রবিবার, ২৮ Jun ২০২৬, ০১:১৪ অপরাহ্ন
২০১৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন টেকনাফের ১০২ চিহ্নিত আত্মস্বীকৃত মাদক কারবারি। ছবি : সংগৃহীত ভয়েস নিউজ ডেস্ক:
টেকনাফে ২০১৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রথম দফায় নিজদের ইয়াবা কারবারি শিকার করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন ১০২ জন। যার মধ্যে ছিলেন টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের মোহাম্মদ জামাল প্রকাশ বা জামাল মেম্বার ও তার ছেলে শাহ আজম। আত্মসমর্পণের পর পুলিশের করা দুইটি মামলায় সবার সঙ্গে তারাও গিয়েছিলেন কারাগারে। জামিনে মুক্তির শর্তও ছিল আর ইয়াবা কারবারে না জড়ানোর। তারা অঙ্গীকারও করেছিলেন জড়াবেন না আর কারবারে। তবে মুক্তির পর আবার তারাই নিয়ন্ত্রণ করছেন সংশিষ্ট এলাকার ইয়াবার কারবার।
জমিনে মুক্তির পর শাহ আজম ২০২১ সালের ২৩ মে পুলিশের অভিযানে ইয়াবাসহ আবারও আটক হন। ওই দিন ১০ হাজার ইয়াবাসহ শাহ আজমের আরও ৩ সহযোগীকে আটক করেছিল পুলিশ।
কক্সবাজারে মাদক প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে কাজ করে ‘কক্সবাজার পিপলস্ ফোরাম’ নামের একটি সংগঠন। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ইকবাল জানান, দুই দফায় ১২৩ জন শীর্ষ মাদক কারবারি অস্ত্র ও মাদক জমা দিয়ে আর তাতে জড়াবেন না বলে শপথ নিলেও পরে জামিনে মুক্তি পেয়ে কেউই কথা রাখেননি। সবাই আবার জড়িয়েছেন সেই কারবারে।
কক্সবাজার পিপলস্ ফোরাম গত এক বছর ধরে করা এক জরিপে দাবি করেছে, জামিনে মুক্তি পেয়ে কৌশলে আবারও তারা পুরোদমে ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ বা আইসের মতো ভয়ানক সব মাদক কারবারে জড়িয়েছেন।
এসব কারবারি নিয়ন্ত্রণে ক্ষমতার চর্চা করতে এই সময়ের অসংখ্য টাকা খরচ করে তাদের অনেকেই এলাকার জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন বলেও দাবি করে সংগঠনটি।
একই সঙ্গে একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে জামিনে মুক্তি পেয়ে আত্মসমর্পণকারীদের আবারও মাদক কারবারে জড়ানোর তথ্য।
স্থানীয়রা জানান, টেকনাফের আলোচিত ইয়াবা কারবারি ছিলেন হাজি সাইফুল ইসলাম। ২০২০ সালের দ্বিতীয় দফায় আত্মসমর্পণের উদ্দেশ্যে প্রকাশ্যে এলে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন তিনি। তার দুই শ্যালক জিয়াউর রহমান ও আবদুর রহমানও প্রথম দফায় আত্মসমর্পণ করেন। সাইফুল নিহতের পর তারা দুজনই জামিনে মুক্তি পান। এরপর তারা সাইফুলের মাদক কারবারির পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছেন। এখন সাইফুলের শ্যালক জিয়াউর রহমান টেকনাফ সদর ইউনিয়নের নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন জিয়াউর রহমান।
দুই সংস্থার প্রতিবেদনেই বলা হয়, আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে রেজাউল করিম, এনামুল হক, নুরুল বশর নুরশাদসহ অনেকেই ফের ইয়াবা কারবারে জড়িয়েছে। আত্মসমর্পণে বহুল আলোচিত সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির ভাই-বেয়াইসহ আট স্বজন ছিলেন। যারা এসেই নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন ইয়াবার কারবার।
সরকারি ওই গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য বলছে, আত্মসমর্পণকারীরা সবাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ছিল। জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তারা শর্ত ভেঙেছেন। অন্যদের সঙ্গে ঘুরে-ফিরে তারাই গডফাদারের ভূমিকায় উঠে আসছেন।
টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নুরুল বশর বলেন, তারা অঙ্গীকার করে মুক্তি পেয়েছেন। তবে আত্মসমর্পণকারী কেউই আর স্বাভাবিক জীবনে ফেরত আসেননি। আগের মতোই কারবারে জড়িত তারা।
একই কথা জানান আত্মসমর্পণে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে সহযোগিতাকারী একটি বেরসকারি টেলিভিশনের সাংবাদিক আকরাম হোসেনও।
