মঙ্গলবার, ২৩ Jun ২০২৬, ১১:২৪ অপরাহ্ন
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পাস করেছেন বাহার উদ্দিন ভয়েস নিউজ ডেস্ক:
মুখে কলম আটকে কনুইয়ের সাহায্যে লিখে স্নাতকোত্তর পাস করলেন বাহার উদ্দিন
বাহার উদ্দিন রায়হানের এক হাত নেই, আরেক হাত আছে কনুই পর্যন্ত। মুখে কলম আটকে কনুইয়ের সাহায্যে লিখে কয়েকটি পরীক্ষা দিয়েছেন। আর শ্রুতলেখকের সহায়তা নিয়েছেন কয়েকটি পরীক্ষায়। এভাবে পরীক্ষা দিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর (সিজিপিএ–৪–এর মধ্যে ৩ দশমিক ১৩) পাস করেছেন তিনি।
বাহার উদ্দিন রায়হান জানালেন, এখন যোগ্যতা অনুযায়ী একটি চাকরি পেলে মাকে নিজের কাছে এনে রাখতে পারবেন। বাহার যখন মায়ের পেটে ছিলেন, তখন বাবা তাঁর মাকে মারধর করে চলে গিয়েছিলেন। এখন ছেলে কবে একটি ভালো চাকরি পাবেন, সে আশায় বসে আছেন মা।
বাহার স্নাতক পাস করার পর গত বছরের ২৮ এপ্রিল একটি দৈনিকে অনলাইনে ‘চাকরির বাজারে যোগ্যতা নয়, সবার আগে চোখে পড়ে আমার দুই হাত নেই’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। এরপর দু–একটি সংস্থার পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও তেমন অগ্রসর হয়নি বলে জানালেন বাহার উদ্দিন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘চাকরির জন্য কেউ ডাকলেও খুব বেশি হলে ১১ হাজার টাকা বেতন দিতে চায়। সবাই ধরে নেয়, আমি কাজ করতে পারব না।’
আজ বৃহস্পতিবার মুঠোফোনে কথা হয় বাহার উদ্দিন রায়হানের সঙ্গে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তিনি তাঁর স্নাতকোত্তর পাসের কথা জানিয়েছেন।
শুভাকাঙ্ক্ষীদের শুভকামনায় ভরে যাচ্ছে বাহার উদ্দিনের ফেসবুকের হোম পেজ।
একটি খণ্ডকালীন চাকরি এবং অনলাইনে টুকটাক ব্যবসা করে যে আয় হয়, তা দিয়ে এ পর্যন্ত নিজের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন বাহার উদ্দিন। চট্টগ্রাম শহরে টেনেটুনে নিজের খরচ চললেও মাকে রাখতে হচ্ছে কক্সবাজারের চকরিয়ায়। অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করে মা তাঁর বাবার বাড়ির পাশে ছোট একখণ্ড জায়গা কিনেছেন। সেখানে ঘর তুলে থাকছেন।

এক হাত নেই, আরেক হাতের কনুইয়ের নিচের অংশ কাটা। তবে থেমে নেই কক্সবাজারের চকরিয়ার বাহার উদ্দিনের (রায়হান) এগিয়ে চলা। গতকালই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস করেছেন তিনি
২০০৪ সালের ৩০ অক্টোবর বাহার উদ্দিন তখন পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাড়ির পাশে বিদ্যুতের খুঁটিতে বসানো ট্রান্সফরমারে একটি ছোট পাখি ঢুকে পড়ে। সেই পাখি দেখতে গিয়ে বৈদ্যুতিক তারে হাত দিতেই ঝলসে যায় তাঁর দুই হাত, বুকের কিছু অংশ ও পায়ের তলা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঁচ দিনের মধ্যে কেটে ফেলা হয়েছিল তাঁর এক হাত ও আরেক হাতের কনুই পর্যন্ত।
দুই হাত ছাড়া জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন বাহার উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমি ঝুঁকিপূর্ণ কাজ এড়িয়ে চলি। তবে চাইলে সব কাজ করতে পারি, তা প্রমাণের জন্য মোটরসাইকেল চালানো শিখেছি। স্কেটিং করি। মনেপ্রাণে চাইলে হাত না থাকলেও কোনো কাজ অসম্ভব নয়।’
বাহার উদ্দিন কম্পিউটারে দক্ষ। মুখে কলম আটকে কনুইয়ের সাহায্যে কম্পিউটারে টাইপ করেন। অন্য স্বাভাবিক মানুষের মতো বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে দ্রুত গতিতে কাজ করতে পারেন। তবে চাকরির বাজারে এসব বিবেচনার আগে সবাই ভাবেন, তাঁর দুটি হাত নেই। এ মানসিকতার পরিবর্তন না হলে যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাওয়া কঠিন বলে মনে করছেন বাহার উদ্দিন। তিনি জানালেন, এনজিও বা যেকোনো প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগ বা প্রশাসনিক বিভাগে অথবা প্রশিক্ষণ খাতে কাজ করতে পারবেন।
গোসল, খাওয়া ও চলাফেরার মতো দৈনন্দিন কাজ বাহার উদ্দিন একাই করতে পারেন। ছোট থেকে এ পর্যন্ত পাড়ি দেওয়ার পেছনে নানাবাড়ি ও মামাদের যে অবদান, তা বারবার তিনি বলছিলেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় নানাবাড়ির সূত্রে কিছু আত্মীয়স্বজন এগিয়ে এসেছেন। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন তিনি।

ইউটিউবে বাহার উদ্দিনের নিজস্ব চ্যানেল রয়েছে ‘বাহার রায়হান’ নামে। এক বন্ধুর সঙ্গে মিলে গড়ে তুলছেন ‘কেমনে যাব ডটকম’ ওয়েবসাইট। এর বাইরে নিজেকে বিভিন্ন কাজে যুক্ত রাখেন তিনি।
বাহার উদ্দিন জীবন নিয়ে হতাশ হয়ে যাওয়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মনোবল ফিরিয়ে আনার জন্য কিছু করতে চান। অন্য ব্যক্তিদের উৎসাহিত করতে নিজের জীবনী লিখে বই প্রকাশ করার ইচ্ছার কথা জানালেন। তবে এ মুহূর্তে তাঁর যোগ্যতা অনুযায়ী একটি কাজ প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. আবদুল্লাহ আল মাসুম বলেন, ‘বাহার উদ্দিনের পড়াশোনায় অদম্য ইচ্ছা ছিল। বিভাগের শিক্ষকেরা তাঁর পাশে ছিলেন। এ শিক্ষার্থীর ভালো ফলাফল আমাদের বিভাগের জন্য অবশ্যই আনন্দের এবং গর্বের। আমরা চাই, যথাযথ কর্তৃপক্ষ বাহার উদ্দিনের চাকরির ব্যাপারে আন্তরিক হবে। আমাদের এ শিক্ষার্থী যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাবে, এটাই আমাদের চাওয়া।’ সুত্র:প্রথম আলো।
ভয়েস/জেইউ।