রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৫৭ অপরাহ্ন
ভয়েস প্রতিবেদক:
আজ থেকে কক্সবাজারের সেন্টমার্টিন দ্বীপ ভ্রমনে অনুমতি থাকলেও কোন জাহাজ যায়নি। অনুমতি না পাওয়ায় পর্যটকবাহী কোন জাহাজ সেন্টমাটিনে যেতে পারেনি। তবে আগামী ৫ অথবা ৬ নভেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য খুলে যাচ্ছে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন।
যদিও সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পর্যটন মৌসুম ১ নভেম্বর থেকেই শুরু হওয়ার কথা ছিল, তবে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও কারিগরি অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় জাহাজ চলাচল কয়েকদিন পিছিয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশা, সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে আগামী সপ্তাহের শুরু থেকেই পর্যটকবাহী জাহাজ নিয়মিত চলাচল শুরু করবে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের গত ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকেরা সেন্টমার্টিন ভ্রমণের সুযোগ পাবেন। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার পর্যটক দ্বীপে যেতে পারবেন এবং প্রত্যেককে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি পরিশোধ করতে হবে।
পর্যটন মৌসুম শুরুর প্রাক্কালে সেন্টমার্টিন দ্বীপজুড়ে এখন উৎসবমুখর প্রস্তুতি চলছে। হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁগুলোতে সংস্কার, রং করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং নতুন সাজসজ্জার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। দীর্ঘদিন পর্যটক সংকটের কারণে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়া ব্যবসায়ীরা নতুন মৌসুমকে ঘিরে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন।
অন্যদিকে, পর্যটক পরিবহনের জন্য সেন্টমার্টিন জেটি এবং কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া জেটিঘাটের প্রস্তুতি নিয়ে চলছে শেষ মুহূর্তের কার্যক্রম। জাহাজ মালিকদের সংগঠন বলছে, সেন্টমার্টিন জেটি বর্তমানে পর্যটকবাহী জাহাজ গ্রহণের জন্য প্রস্তুত থাকলেও নুনিয়ারছড়া জেটিঘাটে যাত্রী ওঠানামার জন্য প্রয়োজনীয় সিঁড়ির সংখ্যা এখনো পর্যাপ্ত নয়।
সেন্টমার্টিন নৌপথে চলাচলকারী পর্যটকবাহী জাহাজ মালিকদের সংগঠন সি ক্রজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (স্কোয়াব)-এর সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন, সেন্টমার্টিন জেটির প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। তবে নুনিয়ারছড়া জেটিঘাটে যাত্রীদের নিরাপদ ওঠানামা নিশ্চিত করতে আরও একটি সিঁড়ি সংযোজন জরুরি বলে তারা মনে করছেন।
তিনি জানান, পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন পাওয়ার পর বিআইডব্লিউটিএর নির্দেশনা ও শর্ত প্রতিপালনের ভিত্তিতে এমভি কর্ণফুলী এক্সপ্রেস, এমভি বার আউলিয়া এবং এমভি টেকনাফ—এই তিনটি পর্যটকবাহী জাহাজকে কক্সবাজার-নুনিয়ারছড়া থেকে সেন্টমার্টিন নৌপথে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে অন্য জাহাজগুলোর অনুমোদন প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে।
কক্সবাজার নদীবন্দরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক নয়ন শীল বলেন, নুনিয়ারছড়া জেটিঘাটের অবকাঠামোগত কাজ প্রায় শেষ। সামান্য কিছু কাজ বাকি রয়েছে, যা এক-দুই দিনের মধ্যেই সম্পন্ন হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু করা সম্ভব হবে।
এদিকে, পর্যটকদের আগমনকে কেন্দ্র করে সেন্টমার্টিনের পর্যটন ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ সময় পর্যটক চলাচলে সীমাবদ্ধতা এবং রাতযাপনে বিধিনিষেধ থাকায় অনেক ব্যবসায়ী বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। নতুন মৌসুমকে কেন্দ্র করে সেই ক্ষতি কিছুটা হলেও কাটিয়ে ওঠার আশা করছেন তারা।