এমন পরিস্থিতে আগামী বুধবার (২৩ নভেম্বর) প্রথম দফায় আত্মসমর্পণ করা ১০১ ইয়াবা কারবারির বিরুদ্ধে করা দুটি মামলার রায় ঘোষণার দিন ঠিক করেছে আদালত। আগের শুনানিতে আদালতে হাজির থাকা ১৭ আসামির জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানো আদেশ দেয়া হয়। জামিনে থাকার পরও শুনানিতে আদালতে হারিজ না হওয়া অন্য ৮৪ জনের জামিন বাতিল করেছে আদালত।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) ফরিদুল আলম বলেন, ‘ধার্য্য দিন এই মামলার রায় ঘোষণা করবেন কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল। ইয়াবা কারবারি হিসেবে এরা সকলেই আত্মসমর্পণ করেছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষ এদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে সকল কিছু বিচারকের কাছে উপস্থাপন করেছে।’
মামলার এজাহার থেকে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি টেকনাফ সদরের টেকনাফ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের উপস্থিতিতে ১০২ জন আত্মস্বীকৃত ইয়াবা কারবারি ও গডফাদার সাড়ে ৩ লাখ ইয়াবা, ৩০টি দেশিয় বন্দুক ও ৭০ রাউন্ড গুলিসহ আত্মসমর্পণ করেন।
সে দিন আত্মসমর্পণকারী ১০২ জনকে আসামি করে টেকনাফ মডেল থানায় অস্ত্র ও মাদক আইনে মামলা হয়। মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আসামিদের কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। বিচারিক কাজ চলাকালে ২০১৯ সালের ৭ আগস্ট মোহাম্মদ রাসেল নামে এক আসামি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
২০২০ সালের ২০ জানুয়ারি আদালতে ১০১ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা। পরে মামলাটি বিচারের জন্য জেলা ও দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হয়। একই বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ ইসমাইল আসামিদের উপস্থিতিতে শুনানি শেষে মামলার অভিযোগ গঠন করে বিচারকাজ শুরু করেন। বিচার শেষে গত ১৫ নভেম্বর মামলার রায় ঘোষণার জন্য ২৩ নভেম্বর দিন ঠিক করে দেন বিচারক।
কারাগারে পাঠানো ১৭ জন
নুরুল হুদা, শাহ আলম, আব্দুর রহমান, ফরিদ আলম, মাহবুব আলম, রশিদ আহমেদ, মোহাম্মদ তৈয়ব, জাফর আলম, মোহাম্মদ হাশেম ওরফে আংকু, আবু তৈয়ব, আলী নেওয়াজ, মোহাম্মদ আইয়ুব, কামাল হোসেন, নুরুল বশর ওরফে কালাভাই, আব্দুল করিম ওরফে করিম মাঝি, দিল মোহাম্মদ, মো. সাকের মিয়া ওরফে সাকের মাঝি।
জামিন বাতিল হওয়া ৮৪ আসামি
সাবেক এমপি বদির ভাই আব্দুর শুক্কুর, বদির ভাই আমিনুর রহমান ওরফে আব্দুল আমিন, দিদার মিয়া, বদির ভাগনে মো. সাহেদ রহমান নিপু, আব্দুল আমিন, নুরুল আমিন, বদির ভাই শফিকুল ইসলাম ওরফে শফিক, বদির ভাই ফয়সাল রহমান, এনামুল হক ওরফে এনাম মেম্বার, একরাম হোসেন, ছৈয়দ হোসেন, বদির বেয়াই সাহেদ কামাল ওরফে সাহেদ, মৌলভী বশির আহমদ, আব্দুর রহমান, মোজাম্মেল হক, জোবাইর হোসেন, নুরুল বশর ওরফে কাউন্সিলার নুরশাদ, বদির ফুপাত ভাই কামরুল হাসান রাসেল, বর্তমানে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান ওরফে জিহাদ, মোহাম্মদ শাহ, নুরুল কবির, মারুফ বিন খলিল ওরফে বাবু, মোহাম্মদ ইউনুচ, ছৈয়দ হোসেন ওরফে ছৈয়দু, মোহাম্মদ জামাল ওরফে জামাল মেম্বার, মো. হাসান আব্দুল্লাহ, রেজাউল করিম ওরফে রেজাউল মেম্বার, মো. আবু তাহের, রমজান আলী, মোহাম্মদ আফছার, হাবিবুর রহমান ওরফে নুর হাবিব, শামসুল আলম ওরফে শামশু মেম্বার, মোহাম্মদ ইসমাঈল, আব্দুল গনি, মোহাম্মদ আলী, জামাল হোসেন, আব্দুল হামিদ, নজরুল ইসলাম।
এ ছাড়া মোয়াজ্জেম হোসেন ওরফে দানু, মোহাম্মদ সিরাজ, মোহাম্মদ আলম, মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, হোসেন আলী, নুরুল কবির মিঝি, শাহ আজম, জাফর আহমেদ ওরফে জাফর, রুস্তম আলী, মোহাম্মদ হোছাইন, নুরুল আলম, শফি উল্লাহ, মো. জহুর আলম, মোহাম্মদ হুসাইন, মোহাম্মদ সিদ্দিক, রবিউল আলম, মঞ্জুর আলী, হামিদ হোসেন, মোহাম্মদ আলম, নুরুল আমিন, বোরহান উদ্দিন, ইমান হোসেন, মোহাম্মদ হারুন, শওকত আলম, হোছাইন আহম্মদ, মোহাম্মদ আইয়ুব, মো. আবু ছৈয়দ, মো. রহিম উল্লাহ, মোহাম্মদ রফিক, মোহাম্মদ সেলিম, নুর মোহাম্মদ, বদির খালাত ভাই মং অং থেইন ওরফে মমচি, মোহাম্মদ হেলাল, বদিউর রহমান ওরফে বদুরান, ছৈয়দ আলী, মোহাম্মদ হাছন, নুরুল আলম, আব্দুল কুদ্দুস, আলী আহম্মেদ, আলমগীর ফয়সাল ওরফে লিটন, জাহাঙ্গীর আলম, নুরুল আলম, সামছুল আলম শামীম, মোহাম্মদ ইউনুচ, নুরুল আফসার ওরফে আফসার উদ্দিন, মোহাম্মদ শাহজাহান আনছারী। সূত্র:প্রতিদিনের বাংলাদেশ।
ভয়েস /জেইউ।