বুধবার, ২৪ Jun ২০২৬, ১০:২০ পূর্বাহ্ন

দৃষ্টি দিন:
সম্মানিত পাঠক, আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। প্রতিমুহূর্তের সংবাদ জানতে ভিজিট করুন -www.coxsbazarvoice.com, আর নতুন নতুন ভিডিও পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল Cox's Bazar Voice. ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন এবং কমেন্ট করুন। ধন্যবাদ।

স্বর্ণের সন্ধানে তছনছ অ্যামাজন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

১১ই মে। মধ্যদুপুর। দারিয়ো কোপেনাওয়াকে কল দিয়েছেন এক ব্যক্তি। অপর প্রান্ত থেকে মরিয়া কণ্ঠে এক লোক বলছে, ‘তারা আমাদের উপর হামলা চালিয়েছে। আমাদের প্রায় মেরে ফেলেছে।’ এখানে তাদের বলতে ‘গারিমপেইরোস’ বা অবৈধ স্বর্ণ খননকারী লোকদের বুঝাচ্ছিলেন ওই ব্যক্তি। মোটরবোটে করে গিয়ে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়ে আদিবাসীদের উপর হামলা চালিয়েছে তারা।

কোপেনাওয়া ব্রাজিলের অ্যামাজন বনের গভীরে অবস্থিত পালিমিও গ্রামের ইয়ানোমামি আদিবাসী গোত্রের নেতা। উরারিসেওরা নদীর পাশে অবস্থিত গ্রামটিতে প্রায় ১০০০ মানুষের বসবাস।

বিমান বা নৌকা ছাড়া সেখানে যাওয়ার উপায় নেই। গ্রামের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গোত্রের মানুষজন প্রায়ই তার কাছ থেকে সাহায্য চেয়ে মরিয়া হয়ে ফোন করেন।

তবে মে মাসের ওই ফোনকল ছিল একটু আলাদা। অবৈধ স্বর্ণ তল্লাশি দল স্বর্ণের সন্ধানে গিয়ে অস্ত্র নিয়ে আদিবাসীদের উপর নির্বিচারে গুলি চালায়। ইয়ানোমানিরা শটগান ও তীর নিয়ে সে হামলার পাল্টা জবাব দেওয়ার চেষ্টা করে। আধা ঘণ্টা লড়াইয়ের পর পিছু হটতে বাধ্য হয় হামলাকারীরা। তবে আবারও ফিরে আসার হুমকি দিয়ে যায় তারা। ওই ঘটনায় চার আদিবাসী আহত হন। ভয়ে গহীন জঙ্গলে শিশুদের নিয়ে পালান নারীরা। পালানোর পথে পানিতে ডুবে মারা যায় দুই শিশু।

পালিমিও নামে ওই জায়গা ব্রাজিলের আদিবাসীদের জন্য সংরক্ষিত অঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত। পর্তুগালের মত সমান ওই অঞ্চলে প্রায় ২৭ হাজার মানুষ বাস করেন। সেখানে খনি খোঁড়ার কাজ অবৈধ থাকলেও প্রায়ই বিভিন্ন দল নানা কৌশল খাটিয়ে খনন চালিয়ে যায়।

কোপেনাওয়া জানান, গারিমপেইরোসরা বা সোনা তল্লাশকারীদের দল সবখানে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রাণনাশের ভয়ে গারিমপেইরোসদের অবস্থান করা জায়গার আশপাশে যান না তিনি। তাদের অবৈধ খননকাজের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষকেও জানিয়েছিলেন তিনি। তবে এখনো এসব খনন বন্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

১২ই মে হামলার ব্যাপারে তদন্ত করতে কেন্দ্রীয় পুলিশ বাহিনীর একটি দল পালিমিউতে যায়। তাদের সহায়তা করেন স্থানীয় আদিবাসী স্বাস্থ্য পরিষদের প্রধান জুনিয়র হেকুকারি। তারা যখন গ্রামটি ছেড়ে বের হয়ে যাচ্ছিলেন তখনই কয়েকটি নৌকা থেকে গুলি ছোড়া হয়। সরকারি কর্মকর্তারা নিজেদের পুলিশ পরিচয় দেয়ার পরও গুলি থামেনি। পাল্টা জবাবে এক পর্যায়ে তারাও গুলি ছোড়া শুরু করলে কিছুক্ষণের মধ্যেই হামলাকারী দল পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় কেউ আহত হননি। তবে স্থানীয়দের মধ্যে ঘটনার বিস্তারিত ছড়িয়ে পড়ার পর সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। কোপানেওয়া বলেন, তারা যদি পুলিশের উপরে হামলা চালাতে পারে, তাহলে আমার গোত্রের কেউই আর নিরাপদ নয়।

আদিবাসীদের সংরক্ষিত এলাকায় গারিমপেইরোদের হামলা ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জায়ের বলসোনারোর আমলে বেড়ে গেছে। সংরক্ষিত এলাকাগুলোর কিছু অংশ খনন ও কৃষিকাজের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তার।

অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ইন্সটিটিউটো সোসিওঅ্যাম্বিয়েন্টাল (আইএসএ) বলছে, সংরক্ষিত অঞ্চলগুলোয় আনুমানিক ২০ হাজার গারিমপেইরো রয়েছে। হেকুকারির ভাষ্যমতে, তারা যা ইচ্ছা তাই করে বেড়াচ্ছে। কারণ, তারা জানে যে তাদের কিছুই হবে না।

