সোমবার, ২২ Jun ২০২৬, ০৪:৪২ পূর্বাহ্ন

দৃষ্টি দিন:
সম্মানিত পাঠক, আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। প্রতিমুহূর্তের সংবাদ জানতে ভিজিট করুন -www.coxsbazarvoice.com, আর নতুন নতুন ভিডিও পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল Cox's Bazar Voice. ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন এবং কমেন্ট করুন। ধন্যবাদ।

মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদি সংগঠন ‘আরসা’র জন্য বিদেশ থেকে অর্থ সংগ্রহের তথ্য ফাঁস

আবদুল আজিজ:

মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদি সংগঠন ‘আরসা’র জন্য বিদেশ থেকে অর্থ আসার তথ্য ফাঁস করে দিয়েছে র‍্যাবের হাতে গ্রেপ্তারকৃত শীর্ষ নেতা মাওলানা মোহাম্মদ ইউনুস।

র‍্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে ইউনুস স্বীকার করেছেন কিভাবে সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, দুবাই, আমেরিকা সহ বিদেশ থেকে টাকা সংগ্রহের তথ্য।

আজ শুক্রবার (২৫ আগস্ট) বিকালে র‍্যাব-১৫ কক্সবাজার কার্যালয়ে এক প্রেসব্রিফিংয়ে র‍্যাবের কোম্পানি কমান্ডার মেজর জামিলুল হক।

মেজর জামিল জানান, সম্প্রতি রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ কক্সবাজার জেলা জুড়ে হত্যা, লাশ, গুম, অপহরণ, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে যেন মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। যেখানে ক্যাম্প ঘিরে গড়ে উঠেছে নানা সন্ত্রাসী সংগঠন। যারমধ্যে অন্যতম একটি দল আরকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা)। তাদের নানা অপকর্ম অপরাধ ক্যাম্পে বিস্তার করেছে ব্যাপক।ফলে অস্থিতি পরিবেশ পুরো ক্যাম্পজুড়ে।বিভিন্ন সময় একাধিক অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আরসার অনেকে আটক হলেও নির্মূল হয়নি দলটি। এবার অভিযান চালিয়ে আরসার শীর্ষ সন্ত্রাসী ও অর্থ সম্পাদক মাওলানা মোহাম্মদ ইউনুসকে আটক করেছে র‌্যাবের সদস্যরা।

মেজর জামিলুল হক আরও জানান, গত ২৪ আগস্ট একটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের তাজনিমার খোলা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে আরসার শীর্ষ সন্ত্রাসী ও অর্থ সম্পাদক মাওলানা মোহাম্মদ ইউনূসকে আটক করতে সক্ষম হয়। অভিযান পরিচালনাকালে তার হেফাজতে থাকা ১ টি বিদেশি রিভলবার,৬ রাউন্ড তাজা কার্তুজ ও ১টি স্মার্ট মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়।

গ্রেফতারকৃত মোঃ ইউনূস (৪০) ক্যাম্প ১৯ সি ব্লক/১৪ এর মৃত হাবিবুল্লাহর ছেলে।

গ্রেফতারকৃত মাওলানা মোহাম্মদ ইউনুস জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মায়ানমারের নাগরিক। সে মায়ানমারে থাকাবস্থায় মংডু টাউনশীপের মেরুল্লা মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতো এবং শিক্ষকতার আড়ালে আরসার হয়ে কাজ করতো। ২০১৬ সালে সে ‘আরসা’ সদস্য মৌলভী আরিফুল্লাহর মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন ‘আরসা’ এ যোগ দেয়। সে আরসার আমীর আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনী, ওস্তাদ খালেদ, সমউদ্দিন এর সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের মাধ্যমে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করতো। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আলেম-ওলামা, হেডমাঝি, সাবমাঝি ও সাধারণ রোহিঙ্গাদের সাথে মিটিং করে আরসা সংগঠনে যোগদানের জন্য উৎসাহ প্রদান করতো। এছাড়াও সে রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় আরসার অর্থ সম্পাদকের দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে এবং আর্থিক তহবিল পরিচালনা করছে বলে জানা যায়। পরবর্তীতে সে ২০১৭ সালে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং শরণার্থী হিসেবে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প-১৯ এ অবস্থান করতে থাকে। আরসার অর্থের উৎস সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদে মাওলানা ইউনুস জানায় তার এর নিকট প্রতিমাসে সৌদি আরব থেকে আবুল বশর ১ লক্ষ টাকা, মৌলভী ইসমাইল ১ লক্ষ টাকা, পারভেজ ১৫ হাজার টাকা, আমেরিকা থেকে জহুর আলম ১ লক্ষ টাকা, মালয়েশিয়া থেকে হারুন ১ লক্ষ টাকা, থাইল্যান্ড হতে হারুন ৬৫ হাজার টাকা এবং সৌদি আরব থেকে মোঃ ইসলাম প্রতিবছর ১ লক্ষ টাকাসহ সর্বমোট ৫ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা তাদের কাছে পাঠায়। এছাড়াও অস্ট্রেলিয়া থেকে অজ্ঞাত অনেক রোহিঙ্গা টাকা পাঠায় বলে জানা যায়। মায়ানমারের আরাকান রাজ্যে রোহিঙ্গাদের গ্রাম হাতে চাঁদা সংগ্রহ করা হয়। প্রতিমাসে বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ১০-১৫ লক্ষ টাকা আরসার ক্যাম্প জিম্মাদারদের নিকট আসে। প্রাপ্ত অর্থসমূহ দিয়ে অস্ত্র কেনা ও দলের সদস্যদের আর্থিক সহযোগিতা/বেতন দিয়ে থাকে। বর্তমানে মাওলা ইউনুসের নিকট তার বিকাশ একাউন্ট আনুমানিক ৩৩ থেকে ৩৭ হাজার টাকা হয়েছে বলে জানা যায়।

