মঙ্গলবার, ২৩ Jun ২০২৬, ১১:২৪ অপরাহ্ন
আবদুল আজিজ:
হাফিজুর রহমান ওরফে ছলেহা ডাকাত। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের দু’পাড়ের এক মূর্তিমান আতংকের নাম। তার রয়েছে সীমান্তকেন্দ্রিক বিশাল বাহিনী। সীমান্ত মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান, মানবপাচার, অপহরণ, খুন, হত্যা, ধর্ষণ নানা অপরাধের সাথে জড়িত ছলেহ ও তার বাহিনীর সদস্যরা। দীর্ঘদিন ধরে সে বাহিনীটির প্রধান হিসাবে অপকর্ম করে আসছে।
শুক্রবার রাতে টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় র্যাবের সঙ্গে গোলাগুলির পর হাফিজুর রহমান ওরফে ছলেহ ডাকাত ও তার অন্যতম আরও ৬জন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে র্যাব-১৫। এসময় ঘটনাস্থল থেকে ১টি বিদেশী পিস্তল, ৫ রাউন্ড গুলি, ৩টি দেশীয় তৈরী একনলা বড় বন্দুক, ২টি একনলা মাঝারি বন্দুক, ৬টি একনলা ছোট বন্দুক সহ মোট ১১টি দেশীয় তৈরি বন্দুক, ১৭ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, ৪ রাউন্ড খালি কার্তুজ, ২টি ছুরি ও ৬টি দেশীয় তৈরি দা উদ্ধার করা হয়।
শনিবার দুপুরে র্যাব-১৫ কক্সবাজার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এ তথ্য জানান র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দরকার আল মঈন।
খন্দরকার আল মঈন বলেন, শুক্রবার (৫ মে) রাতে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে কক্সবাজার জেলার টেকনাফের বাহারছড়া পাহাড়ি এলাকায় র্যাব অভিযান চালান। এসময় টেকনাফের দূর্গম পাহাড় কেন্দ্রিক বিভিন্ন সময়ে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের মুল হোতা হাফিজুর রহমান ওরফে ছলেহ উদ্দিন ডাকাত (৩০) ও তার সহযোগী নরুল আলম (৪০), আক্তার কামাল ওরফে সোহেল (৩৭), নুরুল আলম ওরফে লালু (২৪), হারুনুর রশিদ (২৩) ও রিয়াজ উদ্দিন ওরফে বাপ্পি (১৭)’কে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব।
কমান্ডার খন্দকার মঈন আরও বলেন, ‘ হাফিজুর রহমান ওরফে ছলেহ ডাকাত গত ২০১২ সালে মিয়ানমার থেকে অবৈধপথে বাংলাদেশে আসার পর পার্শ্ববর্তী দেশ সমূহের বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সাথে যোগসাজসে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে। পরে গত ২০১৩ সালে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যায়। ওখান থেকে আসার পর ২০১৯ সালে সে আবারও বাংলাদেশে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করে এবং অবৈধভাবে উখিয়া ও কক্সবাজারে অবস্থান করে। এরপর অবৈধভাবে পাশ্ববর্তী দেশে যাতায়াত ও অপরাধমূলক কার্যক্রম করতে থাকে। এসময় অপহরণ-ডাকাতি, মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধ কার্যক্রম করে আসছিল ছলেহ উদ্দিন। বিভিন্ন অপরাধ কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য ১২/১৫ জন সদস্য রয়েছে। সে দুর্গম পাহাড়ে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অবস্থান করে অপহরণ, ডাকাতি ও মাদক চোরাচালান কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এছাড়াও মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড সহ পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে মানবপাচার করে আসছে। এসব অপরাধে কার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয় এবং সে গভীর পাহাড়ে আস্তানা গড়ে আত্মগোপন থাকে। এভাবে পর্যায়ক্রমে ছলেহ ডাকাত বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের দু’পাড়ের এক মূর্তিমান আতংকের নামে পরিণত হয়। তার রয়েছে সীমান্তকেন্দ্রিক বিশাল বাহিনী। সীমান্ত মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান, মানবপাচার, অপহরণ, খুন, হত্যা, ধর্ষণ নানা অপরাধের সাথে জড়িত ছলেহ ও তার বাহিনীর সদস্যরা।
সর্বশেষ ছলেহ ডাকাতের নেতৃত্বে তার এই সন্ত্রাসী দলটি টেকনাফের শালবাগান পাহাড়, জুম্মা পাড়া ও নেচারপার্ক এলাকা, বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালী পাড়া পাহাড়, বড় ডেইল পাহাড়, কচ্ছপিয়া পাহাড়, জাহাজপুরা পাহাড়, হলবনিয়া পাহাড়, শিলখালী পাহাড় এলাকায় অবস্থান করে অপরাধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করত। কখনও অটোরিক্সার চালক এবং কখনও সিএনজি চালক হিসেবে ছদ্মবেশ ধারণ করে বিভিন্ন কৌশলে তারা কক্সবাজারের হ্নীলা, হোয়াইক্যং, উনচিপ্রাং, শ্যামলাপুর, জাদিমোড়া ও টেকনাফ ইত্যাদি এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের টার্গেট করে অপহরণপূর্বক মুক্তিপণ আদায় ও ডাকাতি করত।
র্যাবের গণমাধ্যম শাখার ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘ছলেহ ডাকাতকে গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গত ১৮ ডিসেম্বর টেকনাফের বাহারছড়া এলাকা হতে ১০ (দশ) জন কৃষক, ২ জানুয়ারী রোহিঙ্গা শরনার্থী রেজুয়ানা, ২৬ মার্চ ন্যাচারাল পার্কের দর্শনার্থী হ্নীলার দমদমিয়ার বাসিন্দা কবির আহাম্মদের ছেলে রিদুয়ান সবুজ (১৭) ও একই এলাকার বাসিন্দা মাওলানা আবুল কালামের ছেলে নুরুল মোস্তফা (১৬), ১৫ এপ্রিল ফুলের ডেইল এলাকা থেকে বাবুল মেম্বারের ছেলে ফয়সাল (১৭), ৩০ এপ্রিল হামিদুল্লাহ (২৪) এবং ৩ মে রোহিঙ্গা ক্যাম্প-০৭ ব্লক- ই/৬ এ বসবাসরত আবু কালামসহ অনেক ব্যক্তিকে অপহরণের কথা স্বীকার করেন। এসব অপহরণের ঘটনায় অপহৃত প্রতিজনের কাছ থেকে ৫-১০ লাখ টাকা ক্ষেত্রবিশেষে তার চেয়ে কম-বেশি মুক্তিপণ আদায় করত। তার বিরুদ্ধে উখিয়াসহ কক্সবাজারের বিভিন্ন থানায় ১০ এর অধিক মামলা রয়েছে।’
গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য বলছে, হাফিজুর রহমান ওরফে ছলেহ ডাকাত আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) অন্যতম নেতা। সে বর্তমানে আরসা প্রধান আতাউল্লাহর পরেই দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার বাবার নাম মোহাম্মদ শফি। মাতা লতি বানু বেগম। মিয়ানমার থেকে এদেশে প্রবেশ করলেও ছলেহ বা তার পরিবার রোহিঙ্গা তালিকাভুক্ত না। দেশে থাকা রোহিঙ্গাদের তালিকায় কাগজে-কলমে নাম না থাকায় অপহরণ-ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধ নির্বিঘেœন করে আসছেন ছলেহ উদ্দিন।
ভয়েস/আআ