রোরাইমা রাজ্যের ফেডারেল কৌঁসুলি অ্যালিসন মারুগাল জানান, স্বর্ণের মূল্যবৃদ্ধি ও সরকারের আদিবাসী বিষয়ক সংস্থা ফিনাইয়ের সাম্প্রতিক এক সিদ্ধান্তের কারণেই খননকারীরা বেশি উৎসাহ পাচ্ছে। ফিনাই সম্প্রতি করোনা ভাইরাস মহামারীর মধ্যে আদিবাসীদের সংরক্ষিত অঞ্চলে মাঠ পর্যায়ে কাজ কমিয়ে দিয়েছে। এই সুযোগ নিয়ে নিজেদের তৎপরতা বাড়িয়ে দিয়েছে গারিমপেইরোরা।

পৃথিবীর অক্সিজেন-খ্যাত অ্যামাজন বনকে রক্ষা করার অন্যতম কার্যকর পদ্ধতিগুলোর একটি হচ্ছে আদিবাসীদের সংরক্ষিত অঞ্চলগুলোকে সুরক্ষিত রাখা। কিন্তু জলবায়ু-পরিবর্তন সংক্রান্ত উদ্বেগ প্রায়ই উড়িয়ে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট বলসোনারো। তিনি মনে করেন, আদিবাসীদের জন্য বন সংরক্ষণ করায় সেখানে উন্নয়ন হয়নি। তার নিজের বাবাও একসময় ছিলেন সোনা খননকারী।

বিশেষ করে রোরামিয়া রাজ্যের ইয়ানোমামি অঞ্চল নিয়ে বলসোনারোর খেদ বেশি। রোরামিয়ার রাজধানী বোয়া ভিস্তার বাসিন্দা কোপানেওয়া সেখানে হুতাকারা নামের একটি আদিবাসী সংগঠনের নেতৃত্ব দেন। তিনি বলেন, বলসোনারো গারিমপেইরোদের সমর্থন করে। ইয়ানোমামির সুরক্ষায় তার কোনো ইচ্ছা নেই। আমাদের ভূখণ্ডকে অসম্মান করা হচ্ছে। কেউ আমাদের সহায়তা করছে না।

পার্লামেন্টে বলসোনারো প্রশাসন সরকারি জমি ব্যক্তিগত মালিকানার অনুমোদন দেওয়া বিষয়ক নতুন একটি বিল পাস করার চেষ্টায় আছে। বিরোধীদের মতে, এই বিল অ্যামাজন ও আদিবাসীদের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। শিগগিরই পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে বিলটি নিয়ে ভোট হওয়ার কথা রয়েছে।

কোনো রাজনৈতিক ইচ্ছা নেই’
কোপানেওয়ার বাবা ডেভিড কোপানেওয়া একজন সুপরিচিত শামান ও আদিবাসী নেতা। তার নেতৃত্বে জোরালো প্রচারণার পরই ইয়ানোমামিকে সংরক্ষিত অঞ্চল ঘোষণা করা হয়। স্থানীয়ভাবে অ্যামাজনের দালাই লামা হিসেবে পরিচিত ডেভিড। ২০১৪ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, শ্বেতাঙ্গ মানুষদের মধ্যে যাদের অর্থ আছে, তারা আরও অর্থ চায়। তারা আরও ধ্বংস করতে চায়। এটাই তাদের রীতি। তাদের কোনো সীমা নেই।

আইএসএ অনুসারে, গত বছর ইয়ানোমামি অঞ্চলে ৫০০ ফুটবল মাঠের সমান জায়গা ধ্বংস করেছে। চলতি বছর আরও জায়গা ধ্বংস করার আশঙ্কা রয়েছে। তারা খননকাজে ব্যবহৃত পারদ দিয়ে নদী দূষিত করেছে।

ফুনাই’র সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, তারা কোথায় আছেন তা সবাই জানে, তাদের সরানো হচ্ছে না কেন? এটা স্পষ্ট যে, এক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক কোনো সদিচ্ছাই সরকারের নেই।
প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা সহ্য করতে না পেরে গত বছর পদত্যাগ করেন ওই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, অবৈধ খননকাজের সঙ্গে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত। তারা এগুলো বন্ধের লক্ষ্যে পদক্ষেপ নিতে দিচ্ছেন না।

সাম্প্রতিক সময়ে ফুনাই’র বাজেট ব্যাপক পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে। সাধারণত পুলিশ সেনাবাহিনী ও পরিবেশ রক্ষা বিষয়ক সংস্থা ইবামার সদস্যদের সমন্বয়ে আমাজনে অভিযান চালায় ফুনাই। তবে ওই কর্মকর্তা জানান, এসব অভিযান অত্যন্ত অনিয়মিত। এতে কোনো সুফল আসে না। গারিমপেইরো গোষ্ঠী কয়েকদিন পালালেও, দ্রুতই আবার খনন কাজে ফিরে যায়।
ব্রাজিল পার্লামেন্টের একমাত্র আদিবাসী সদস্য ও রোরামিয়ার প্রতিনিধি জোয়েনিয়া ওয়াপিচানা সম্প্রতি ফুনাই’র আদর্শগত পরিবর্তনের সমালোচনা করেন। বর্তমানে সংস্থাটির নেতৃত্বে আছেন কৃষি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকা এক পুলিশ কর্মকর্তা।

ওয়াপিচানা বলেন, ফুনাই একসময় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বন্ধু ছিল। এখন তারা স্থানীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধাচরণ করছে! এমনকি তাদের সমালোচনাকারী আদিবাসী নেতাদের তদন্ত করতে স্থানীয় পুলিশদের অনুরোধ করেন।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে, ফুনাই বিবিসি’কে জানায় সাক্ষাৎকার দেওয়ার মতো কেউ নেই। অন্যদিকে, বলসোনারোর কার্যালয়ে মন্তব্য চেয়ে যোগাযোগ করা হলে সাড়া মেলেনি।সুত্র: মানবজমিন।

ভয়েস/ জেইউ।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023
Developed by : JM IT SOLUTION