মঙ্গলবার, ১৮ Jun ২০২৪, ০২:০০ অপরাহ্ন

দৃষ্টি দিন:
সম্মানিত পাঠক, আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। প্রতিমুহূর্তের সংবাদ জানতে ভিজিট করুন -www.coxsbazarvoice.com, আর নতুন নতুন ভিডিও পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল Cox's Bazar Voice. ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন এবং কমেন্ট করুন। ধন্যবাদ।

হতাশা কাটাতে কোরআনের নির্দেশনা

মাওলানা ওয়ালি উল্লাহ:
দুনিয়ার জীবন আল্লাহতায়ালা বানিয়েছেন আখেরাতের জন্য। আরাম-আয়েশ ও ভোগবিলাসের জন্য আল্লাহ দুনিয়ার জীবন বানাননি। তাই দুনিয়ার জীবনে আল্লাহ কাউকে শুধু সুখ আর সুখ দেননি। এখানে যে সবচেয়ে সুখী তাকেও মাঝেমধ্যে দুঃখ পেতে হয়; যে সবচেয়ে সুস্থ তাকেও কখনো কখনো অসুস্থ হতে হয়।

তবে একজন মুমিনের জীবনের উদ্দেশ যেহেতু আখেরাত, তাই তার দুনিয়ার জীবনের বিপদাপদ, রোগশোক, দুঃখ-দুর্দশা মোটেই নিরর্থক নয়। আল্লাহ চান, দুনিয়ার এ অল্প কয়েক দিনের কষ্টের বিনিময়ে বান্দা লাভ করুক আখেরাতের অফুরন্ত শান্তি। পবিত্র কোরআন বারবার এদিকেই মুমিনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। যখনই কোনো বিপদ আসে, কোরআন মুমিনকে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী ভবিষ্যতের পরিবর্তে আখেরাতের চিরস্থায়ী ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করতে বলে। মানব জাতির জন্য কোরআন মাজিদের বিভিন্ন বাণী ও বার্তায় রয়েছে অনেক অনেক শিক্ষা।

এ ক্ষেত্রে প্রথমেই উল্লেখ করা যায় হজরত ইয়াকুব (আ.)-এর ঘটনা। সেই বহু বছর আগে হারিয়েছেন নিজের প্রিয়তম পুত্র হজরত ইউসুফ (আ.)-কে। তার বিয়োগ-ব্যথায় এবং তাকে পাওয়ার আশায় যৌবন কেটে গেল। বৃদ্ধকালে যখন হজরত ইউসুফ (আ.)-কে পাওয়ার আশায় আবার বুক বাঁধলেন তখন হজরত ইউসুফ (আ.)-এর অপর ভাইকেও হারালেন। বার্ধক্যজনিত দুর্বলতা, দৃষ্টিশক্তির ক্ষীণতা, নতুন করে সন্তান হারানোর ঘটনা যেন হজরত ইউসুফ (আ.)-কে হারানোর বেদনা পুনরায় জাগিয়ে দিল। এমন কঠিন পরিস্থিতিতেও তিনি হাল ছাড়লেন না। আল্লাহর রহমতের প্রতি অবিচল আস্থা-বিশ্বাস নিয়ে তিনি বললেন, ‘আমি আমার দুঃখ ও বেদনার অভিযোগ (তোমাদের কাছে নয়) আল্লাহর কাছে করছি। আর আল্লাহ সম্পর্কে আমি যতটা জানি, তোমরা ততটা জানো না। ওহে আমার পুত্ররা, তোমরা যাও এবং ইউসুফ ও তার ভাইয়ের সন্ধান চালাও। তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। জেনে রেখো, আল্লাহর রহমত থেকে কেবল তারাই নিরাশ হয়, যারা কাফের।’-সুরা ইউসুফ: ৮৬-৮৭

এ ঘটনা থেকে বোঝা গেল, দুনিয়ার কঠিন থেকে কঠিন বিপদেও আল্লাহর রহমত থেকে হতাশ হওয়া যাবে না; বিপদের পর বিপদের সম্মুখীন হলেও না। আল্লাহর রহমতের কাছে আশা রাখতে হবে, ইনশা আল্লাহ, সব বিপদ কেটে যাবে। বিপদ যদি নাও কাটে, তবু চিন্তা কীসের, আল্লাহ তো এর বিনিময়ে আখেরাতে অনেক অনেক বেশি দেবেন। তা ছাড়া এমনও তো হতে পারে, এ বিপদটিকে আমি মনে করছি বিপদ, কিন্তু বাস্তবে সেটি আমার জন্য কল্যাণকর। দুনিয়ায় এমন কত কত ঘটনা রয়েছে, যেখানে আপাত দৃশ্যমান বিপদ-পরিণামে কল্যাণকর প্রমাণিত হয়েছে। সুরা বাকারায় ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমাদের প্রতি (শত্রুর সঙ্গে) যুদ্ধ ফরজ করা হয়েছে। এটা তো খুবই সম্ভব যে, তোমরা একটা জিনিসকে মন্দ মনে কর, অথচ তোমাদের পক্ষে তা মঙ্গলজনক ও কল্যাণকর। আর এটাও সম্ভব যে, একটা জিনিসকে পছন্দ কর, অথচ বিষয়টি তোমাদের পক্ষে মন্দ ও অকল্যাণকর। আর (প্রকৃত বিষয় তো) আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।’-সুরা বাকারা: ২২৬

