শনিবার, ০৯ মে ২০২৬, ০৭:৫১ অপরাহ্ন

দৃষ্টি দিন:
সম্মানিত পাঠক, আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। প্রতিমুহূর্তের সংবাদ জানতে ভিজিট করুন -www.coxsbazarvoice.com, আর নতুন নতুন ভিডিও পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল Cox's Bazar Voice. ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন এবং কমেন্ট করুন। ধন্যবাদ।

ইরান যুদ্ধের সম্ভাব্য পরিণতি যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চাদপসরণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তার পরিণতি সম্ভবত হবে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চাদপসরণ। ভয়াবহ পরিণতি ডেকে না এনে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

নতুন করে যুদ্ধের মাত্রা বাড়ানো হলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল, গ্যাস ও সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণ অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা দীর্ঘস্থায়ী বৈশ্বিক বিপর্যয় তৈরি করতে পারে। ইরান এমন ক্ষতির বোঝা চাপাতে সক্ষম, যা যুক্তরাষ্ট্র বহন করতে পারবে না এবং বিশ্বও যার মূল্য দিতে চাইবে না।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ পরিকল্পনার মূল ছিল একটি ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’ বা নেতৃত্ব নিশ্চিহ্ন করার হামলা। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মোসাদপ্রধান ডেভিড বার্নিয়া প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বোঝান যে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ বোমা হামলা ইরানের শাসনব্যবস্থার কমান্ড কাঠামো, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আইআরজিসির শীর্ষ নেতৃত্বকে এতটাই দুর্বল করে দেবে যে সরকার ভেঙে পড়বে।

এরপর তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত একটি সরকার বসানো সম্ভব হবে।
মনে হচ্ছে ট্রাম্প বিশ্বাস করেছিলেন, ইরানেও ভেনেজুয়েলার মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার ঘটনায় সিআইএ ও ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরের কিছু অংশের সমন্বিত ভূমিকা ছিল বলে ধারণা করা হয়। ওই ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র একটি আরও অনুগত সরকার পেয়েছিল, যদিও ভেনেজুয়েলার ক্ষমতার বড় অংশের কাঠামো অক্ষত ছিল। ট্রাম্প সম্ভবত সরলভাবে বিশ্বাস করেছিলেন, ইরানেও একই ফল হবে।
কিন্তু ইরান অভিযান তেহরানে কোনো অনুগত সরকার তৈরি করতে পারেনি। ইতিহাস, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, ভূগোল, সামরিক শক্তি, জনসংখ্যা কিংবা ভূরাজনীতির দিক থেকে ইরান ভেনেজুয়েলা নয়। কারাকাসে যা ঘটেছিল, তার সঙ্গে তেহরানে কী ঘটবে তার খুব সামান্যই সম্পর্ক ছিল।

ইরানের সরকার ভেঙে পড়েনি। বরং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) নেতৃত্ব হারানোর বদলে আরও সুসংগঠিত অভ্যন্তরীণ কমান্ড গড়ে তুলেছে এবং জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোয় তাদের ভূমিকা বেড়েছে। সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয় টিকে গেছে; ধর্মীয় নেতৃত্ব তাদের পেছনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে; এবং জনগণ বিদেশি হামলার বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষে একত্র হয়েছে।

দুই মাস পর ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর হাতে নেই কোনো ইরানি বিকল্প সরকার, নেই ইরানের আত্মসমর্পণ এবং সামরিক বিজয়ের কোনো পথও নেই। একমাত্র সম্ভাব্য পথ এবং যেদিকে যুক্তরাষ্ট্র এগোচ্ছে বলে মনে হচ্ছে, তা হলো পশ্চাদপসরণ, যেখানে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ থাকবে ইরানের হাতে এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বিরোধের অন্য কোনো ইস্যুর সমাধান হবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের ভয়াবহ ভুল হিসাব এবং ইরানের সাফল্যের পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে।

প্রথমত, মার্কিন নেতারা মৌলিকভাবে ইরানকে ভুলভাবে মূল্যায়ন করেছেন। ইরান পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাসসমৃদ্ধ একটি মহান সভ্যতা, যার রয়েছে গভীর সংস্কৃতি, জাতীয় স্থিতিস্থাপকতা ও আত্মমর্যাদা। যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও বোমা হামলায় ইরান নতি স্বীকার করবে না, এটা অনুমান করা উচিত ছিল। বিশেষ করে ইরানিরা এখনো মনে রাখে, ১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ২৭ বছরব্যাপী একটি পুলিশি শাসনব্যবস্থা কায়েম করেছিল।

দ্বিতীয়ত, মার্কিন নেতারা ইরানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে ভয়াবহভাবে অবমূল্যায়ন করেছেন। ইরানের রয়েছে বিশ্বমানের প্রকৌশল ও গণিত দক্ষতা। তারা নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলেছে, যার মধ্যে রয়েছে উন্নত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, দেশীয় ড্রোন শিল্প এবং নিজস্ব মহাকাশ উৎক্ষেপণ সক্ষমতা। ৪০ বছরের কঠোর নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরানের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি একটি বিস্ময়কর জাতীয় অর্জন।

