রবিবার, ১০ মে ২০২৬, ১২:০৭ অপরাহ্ন
মুফতি মাহবুব হাসান:
সহনশীলতা এমন এক মহৎ গুণ, যা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে শান্তি ও স্থিতির পথে পরিচালিত করে। মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, সামাজিক সহাবস্থান ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত মূলত এই গুণের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। সহনশীলতা মানুষকে সংযমী করে, ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায় এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ধৈর্য ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে উদ্বুদ্ধ করে। এই গুণ পরকালে জান্নাতের পথ সুগম করে। কিন্তু বর্তমান সমাজ বাস্তবতায় এই গুণের ভয়াবহ সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মানুষ অতি সামান্য বিষয়েও উত্তেজিত হয়ে পড়ছে, মতের অমিলকে শত্রুতায় রূপ দিচ্ছে এবং কথার বিরোধকে সহিংসতায় পরিণত করছে। ফলে সমাজে বাড়ছে অস্থিরতা, বিভাজন ও বৈরিতা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে পরিবার, কর্মক্ষেত্র, রাস্তাঘাট সর্বত্র অসহিষ্ণু আচরণ যেন স্বাভাবিক প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। অথচ সহনশীলতা ছাড়া কোনো সমাজে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। ইসলাম সহনশীলতাকে শুধু নৈতিকতা হিসেবে নয়, বরং ইমান, মানবিকতা ও আত্মশুদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন ছিল সহনশীলতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাই ব্যক্তি ও সমাজজীবনে শান্তি, সৌহার্দ্য ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য সহনশীলতার চর্চা আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি।
স্রষ্টার সমগ্র সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। মানুষের মধ্যে সেরা হচ্ছেন নবী-রাসুলরা। আর তাদের সবার মধ্যে সেরা হচ্ছেন সৃষ্টিকুল শিরোমণি সর্বশেষ নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি আমাদের জন্য উত্তম জীবনাদর্শ। তার জীবনের প্রতিটি অনুষঙ্গ আমাদের জন্য আবশ্যিকভাবে অনুসরণীয়, অনুকরণীয়। তার প্রতিটি সুন্নাহ আমাদের জন্য আবশ্যিকভাবে পালনীয়। তা ছাড়া দুনিয়া ও আখেরাতে আমাদের মুক্তি নেই। তার উত্তম চারিত্রিক গুণাবলির একটি হলো সহনশীলতা। তার জীবন, কর্ম ও আদর্শে সহনশীলতার যে মহান শিক্ষা রয়েছে তা জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে গোটা পৃথিবীর মানুষের জন্যই এক অনুপ্রেরণার উৎস। তাকে ঘোষণাই করা হয়েছে সমগ্র সৃষ্টির জন্য করুণার প্রতীক হিসেবে।
জগদ্বাসীর জন্য তার আবির্ভাবই হয়েছে আশীর্বাদ হিসেবে। তিনি সৃষ্টির প্রতি কতটা সহনশীল, এ থেকেই তা অনুমেয়। তার কীর্তিময় জীবনের বাঁকে বাঁকে অজস্র ঘটনা রয়েছে, যেসবের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা তাকে বিশ্বমানবতার পরম সুহৃদ ও সৃষ্ট জীবের প্রতি অতিশয় সহনশীল হিসেবে দেখতে পাই।
অমুসলিম মেহমানের সেবা, আগত মেহমান কর্র্তৃক অসদাচরণ করার পরও তার প্রতি কর্তব্যনিষ্ঠা, মদিনার মসজিদে প্রস্রাব করে দেওয়ার পরও অমুসলিম ব্যক্তির প্রতি হজরত রাসুল (সা.)-এর সহনশীলতা প্রদর্শন, মক্কা বিজয়ের পর অমুসলিম নাগরিকদের বিষয়ে হজরত রাসুল (সা.)-এর সাধারণ ক্ষমার নির্দেশনা, তায়েফের ঘটনায় পাথর-বৃষ্টিতে রক্তাক্ত হওয়ার পরও তাদের জন্য প্রার্থনা, অত্যাচারী মানুষদের ধ্বংস করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পেয়েও তাদের প্রতি রহমশীল হওয়া, শিরেদ করতে আসা ব্যক্তিকেও প্রাণভিক্ষা দেওয়া, প্রিয় চাচা হামজার কলিজা চিবিয়ে খাওয়া বর্বর হিন্দাকেও ক্ষমা করে দেওয়া, বিষ প্রয়োগে হত্যা করতে চাওয়া ব্যক্তির প্রতি উদারতা প্রদর্শন ইত্যাদি অসংখ্য ঘটনায় তিনি যে সহনশীলতার অবিশ্বাস্য নজির স্থাপন করেছেন, মানব সভ্যতার ইতিহাসে তা বিরল।
ইসলাম মানুষকে সহনশীল হতে এবং অন্যকে ক্ষমা করতে শেখায়। যারা কথায় ও কাজে সহনশীলতা প্রকাশ করে, মহান আল্লাহ তাদের জন্য রেখেছেন অনেক বড় পুরস্কার ও প্রতিদান। কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘অবশ্যই সহনশীলদের প্রতিদান পূর্ণভাবে দেওয়া হবে।’ (সুরা জুমার ১০)
মানুষের জীবন বিভিন্ন অবস্থার সম্মুখীন হয়। কখনো সুখের সম্মুখীন হয়, কখনো দুঃখ-কষ্টের মুখোমুখি হয়, কখনো ভালো কাজের সঙ্গে জড়িত হয়, কখনো পাপে নিমজ্জিত হয়। এসব অবস্থায় মানুষকে চরম সংযম ও সহনশীলতা অবলম্বনের জন্য ইসলাম জোরালো তাগিদ দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে বিশ্ববাসীরা! তোমরা সহনশীলতা ও নামাজের মাধ্যমে আমার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করো, নিশ্চয় আল্লাহ সহনশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা বাকারা ১৫৩)