জিজ্ঞাসাবাদে র‍্যাবকে আরো জানিয়েছে, মাওলানা ইউনুস আরসার সংগঠনের জন্য গত এপ্রিল হতে জুন ২০২৩ তারিখ পর্যন্ত ৩ মাসে আরসা সমর্থিত বিভিন্ন গ্রুপ, ব্যক্তি ও সংগঠন হতে প্রায় ১৩,৮১,৬৯৫ (লক্ষ একাশি হাজার ছয়শত পঁচানব্বই) টাকা প্রাপ্ত হয়েছে।

জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত মাওলানা ইউনুস জানায়, আরসার গ্রুপে ২০০-২৫০ জন সদস্য রয়েছে। আরসা সদস্যরা গত ২০১৬ সালে মায়ানমারে তারাশুখ থানায় আক্রমন করে মোট ৭০টি একে-৪৭ অস্ত্র লুট করে এবং এটি তাদের অস্ত্র সরবরাহের মূল উৎস বলে জানা যায়। সে আরো জানায় আরসার অন্য সদস্য সমিউদ্দিন (ক্যাম্প-৬) এবং হোসেন (ক্যাম্প-১৭) অস্ত্র ও এ্যামোনিশনের ব্যাপারে বিস্তারিত জানে। এছাড়া সে জানায় ছোট ছোট অস্ত্র ও এ্যামোনিশন বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা হতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সরবরাহ করে থাকে। আরসা সদস্যরা অস্ত্রগুলো ক্যাম্পে নিয়ে আসার পর সমিউদ্দিন ও ইউনুসের নিটক জমা থাকে এবং পরবর্তীতে তাদের অধীনে সকল সদস্যদের অস্ত্র বন্টন করে থাকে। আরসা সন্ত্রাসী সমিউদ্দিন ও জোবায়ের ককটেল বোমা বা বিস্ফোরক তৈরী করে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দেশীয় তৈরী এলজি অস্ত্রের চাহিদা বেশি। আরসা সদস্যরা অস্ত্র ক্রয় করার পর নগদ অর্থ হাতে হাতে লেনদেন করে অথবা বিকাশের মাধ্যমে টাকা লেনদেন করে। মায়ানমারের বুথিডং ও মন্ডু শহরের মাঝে বিভিন্ন ছোট ছোট পাহাড়ে ওস্তাদ খালেদ, সামসু এবং হামিদ হোসেন আরসা সদস্যদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেয়। আরসা সদস্যদের জন্য নির্দিষ্ট কোন রাউন্ড এ্যামোনিশন বরাদ্দ নেই তবে বিভিন্ন অপারেশনের পূর্বে বেশি করে এ্যামোনিশন প্রদান করা হয়।

এছাড়া মাওলানা ইউনুসের নিকট হতে আরসা সদস্যদের বিভিন্ন সাংকেতিক শব্দ পাওয়া যায়; KRG/KIG – পাহারাদার গ্রুপ – ১৩-১৫ বছর বয়সের আরসা সদস্য, G-4 – মাস্টার রফিক, L/L. Gan – জোবায়ের (আঙ্গুল বাকা) এবং 5.S/5.Star – মাস্টার ইউনুস। বর্তমানে আরসার নিকট প্রায় ২০টি টাইপ-৭৪ এলজি, জেআরজি অস্ত্রসহ ও বিপুল পরিমানে হাত বোমা (হ্যান্ড গ্রেনেড) রয়েছে বলে জানা যায়। আরসা কমান্ডার সমিউদ্দিনের সাথী রোহিঙ্গা ফরিদ, মোহাম্মদ উল্লাহ এবং ইউসুফসহ অনেকের নিকট অস্ত্র রয়েছে বলে জানা যায়।

গ্রেফতারকৃত মাওলানা মোহাম্মদ ইউনুস বিরুদ্ধে উখিয়া থানায় সর্বমোট ৫টি মামলা পাওয়া যায়।যেখানে গত ১৫ অক্টোবর ২০২২ তারিখ হেডমাঝি আনোয়ার কুপিয়ে হত্যা, ০৩ মার্চ ২০২৩ সালে রোহিঙ্গা মোহাম্মদ রফিক গুলি করে হত্যা, ১৩ মার্চ ২০২৩ সালে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আগুন লাগনোর নির্দেশদাতা,১১ এপ্রিল ২০২৩ এবং ০৯ জুন ২০২৩ সালে এপিবিএন কর্তৃক আরসা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনাকালে তাদের উপর সশস্ত্র হামলা। এছাড়াও তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আরো কয়েকটি হত্যাকান্ডের সাথে সম্পৃক্ত ছিল সে স্বীকার করে।

ভয়েস/আআ

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023
Developed by : JM IT SOLUTION