সেন্টমার্টিনের একটি রিসোর্টের মালিক মোহাম্মদ তৈয়ব উল্লাহ বলেন, দীর্ঘদিন ব্যবসা প্রায় বন্ধ থাকায় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করাই কঠিন হয়ে পড়েছিল। এখন পর্যটক আসার খবর তাদের জন্য নতুন আশার বার্তা হয়ে এসেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আলমগীর আকাশ বলেন, সেন্টমার্টিনের ব্যবসা মূলত দুই থেকে তিন মাসের মৌসুমনির্ভর। এই সময়ের আয়ের ওপরই পুরো বছরের জীবিকা নির্ভর করে। তাই কোনো কারণে পর্যটন কার্যক্রম ব্যাহত হলে স্থানীয় মানুষের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
টেকনাফ উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, পর্যটন মৌসুম শুরুর আগে হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ সংস্কারের জন্য তিন শতাধিক আবেদন জমা পড়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে পর্যায়ক্রমে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে দ্বীপে ছোট-বড় মিলিয়ে দুই শতাধিক আবাসিক হোটেল ও পর্যটনসেবা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে প্রস্তুতির মাঝেও উদ্বেগের জায়গা রয়ে গেছে জাহাজ ভেড়ানোর পন্টুনের নিরাপত্তা নিয়ে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে পন্টুনের বিভিন্ন স্থানে মরিচা ধরে ক্ষয় সৃষ্টি হয়েছে। পর্যটক চলাচল শুরুর আগে প্রয়োজনীয় সংস্কার না হলে যাত্রী ওঠানামার সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দা শাকের আলম বলেন, জেটির মূল কাঠামো প্রস্তুত থাকলেও পন্টুনের অবস্থা সন্তোষজনক নয়। পর্যটকদের নিরাপত্তার স্বার্থে দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
সেন্টমার্টিন হোটেল মালিক-ব্যবসায়ী সমিতির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি আব্দুর রহমান বলেন, পর্যটকদের আগমন শুরু হলে দ্বীপের ব্যবসা-বাণিজ্যে আবারও গতি ফিরবে। এতে পর্যটননির্ভর হাজারো মানুষের জীবিকায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, দ্বীপের অধিকাংশ হোটেল ও রেস্তোরাঁয় সংস্কারকাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তবে পর্যটকদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে জেটির পন্টুন দ্রুত মেরামত করা প্রয়োজন।
কক্সবাজার জেলা পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন জানান, প্রায় সাত কোটি টাকা ব্যয়ে জেটির উন্নয়নকাজ চলমান রয়েছে। কিছু কাজ এখনও বাকি থাকলেও জাহাজ চলাচল শুরুর আগেই প্ল্যাটফর্মসহ প্রয়োজনীয় অংশ ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি নির্মাণকাজ নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগও খতিয়ে দেখা হবে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, পরিবেশ রক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এবারের পর্যটন মৌসুম পরিচালনা করা হবে। হোটেল-রিসোর্ট সংস্কারের আবেদন যাচাই করে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় অব্যাহত রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এবারের মৌসুমে পর্যটন চালুর পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পর্যটকের সংখ্যা নির্ধারণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ফি এবং প্রশাসনিক নজরদারির মাধ্যমে প্রবাল, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও দ্বীপের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সেন্টমার্টিনে টেকসই পর্যটনের নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি হতে পারে।
সবমিলিয়ে, সেন্টমার্টিন পর্যটন মৌসুম শুরুর কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে। হোটেল-রিসোর্ট প্রস্তুত, ব্যবসায়ীরা আশাবাদী এবং প্রশাসনও শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এখন বাকি রয়েছে জাহাজ চলাচলের চূড়ান্ত প্রশাসনিক অনুমোদন ও নিরাপদ অবকাঠামো নিশ্চিত করা। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, আগামী ৫ অথবা ৬ নভেম্বর থেকেই নিয়মিত জাহাজ চলাচল শুরু হলে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে আবারও প্রাণ ফিরে পাবে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য সেন্টমার্টিন।
ভয়েস/আআ