সংযম ও সহনশীলতা জান্নাতের পথকে সুগম করে। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সুখ-দুঃখে, বিপদ-আপদে, সংঘাত-সংঘর্ষে, দ্বন্দ্ব-কলহে, ঝগড়া-ফ্যাসাদে সর্বাবস্থায় সংযম ও সহনশীলতা অবলম্বন করা উচিত। সহনশীলতা ও ক্ষমা মুসলমানের ইমানের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। হজরত রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ইমান কী? তিনি বললেন, ‘ইমান হচ্ছে ধৈর্য ও সহনশীলতা।’
যদিও সবসময় সংযত হওয়া কঠিন এবং কষ্টসাধ্য কাজ, তবু এটি এমন এক মহৎ মানবিক গুণ, যা সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কল্যাণের জন্য খুবই প্রয়োজন। দুনিয়াতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহনশীলতা ও সংযমের বিকল্প নেই। এ জন্যই ইসলাম ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়সহ সব ক্ষেত্রে সহনশীলতার শিক্ষা দেয়। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা ও সন্তান-সন্ততি, ভাই-বোনের মধ্যে সহনশীলতা, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মতামত ও চিন্তার ক্ষেত্রে সহনশীলতা, অন্যান্য ধর্মের মানুষের আন্তঃধর্মীয় সম্পর্ক, সংলাপ ও সহযোগিতার মধ্যে সহনশীলতার দীক্ষা দেয়।
সহনশীলতা ইসলামের একটি মৌলিক নীতি এবং ধর্মীয় নৈতিক কর্তব্য। এর মানে এই নয় যে, ইসলাম কোনো অন্যায়ের ব্যাপারে ছাড় দেয়। ইসলাম সবসময়ই সহনশীলতার নির্দেশ দেয়। তবে অন্যায়, অত্যাচার, নিপীড়ন এবং অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ছাড় দেয় না। বরং এমন সময় সহনশীলতার প্রাচীর ভেঙে প্রতিবাদী হতে বলে।
সহনশীলতার গুণ মানুষকে আত্মিকভাবে শক্তিশালী করে তোলে এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করে। সহনশীল মানুষ জানে, রাগ বা প্রতিশোধ নয়, বরং সহনশীলতাই আসল বিজয়। এটি কেবল ব্যক্তিগত জীবনে নয়, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি স্তরে স্থিতি আনে, ভালোবাসা বাড়ায় এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার পরিবেশ গড়ে তোলে। যে সমাজে মানুষ একে অপরের ভুল ক্ষমা করতে শেখে, মতভেদে সংযম দেখায়, সেখানে অশান্তি ও বৈরিতা জায়গা পায় না। তাই সহনশীলতা কেবল নৈতিক শিক্ষা নয়, এটি মানবজীবনের অপরিহার্য অনুশাসন। এই গুণের চর্চা যত বাড়বে, ততই সমাজ আলোকিত হবে মানবিকতা ও শান্তির দীপ্তিতে।
সহনশীলতা কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এটি আত্মিক শক্তির চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। একজন মানুষের প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হয় প্রতিকূল মুহূর্তে তার ধৈর্য ও সংযমের মাত্রার ওপর। ইসলামের সুমহান আদর্শ আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, প্রতিশোধের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করে দেওয়াই হলো প্রকৃত বীরত্ব। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ক্ষমার অজস্র দৃষ্টান্ত আজও মানবজাতির জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে আছে। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে শত্রুর প্রতিও দয়া প্রদর্শন করতে হয়। পবিত্র কোরআনের সুরা জুমার ১০ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা সহনশীলদের প্রতিদান পূর্ণভাবে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং সুরা বাকারার ১৫৩ নম্বর আয়াতে তাদের সঙ্গে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন।
এই ধর্মীয় অনুশাসন ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়ই সমাজ থেকে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা দূর করতে সক্ষম। আজকের অস্থির সময়ে আমাদের উচিত নিজেদের আচরণের কঠোরতা পরিহার করে সহনশীলতার চাদরে সমাজকে ঢেকে দেওয়া। যদি আমরা একে অপরের ভুলগুলোকে বড় করে না দেখে সংশোধনের সুযোগ দিই এবং সামান্য কারণে তর্কে না জড়িয়ে সহনশীল হই, তবে আমাদের চারপাশটা আরও সুন্দর ও বাসযোগ্য হয়ে উঠবে। ব্যক্তিজীবন থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত এই গুণের বিস্তার ঘটলে সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। তাই সুন্দর ও নিরাপদ পৃথিবী গড়তে সহনশীলতাকে কেবল মুখে নয়, হৃদয়ে ধারণ করে প্রতিটি কর্মে তার প্রতিফলন ঘটানোই হোক আমাদের মূল লক্ষ্য।
লেখক : শিক্ষক ও প্রবন্ধকার
ভয়েস/আআ/সূত্র: দেশরূপান্তর।