তৃতীয়ত, সামরিক প্রযুক্তির পরিবর্তন এখন ইরানের পক্ষে কাজ করছে। ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের খরচ, সেগুলো ঠেকাতে ব্যবহৃত মার্কিন প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় খুবই কম। ইরানি ড্রোনের দাম ২০ হাজার ডলার, আর মার্কিন প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের দাম ৪০ লাখ ডলার। কয়েক লাখ ডলারের ইরানি অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্র কয়েক বিলিয়ন ডলারের মার্কিন ডেস্ট্রয়ারের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাপক সক্ষমতা এবং হরমুজ প্রণালীতে সমুদ্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যুদ্ধের খরচকে অসহনীয় করে তুলেছে, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলার বিষয়টি বিবেচনায় নিলে।

চতুর্থত, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া অযৌক্তিক হয়ে পড়েছে। ইরান যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল মার-আ-লাগোতে প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ ছোট একটি গোষ্ঠীর মাধ্যমে, কোনো আনুষ্ঠানিক আন্তঃসংস্থাগত প্রক্রিয়া ছাড়াই। আগের এক বছরে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। ট্রাম্পের ন্যাশনাল কাউন্টারটেররিজম সেন্টারের পরিচালক জো কেন্ট ১৭ মার্চ পদত্যাগ করেন এবং এক খোলা চিঠিতে তিনি ‘একটি প্রতিধ্বনি কক্ষ বা ‘ইকো চেম্বার’-এর কথা উল্লেখ করেন, যা প্রেসিডেন্টকে বিভ্রান্ত করতে ব্যবহৃত হয়েছিল। অর্থাৎ এমন একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ কাঠামো থেকে এই যুদ্ধের জন্ম হয়েছে, যেখানে বাস্তব আলোচনার সুযোগই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

এটি প্রয়োজনের যুদ্ধ ছিল না, এমনকি কৌশলগত পছন্দের যুদ্ধও নয়। এটি ছিল খামখেয়ালিপূর্ণ যুদ্ধ। এর পেছনের মূল ধারণা ছিল আধিপত্যবাদ। যুক্তরাষ্ট্র এমন এক বৈশ্বিক আধিপত্য ধরে রাখতে চাইছে, যা এখন আর তার হাতে নেই। আর ইসরায়েল এমন আঞ্চলিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, যা তারা কখনোই অর্জন করতে পারবে না।

এই পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য পরিণতি হলো, যুদ্ধ শেষ হবে প্রায় আগের অবস্থায় ফিরে গিয়ে, তবে তিনটি নতুন বাস্তবতা নিয়ে। প্রথমত, হরমুজ প্রণালীর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ থাকবে ইরানের হাতে। দ্বিতীয়ত, ইরানের প্রতিরোধ সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। তৃতীয়ত, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি কমে যাবে। অথচ যেসব ইস্যুকে সামনে এনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালিয়েছিল, যেমন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠী বা ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার—সেগুলোর অবস্থান প্রায় অপরিবর্তিতই থাকবে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র পিছু হটলেও ইরান তার প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে এই সুবিধা কাজে লাগাবে না। এর তিনটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, ইরানের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থ উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে সহযোগিতায়, চলমান যুদ্ধে নয়। দ্বিতীয়ত, সদ্য সফলভাবে শেষ করা একটি যুদ্ধ আবার শুরু করার আগ্রহ ইরানের থাকবে না। তৃতীয়ত, প্রয়োজন হলে রাশিয়া ও চীনের মতো তাদের বড় মিত্ররা ইরানকে সংযত রাখবে, কারণ তারাও একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ অঞ্চল চায়। ইরানের নেতৃত্ব এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে বোঝে এবং সংঘাত থামাবে।

ট্রাম্প নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতের এই পশ্চাদপসরণকে বড় ধরনের সামরিক ও কৌশলগত বিজয় হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করবেন। কিন্তু বাস্তবতা তা নয়। বাস্তবতা হলো, ইরানকে যুক্তরাষ্ট্র যতটা দুর্বল ভেবেছিল, দেশটি তার চেয়ে অনেক বেশি পরিশীলিত ও সক্ষম। যুদ্ধের সিদ্ধান্ত ছিল অযৌক্তিক এবং যুদ্ধ প্রযুক্তির পরিবর্তন এখন যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে চলে গেছে।

গ্রহণযোগ্য আর্থিক, সামরিক ও রাজনৈতিক খরচে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ জিততে পারবে না। তবে তারা চাইলে এখনো বাস্তববাদে ফিরতে পারে। সময় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের শাসন পরিবর্তনের নীতি বন্ধ করে আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতিতে ফিরে যাওয়ার।

জেফরি স্যাকস: কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সেন্টার ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের পরিচালক। তিনি জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশনস নেটওয়ার্কের প্রেসিডেন্ট এবং জাতিসংঘের ব্রডব্যান্ড কমিশন ফর ডেভেলপমেন্টের কমিশনারও।

সিবিল ফারেস: জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশনস নেটওয়ার্কের মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা বিষয়ক উপদেষ্টা।

সূত্র: আল জাজিরা

ভয়েস/আআ

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023
Developed by : JM IT SOLUTION