আয়াতটিতে দৈনন্দিন জীবনের হতাশাজনক পরিস্থিতিতে কী মনোভাব রাখতে হবে এ বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। জীবন চলার পথে চিন্তা-চেতনায় এই আয়াতকে সামনে রাখলে আমাদের পার্থিব জীবনও বড় শান্তির হতে পারে।

হতাশা যদি আসে গোনাহের কারণে, ইমান-আমল ও আখেরাতের প্রতি উদাসীনতার কারণে, তাহলেও হাতাশাকে মনে জায়গা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আল্লাহ তো অতি দয়ালু, পরম ক্ষমাশীল। তিনি সব গোনাহ ক্ষমা করে দিতে পারেন। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘বলে দাও, হে আমার বান্দারা! যারা নিজ সত্তার ওপর সীমালঙ্ঘন করেছে, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত পাপ ক্ষমা করেন। নিশ্চয় তিনি অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’-সুরা জুমার: ৫৩

সুতরাং যখনই কোনো বিপদ আসে, মনে করতে হবে, এর সঙ্গে নিশ্চয় এর চেয়ে দ্বিগুণ স্বস্তি আমার জন্য অপেক্ষা করছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘প্রকৃতপক্ষে কষ্টের সঙ্গে স্বস্তিও থাকে। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তিও থাকে।’-সুরা ইনশিরাহ: ৫-৬

স্বস্তি কখন আসবে, কীভাবে আসবে; কখন বিপদ দূর হবে, কীভাবে দূর হবে-এর জন্য তাড়াহুড়া করা যাবে না। আল্লাহর পক্ষ থেকে এর সময় ও ধরন নির্ধারিত। আল্লাহর কাছে বিশ্বজগতের প্রতিটি জিনিসের একটি মাপজোখ ঠিক করা আছে। সুখ যেমন চিরদিন থাকে না, তেমনি কোনো বিপদও চিরস্থায়ী হয় না। যত দিন আল্লাহ লিখে রেখেছেন তত দিন থাকবে। বিষয়টি কারও বুঝে আসুক বা না আসুক, মনে করতে হবে, এর মধ্যে অবশ্যই আমার জন্য কোনো না কোনো কল্যাণ নিহিত আছে। যখন এভাবে নিজেকে আল্লাহর ফায়সালার সামনে সঁপে দেবে তখন অন্তরে আল্লাহ একধরনের প্রশান্তি ঢেলে দেবেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘পৃথিবীতে অথবা তোমাদের প্রাণের ওপর যে মুসিবত দেখা দেয় তার মধ্যে এমন কোনোটিই নেই, যা সেই সময় থেকে এক কিতাবে লিপিবদ্ধ নেই, যখন আমি সেই প্রাণসমূহ সৃষ্টি করিনি। নিশ্চয়ই এটা আল্লাহর পক্ষে অতি সহজ। তা এ জন্য যে, তোমরা যা হারিয়েছ, তার জন্য যাতে দুঃখিত না হও এবং যা আল্লাহ তোমাদের দান করেছেন তার জন্য উল্লসিত না হও। আল্লাহ এমন ব্যক্তিকে পছন্দ করেন না, যে দর্প দেখায় ও বড়ত্ব প্রকাশ করে।’-সুরা হাদিদ: ২২-২৩

জীবন চলার পথে যদি বিষয়গুলো সামনে রাখি এবং যেকোনো হতাশায় নিজের ওস্তাদ, মুরব্বি, মা-বাবা, ভাইবোন ও অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের সাহচর্য অবলম্বন করি, তাদের সঙ্গে নিজেদের মনের দুঃখকষ্ট ভাগাভাগি করি, সর্বোপরি নির্জনে হাত তুলে আল্লাহর কাছে চোখের পানি ফেলি, তাহলে এই হতাশাই হতে পারে আমাদের জীবনে আশার আলো। বিপদাপদ হতে পারে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম মাধ্যম।

ভয়েস/আআ

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023
Developed by : JM IT SOLUTION