প্রতি শুক্রবারই ভাগ্য বদলে যেতে পারে। তাই বছরের পর বছর ধরে তৈরি তারকাখ্যাতি থাকলেও এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, চলচ্চিত্রশিল্প অত্যন্ত কঠিন ও প্রতিযোগিতামূলক জায়গা।”
‘কুইন বি’ সিনড্রোম
অভিনেত্রীদের হাতে থাকা এই ক্ষমতা দুই ধারবিশিষ্ট তলোয়ারের মতো। নিঃসন্দেহে তারা একটি সিনেমার বাজারমূল্য বাড়িয়ে দেন। কিন্তু বড় বাজেটের থিয়েট্রিক্যাল সিনেমা তৈরি করা এখন আর্থিকভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। শীর্ষস্থানীয় একজন অভিনেত্রীর উচ্চ পারিশ্রমিকের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত টিম, অন্যান্য চাহিদা ও আনুষঙ্গিক খরচ যোগ হয়ে সিনেমাটির বাজেট অনেক সময় অসহনীয় পর্যায়ে চলে যায়। একজন নায়ক যেখানে সব ধরনের সুবিধা পান, সেখানে শেষ পর্যন্ত একজন অভিনেত্রী বাদ পড়েন। বাজেটের কথা চিন্তা করে প্রযোজকেরা ক্রমেই কম পারিশ্রমিকের তরুণ অভিনেত্রীদের দিকে ঝুঁকছেন। দীপিকা পাডুকোন ‘স্পিরিট’ থেকে সরে দাঁড়ানোর একদিন পরই তৃপ্তি দিমরি সেই জায়গা নেন। আবার ‘কল্কি টু’ সিনেমায় দীপিকার জায়গা নিয়েছেন সাই পল্লবী।
পরিচালক আব্বাস বার্মাওয়ালা বলেন, “কোনো নির্মাতা যদি একজন শীর্ষস্থানীয় অভিনেত্রীকে নিতে চান, তাহলে তার চাহিদামতো পারিশ্রমিক দিতে প্রস্তুত থাকতে হবে।” তার এই বক্তব্যের যথেষ্ট ভিত্তিও রয়েছে। প্রভাসের সিনেমাগুলো থেকে দীপিকা বাদ পড়লেও, নিজের শর্তমতে শাহরুখ খানের সিনেমায় কাজ পেয়েছেন। অন্যদিকে, মালহোত্রা বাজেটের এই তত্ত্ব খারিজ করে দিয়েছেন। তার মতে, “একটি সিনেমার চূড়ান্ত ব্যয় নির্ধারণের সময় সব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। এটি শুধু অভিনেত্রীর পারিশ্রমিকের ওপর নির্ভর করে না। এখনকার সিনেমাগুলোও আর সেই পুরোনো ধরনের নেই, যেখানে নায়িকাকে শুধু নায়কের সঙ্গে গাছের চারপাশে নাচানোর জন্য নেওয়া হতো।”
ব্র্যান্ডই মূল শক্তি
একজন তারকার বাণিজ্যিক সক্ষমতা নির্ধারিত হয় বক্স অফিস সাফল্য ও ডিজিটাল উপস্থিতির মাধ্যমে। এই দুইয়ের সমন্বয়ই এখন বিকল্প ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের ভিত্তি তৈরি করছে, যা অনেক সময় প্রচলিত সিনেমা থেকে পাওয়া আয়ের চেয়েও অধিক লাভজনক। একটি সিনেমায় শারীরিক ও সময়ের বিনিয়োগ বছরে কয়েকটি প্রকল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু করপোরেট দুনিয়ায় একজন তারকা একই সময়ে ৩০-৪০টি ব্র্যান্ডের মুখ হতে পারেন। এর সঙ্গে রয়েছে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, বিয়ে এবং স্টেজ পারফরম্যান্সের মতো আয়ের উৎস, যেখানে মাত্র ১০ মিনিটের উপস্থিতির জন্যও কোটি কোটি টাকা পাওয়া সম্ভব। যার ফলে সিনেমা এখন অনেকটা ভালোবাসা বা ‘প্যাশন প্রজেক্ট’। আর অর্থ ও ব্যবসাই হয়ে উঠেছে শীর্ষ অভিনেত্রীদের প্রকৃত শক্তির কেন্দ্র।
ভয়েস/আআ